পাবনায় গোলাগুলিতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নিহত

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫৬ এএম

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চার জেলায় হামলা, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নে গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াসিন আলম (৪০)। আহত হয়েছেন আরও ১৯ জন। একই দিন টাঙ্গাইল ও পটুয়াখালীতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটনায় অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন।

এর আগে শুক্রবার রাতে ফেনী সদরে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও তার সমর্থকরা।

প্রার্থী নিহত হওয়ায় ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদে আগামী ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। চতুর্থ ধাপে ওইদিন ৮৪০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হওয়ার কথা। ইউনিয়ন পরিষদের আগের ধাপগুলোতেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছে অন্তত ৬১ জন।

পাবনা: গতকাল সকালে ভাঁড়ারা ইউনিয়নের কোলাদী চারা বটতলা এলাকায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী বতর্মান চেয়ারম্যান আবু সাঈদ খান, স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী সুলতান মাহমুদ ও ইয়াসিন আলমের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রাতে ওই এলাকায় সুলতান মাহমুদ ও ইয়াসিন আলমের কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। গতকাল সকালে তারা দুজন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি-ঘর দেখতে যান। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবু সাঈদ খানের লোকজন তাদের ওপর হামলা চালালে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় গোলাগুলিও হয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গুলিতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াসিন আলমসহ দুইপক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয় ১০-১২ জন।

আহতদের পাবনা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাদের মধ্যে ছয়জনকে রাজশাহী মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়। রাজশাহী নেওয়ার পথে নাটোরের বনপাড়ায় মারা যান ইয়াসিন আলম।

আহতদের মধ্যে আছে ভাঁড়ারা গ্রামের রিয়াদ হোসেন (২২), তুহিন আহমেদ (২৩), আব্দুর রহিম (৩৩), হোসেন আলী (৫০), রুবেল হোসেন (৩০), নলদহ গ্রামের আল্লেক শেখ (৪০), জসিম উদ্দিন (৩৫), আবু তালেব (৩২), তুহিন হোসেন (২৭) আব্দুল্লাহ (৩৫), লালু শেখ (৩৩), মোস্তফা (৪০) ও আল আমিন (২৮)।

গতকাল দুপরে নিহত ইয়াসিনের মরদেহ কোলাদী গ্রামে পৌঁছলে ইয়াসিন ও সুলতানের সমর্থকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আওরঙ্গবাদ এলাকায় আবু সাইদের সমর্থকদের বেশ কয়েকটি বাড়িতেও হামলা চালায় তারা। একটি দোতলা বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধরা । পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিকেলে ইয়াসিনের মরদেহ নিয়ে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকরা।

ঘোড়া প্রতীকের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী সুলতান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, গত রাত ১০টার পরে তার পক্ষে কাজ করা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সিফাত বিশ্বাস, আওরঙ্গবাদ গ্রামের হেলাল, কোরবানের বাড়িতে ভাঙচুর চালায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাঈদ চেয়ারম্যান ও তার ১০-১৫ কর্মী-সমর্থক। এ সময় তারা গুলিও করে। তার পক্ষে কাজ করলে মেরে ফেলার হুমকিও দেয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

সুলতান মাহমুদের অভিযোগ, তার চাচাতো ভাই আনারস প্রতীকের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াসিন আলমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। চেয়ারম্যান সাঈদ এর আগে তাকেও হত্যার চেষ্টা করেছে। কয়েক বছর আগে তার বাবাকেও হত্যা করেছে বলে সুলতান অভিযোগ করেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু সাঈদ খান বলেন, গত রাতে ভোট চাইতে গেলে তার সমর্থক কালাম মেম্বারকে সুলতানের লোকজন হাতুড়িপেটা করে। আজ সকালে তিনি তাকে দেখতে যান। ফিরে আসার পথে কোলাদী ইন্দ্রারা মোড়ে এলে সুলতানের লোকজন তাকে গুলি করে। এ সময় চারদিক থেকে তাকে ঘিরে রাখেন তার লোকজন। গুলি লাগে তার ছোট ভাইয়ের পায়ে। তিনি দাবি করেন, তার কয়েকজন সমর্থক আহত হয়েছেন।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিকস কনসালট্যান্ট ডা. রাশেদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আহত ১০-১২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে। কয়েকজনকে রাজশাহী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পাবনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রোকনউজ্জামান বলেন, ‘ভাঁড়ারা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ৮-১০ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’

পাবনা সদর ইউনিয়ন পরিষদের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কায়সার আলম বলেন, চেয়ারম্যান প্রার্থী নিহত হওয়ায় নির্বাচনী বিধিমালা অনুসারে ভাড়ারা ইউনিয়নে ওই পদে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য পদে নির্বাচন করা হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পুলিশ জানিয়েছে, ইয়াসিন আলমের মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

টাঙ্গাইল : জেলার ভূঞাপুর উপজেলার নিকরাইল ইউনিয়নে ভোট চাইতে গিয়ে নৌকার সমর্থকদের হামলার শিকার হন স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকরা। এ ঘটনায় পাঁচ নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৮ জন আহত হয়।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আনারস প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাসুদুল হক মাসুদ জানান, ‘শনিবার দুপুরে আমার ১৮-২০ জন নারীকর্মী পলশিয়া গ্রামে ভোট চাইতে গেলে নৌকা প্রতীকের কর্মীরা হাতুড়ি ও লাঠি নিয়ে হামলা চালায়। এসময় বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়।’

পাল্টা অভিযোগ করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নৌকার প্রার্থী আবদুল মতিন সরকার বলেন, ‘আমার কর্মীরা সিরাজকান্দি এলাকায় নৌকার জন্য ভোট চাইতে গেলে আনারস প্রতীকের কর্মীদের হামলার শিকার হয়।

পটুয়াখালী : জেলার কলাপাড়ার টিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহামুদুল হাসান সুজন এবং নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মশিউর রহমান শিমুর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুর আড়াইটায় কলাপাড়া-আমতলী সীমান্ত এলাকায় টিয়াখালীর পূজাখোলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ৪টি মোটরসাইকেল ভাংচুরসহ অন্তত ৪ জন আহত হয়। এ হামলার জন্য উভয় প্রার্থী একে অপরকে দোষারোপ করছেন।

কলাপাড়া থানার ওসি মো. জসিম জানান, উভয় পক্ষ মৌখিক অভিযোগ দিয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফেনী : উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের মধ্যম ছনুয়া গ্রামে দলবল নিয়ে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীর বাড়িঘরে হামলা চালান নৌকার প্রার্থী করিমুল্লাহ। এ ঘটনায় গতকাল জেলা যুবলীগ সদস্য ও ‘বিদ্রোহী’ চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল ইসলাম আবু বাদী হয়ে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ২৫ জনকে আসামি করে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন।

সাইফুল ইসলাম আবু অভিযোগ করেন, কোনো উসকানি ছাড়াই বর্তমান চেয়ারম্যান ও নৌকার প্রার্থী করিম সশরীরে উপস্থিত থেকে আমার বাড়িঘরে হামলা করেছে। এসময় গুলিবর্ষণ করে ঘরের দরজা জানালা ভেঙে তছনছ করা হয়। ঘরে থাকা নারী ও শিশুরা দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতে থাকে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।

নৌকার প্রার্থী ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি করিমুল্লাহ বলেন, ‘আমি হামলা করিনি। বরং হামলার ঘটনা শুনে বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। স্থানীয় ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়ে এ হামলা চালিয়েছে।’

ফেনী মডেল থানার ওসি মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়ে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন আমাদের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত