বিদ্রোহী কবিতার একশ বছর

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৫২ পিএম

বাংলা ভাষায় সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা সম্ভবত কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’। কবিতাটি রচনা করা হয়েছিল আজ থেকে ১০০ বছর আগে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা ও প্রকাশের শতবর্ষ পালিত হচ্ছে দুই বাংলা জুড়ে। এই দীর্ঘকালেও কবিতাটির আবেদন এতটুকু কমেনি। পাঠের আকাক্সক্ষা ফুরোয়নি। ‘বিদ্রোহী’ পাঠের স্বাদ পুরনো হয়নি। কী বিস্ময়কর ধ্রুপদী শিল্পসৃষ্টি এই ‘বিদ্রোহী’। এমন অসাধারণ শব্দচয়ন, স্বতন্ত্র ভাষারীতি ও অভিনব ছন্দের গাঁথুনিতে রচিত বিদ্রোহ-দৃপ্ত, রুদ্ররোষে বলীয়ান কবিতা বাংলা সাহিত্যে আর একটিও নেই। এমনকি বিশ্বসাহিত্যেও এর তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। এই কবিতাটিতে ব্যক্ত হয়েছে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, স্বাধীনতা ও মুক্তির সাধ, বিশ্বমানবিকতা, নির্যাতন-নিপীড়নে দ্রোহ, সত্য সুন্দর ও কল্যাণের চিরকালীন আকাক্সক্ষা। এই কবিতা যখন লেখা হয় নজরুল তখন মাত্র ২২ বছরের তরুণ। পরাধীন দেশের বদ্ধ জীবনের সংস্কার-ভাঙা এক তরুণ ছন্দের নেশায় মাতাল হয়ে একাধারে শিবের জটা, ইস্রাফিলের শিঙ্গা বা শ্যামের বাঁশি হয়ে উঠছেন অবলীলায়। লিখছেন, ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’ কিংবা ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন’! বস্তুত এই কবিতার জন্ম বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সাড়া জাগানো ঘটনা। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকা, ব্রিটিশরাজের অনুগ্রহ-প্রত্যাশী বাঙালি জাতিকে নজরুল এ কবিতার মাধ্যমে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিলেন। বিশেষ করে মুক্তিকামী বাঙালি তরুণ সমাজের কাছে এ কবিতা ছিল রক্তে উন্মাদনা সৃষ্টিকারী, হৃদয়ে অগ্নি-প্রজ্বলনকারী এক বজ্রকঠিন বার্তা। তাদের হয়ে যেন নজরুল বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন: ‘আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!’

এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে এই কবিতাটি লেখা হয়েছিল। প্রথম মহাযুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে সারা ভারতবর্ষ তখন টালমাটাল। নজরুল তার সৈনিকজীবন সমাপ্ত করে ফিরে এসেছেন কলকাতায়। একইসঙ্গে করছেন সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক আন্দোলন। এমনই এক উত্তাল সময়ে ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে নজরুল রচনা করেন তার কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। কবিবন্ধু ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজাফ্ফর আহমেদের মতে, বিদ্রোহী রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের কোনো এক রাতে। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় ইংরেজি ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি। কবিতাটি প্রকাশ হওয়া মাত্র এমনই জনপ্রিয় হয় যে, একই সপ্তাহে প্রকাশক পত্রিকাটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের করেন।  বিদ্রোহী প্রকাশের পর পরই সমাজে সৃষ্টি হয় ব্যাপক আলোড়ন। মুসলিম সমাজে কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তাদের মতে নজরুল ধর্মদ্রোহী ও কাফের হয়ে গেছেন। তিনি ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেছেন। বিদ্রোহীতে নজরুল লিখেছেন : ‘ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া/খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া/উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর।’

শুধু যে মুসলিম সমাজ কবি নজরুলের সমালোচনা করে তাকে কাফের মুরতাদ কিংবা হিন্দুয়ানি আখ্যা দিয়ে বিতর্কিত করেছিল তা নয় হিন্দু সমাজও তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ‘উগ্র মুসলমান’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। তৎকালীন হিন্দু লেখকসমাজ কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র আরবি, ফার্সি শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত শব্দের মেলবন্ধনকে মেনে নিতে পারেনি। মেনে নিতে পারেনি ‘বিদ্রোহী’র দ্রোহ ভরা লাইনগুলোকে। কবি তার দ্রোহের প্রকাশ ঘটিয়েছেন এভাবে: ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দিব পদ-চিহ্ন!/আমি খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।’  তিনি আরও লিখেন: ‘আমি মানব দানব দেবতার ভয়,/বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়।/জগদ্বীশ্বর ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য/আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্য!’‘বিদ্রোহী’ কবিতা মুসলিম এবং হিন্দু সমাজে সমালোচনা সৃষ্টির পাশাপাশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ব্রিটিশশাসিত পুরো উপমহাদেশে। বিদ্রোহী কবিতার মাধ্যমে কবি আমাদের কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয় সেটা দেখিয়েছেন। কবিতাটির বিষয়বস্তু প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ। তবে এ প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ কেবল পরাধীনতার বিরুদ্ধে নয়, বরং সব অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে। শাসক, শোষক, পীড়কের বিরুদ্ধে এ লড়াই শাসিত, শোষিত ও পীড়িতের। এ চিরন্তন লড়াইয়ে নেতৃত্বদানের জন্য কবি এমন এক বীরের কল্পনা করেছেন, যে বীরের ‘চির উন্নত শিরে’র স্বরূপটি তিনি কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে :

‘‘ বল বীর

বল চির উন্নত মম শির!

শির নেহারি আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!”

কবির এই দীপ্ত উচ্চারণ আজও প্রতিটি বাঙালি এবং বাংলাভাষীকে সমানভাবে আলোড়িত করে। অন্যায়, অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে সাহস ও শক্তি জোগায়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এই আহ্বান মানুষের মুক্তির আহ্বান, আত্মজাগরণের আহ্বান। নজরুল এই জাগরণের আহ্বানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমানসের মুক্তি চেয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি বলেছেন:

‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না,

বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেইদিন হব শান্ত।’

‘বিদ্রোহী’ কবিতা সৃষ্টির এই শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি এর অমøান তাৎপর্যের কথা। উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বায়নের শৃঙ্খল আর ধনতন্ত্রের শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার নির্যাতনসহ আর্থসামাজিক বৈষম্য সবকিছুই বলবৎ আছে। ‘অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণে’র তলে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল’ এই বাংলার আকাশে-বাতাসে আজও প্রতিনিয়ত ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়। অন্যদিকে মানুষের শক্তির প্রতি, তার বীরত্বের প্রতি অনাস্থাও সমানভাবে অটুট। তাই নজরুলের ভাষায়, শান্ত থাকার অবকাশ মিলছে না। চতুষ্পার্শ্বের প্রতিবাদহীন মেরুদণ্ডহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বিপুলভাবে কাম্য হয়ে উঠেছে ‘উন্নত মম শির’-এর বজ্রদীপ্ত ঘোষণা। শোষণ, পীড়ন আর বৈষম্য থেকে মুক্তির সংকল্প নিয়ে মানুষের অপরিমেয় শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে নজরুল-কথিত বিদ্রোহের রণে অবতীর্ণ হওয়ার যেন বিকল্প নেই।

মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার পথে বাধার পাহাড় তৈরি করে রেখেছে যে বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা, সেই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেই ছিল নজরুলের বিদ্রোহ। সেই সমাজব্যবস্থার ধারক যারা, সেই শাসক-শোষক জমিদার-মহাজন মোল্লা-পুরুত-সবার বিরুদ্ধেই তার বিদ্রোহ। তার পুরো সৃষ্টির পরতে পরতে বিধৃত হয়ে আছে জীবনের সমগ্রতার ধারক সদর্থক বিদ্রোহ-চেতনা। তার এই বিদ্রোহের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ-র কাছে লেখা সেই বিখ্যাত পত্রটিতে নিজেই তিনি জানিয়েছিলেন: ‘‘ ‘বিদ্রোহী’র জয়-তিলক আমার ললাটে অক্ষয় হয়ে গেল আমার তরুণ বন্ধুদের ভালোবাসায়। একে অনেকেই কলঙ্ক তিলক বলে ভুল করেছে, কিন্তু আমি করিনি। বেদনা-সুন্দরের গান গেয়েছি বলেই কি আমি সত্য সুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি? আমি বিদ্রোহ করেছি-বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে- যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন-পচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। হয়তো আমি সব কথা মোলায়েম করে বলতে পারিনি, তলোয়ার লুকিয়ে তার রূপার খাপের ঝলকানিটাকেই দেখাইনি- এই তো আমার অপরাধ। এরই জন্য তো আমি বিদ্রোহী। আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, সমাজের সকল কিছু কুসংস্কারের বিধি-নিষেধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙিয়ে গেছি, এর দরকার ছিল মনে করেই।” হ্যাঁ, নজরুল আমৃত্যু বিপ্লবচেতনা ধারণ করেছেন। সমাজ পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়েছেন কবিতার মাধ্যমে। সাম্যবাদী আদর্শের মহৎ কবি ছিলেন নজরুল। বিপ্লবচেতনাকে তার সমগ্রতার ধারণ ও প্রকাশ করতে পারেন যে-শিল্পী, তিনিই মহৎ শিল্পী। মহৎ শিল্পীদের প্রসঙ্গে সোভিয়েত বিপ্লবের মহানায়ক লেনিনও বলেছিলেন যে, প্রকৃত মহৎ শিল্পীর সৃষ্টিতে কোনো-না-কোনোভাবে, অতি সামান্য পরিমাণে হলেও, বিপ্লবের অপরিহার্য মর্মসত্যের প্রকাশ ঘটবেই। নজরুলের সৃষ্টিতে তো সামান্য পরিমাণে নয়, বিপুল পরিমাণে ও গভীরভাবেই প্রকাশ ঘটেছে বিপ্লবের মর্ম সত্যের। বলা যেতে পারে, তার সমগ্র সৃষ্টিই বিপ্লবের মর্মবাণীর ধারক। তাই, ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধায়-অভিহিত কাজী নজরুল ইসলাম তো আসলে ‘বিপ্লবী কবি’। আর তার ‘বিদ্রোহী’ তো এক কালজয়ী কবিতা। আজ থেকে একশ বছর আগে সব বাঙালিকে অত্যাচার, অবিচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য এই কবিতা সাহস জুগিয়েছিল। তখনকার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যেভাবে সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছিল, আজও তেমনিভাবে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে। যতদিন বাঙালি আছে, সংগ্রাম আছে, অত্যাচার ও অত্যাচারিত মানুষ আছে, নিপীড়ন ও নিপীড়িত মানুষ আছে, ততদিন বিদ্রোহী কবিতা আমাদের সঙ্গে থাকবে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত