মেধা-মননের উন্নতির কারিগররা একাত্তরেই হারিয়ে গেছেন

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩৪ পিএম

২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’-এর সংজ্ঞা চূড়ান্ত করা হয়। সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত সময়কালে যেসব বাঙালি সাহিত্যিক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, রাজনীতিক, সমাজসেবী, সংস্কৃতিসেবী, চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং এর ফলে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী কিংবা তাদের সহযোগীদের হাতে শহীদ কিংবা ওই সময়ে চিরতরে নিখোঁজ হয়েছেন, তারা শহীদ বুদ্ধিজীবী।’

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস, বাংলাদেশ স্বাধীনতাযুদ্ধ জয় করার প্রাক্কালে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী হিসাব করে ফেলেছিল যে যুদ্ধে তাদের পরাজয় নিশ্চিত, ঠিক সে সময় তারা দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে দুর্বল এবং পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে। জেনোসাইড বা গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তকরণ, লুটপাট, উচ্ছেদ, ভূমি দখলের মতন অন্যান্য প্রক্রিয়ার আরেকটি হচ্ছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড।

একটি জনগোষ্ঠীকে তার জাতীয়/নৃ-তাত্ত্বিক/গোত্র/ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে যা কিছু করা হয় তা জেনোসাইড। ধ্বংস করার উদ্দেশ্যটাই মূল অপরাধ। এটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কিছু নয় বরং পরিকল্পিত। সেই বিবেচনায় ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যা অবশ্যই ‘জেনোসাইডাল কিলিং’।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির জেগে ওঠার উন্মেষকাল। ইতিহাসে প্রমাণ মেলে, ভাষা আন্দোলনের পুরোটা জুড়েই বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান ছিল স্থির এবং একতাবদ্ধ। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে যে আন্দোলন করেছিলেন, সেটাই ক্রমান্বয়ে স্বাধিকারের দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। এরপরের ইতিহাসে ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ সালের ছয় দফা, ’৬৯ সালের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০ সালের নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বুদ্ধিজীবী সমাজ সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপ্লব জাগ্রত করেছেন। বুদ্ধিজীবীরা একদিকে যেমন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবিচারের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, অন্যদিকে বাঙালির সাংস্কৃতিক যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছেন। এসব কারণেই মুক্তিয্ুেদ্ধর আগ থেকে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক জান্তাদের কাছে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছিলেন।

খুব সহজ কথায়, বুদ্ধিজীবীদের আলাদাভাবে লক্ষ করার পেছনে বেশ কটি কারণ ছিল। দেশভাগের পর বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশে যে কটি আন্দোলন হয়েছে তার প্রায় সব কটির শুরুটা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফসল, যা পরে রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিপূর্ণ রূপ নিয়েছিল। প্রতিটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেই আলোকবর্তিকা হয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বুদ্ধিজীবীরা। আর বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ।

২৫ মার্চ ১৯৭১ কালরাত থেকেই অপারেশন সার্চলাইট দিয়ে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল সেই রাতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫ মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ থেকে তুলে এনে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। ওইদিন প্রায় ২০০ জনের মতো বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ অন্য আরও অনেক স্থানে অবস্থিত নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ওপর বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাদের নৃশংসভাবে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়।

১৪ ডিসেম্বরের পৈশাচিক বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে স্থবির হয়ে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশ। ১৬ ডিসেম্বর দেশের বিজয় অর্জিত হলে মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজতে আসেন স্বজনরা। কিন্তু মরদেহগুলো অজস্র গুলি আর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকের পক্ষেই প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে, কুমিল্লায় মারা গেছে ৮৬ জন, যশোরে ৯১, রংপুরে ৭২, দিনাজপুর ৬১, পাবনা ৫৩, ময়মনসিংহ ৭৫, ফরিদপুর ৪৩, চট্টগ্রাম ৬২, খুলনা ৬৫, বরিশাল ৭৫ এবং রাজশাহীতে ৫৪ জনসহ সব মিলিয়ে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা ১১১১ জন। কিন্তু এই সংখ্যা যে প্রকৃতপক্ষে আরও বেশি সে বিষয়েও অনেক সাক্ষ্য পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের তদন্তের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষে একটি উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে, বেসরকারিভাবে একটি ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি’ গঠন করেছিলেন চলচ্চিত্রকার-লেখক জহির রায়হান। এই কমিটি একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছিল। জহির রায়হানের বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি শুধু তথ্য-বিবরণই সংগ্রহ করেনি, বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য দায়ী আলবদরের কয়েকজন নেতাকে খুঁজে বের করে পুলিশের হাতে সোপর্দও করেছিল।

তদন্ত কমিটির প্রধান জহির রায়হান বলেছিলেন, ‘এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনস্ক বুদ্ধিজীবীদের বাছাই করে আঘাত হেনেছে।’ কিন্তু ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হান নিজেই নিখোঁজ হন। সে ঘটনায় আবারও থমকে গিয়েছিল সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ।

শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে ঢাকার রায়েরবাজারে নির্মাণ করা হয়েছে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। এ ছাড়া সারা দেশে ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করা গেছে। বধ্যভূমি স্থায়ী শনাক্তকরণ বা সৌধ নির্মাণে রাষ্ট্রকে তেমন একটা এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবার রাষ্ট্রীয় কোনো ভাতা পান না। রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কোনো কোটা নেই এবং তাদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণের রীতিও তেমন একটা দেখা যায় না। দেশের বাহ্যিক উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক, মানসিক উন্নয়নের জন্য যে মেধা বা মননের চর্চা দরকার তা করার মানুষগুলো একাত্তরেই হারিয়ে গিয়েছে।

লেখক : শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের কন্যা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত