বিচারফলের জ্ঞানকাণ্ড-৪

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২২, ১০:২০ পিএম

(তৃতীয় কিস্তির পর)

যাহা ৬২ তাহাই ৫৩ জ্ঞান বাবুর এ-মামলাতে। কালের ফাঁক ১০ বছর, ফলাফলের ফারাক নেই মোটে। ১৯৫৩-তেই যান আর ১৯৬২-তেই যান ভারতে, গেছেন তো সেই পাকিস্তান থেকে। কোটালীপাড়া আর চালিকাবাড়ি শুধু নয়, গোটা ফরিদপুরই তো ছিল তখন পাকিস্তানের চৌহদ্দির অন্দরে। সেই চালিকাবাড়িতে বাপ-দাদা চোদ্দপুরুষের ভিটেমাটি পাকিস্তানের জন্মেরও আগে থেকে। ছিলেন তারা ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক, ব্রিটিশের দখলদারিতে। ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট হয়ে পড়লেন পাকিস্তানি, ব্রিটিশেরই করা ‘ইন্ডিয়ান ইনেডপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’-এর মারপ্যাঁচে। সেই পাকিস্তানের চালিকাবাড়ি গ্রামে ১৯৪৯ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মালেন জ্ঞান বাবু পাকিস্তানি হয়ে, ১৯৫১ সালের ‘পাকিস্তান সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’-এর বিধানে। সেই চালিকাবাড়ি ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের শেষ প্রহরে পাকিস্তানের চৌহদ্দি চিরে ঢুকল বাংলাদেশের মানচিত্রে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে, স্বাধীনতার ঘোষণার সূত্রে সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধানে। দুপক্ষে বিসংবাদ নেই এসবে। এই বাংলাদেশের জন্মের ১০ (মতান্তরে ২০) বছর আগেই সটকে পড়া ‘পাকিস্তানি’ জ্ঞান বাবু ভারতে বাস করেন ‘অধ্যয়নং তপঃ’ করে। ১৯৭২-এ টুক করে ঢুকে পড়েন মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে। অমনিই কি না বনে যাবেন ‘বাংলাদেশি’ আপসেআপ! নাগরিকত্ব কি এতই সস্তা! মানতে নারাজ স্বরাজ সরকার। আরজ জ্ঞান বাবুর, ১০ (কিংবা ২০) বছর তার ভারতবাসে অশুদ্ধ হয় না মহাভারত। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নির্ধারণে আছে দুটি আইন। ১৯৫১ সালের ‘সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’ (সেই ‘পাকিস্তান সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’, পাকিস্তান ফেলে দিয়ে সেটাই চলছে বাংলাদেশে শুধু ‘সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’ নামে)। ১৯৭২ সালে হয়েছে ‘বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পরারি প্রভিশনস) অর্ডার’ (পিও ১৪৯/১৯৭২)। ‘সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’-এর ৩ নম্বর ধারার স্পষ্ট বিধান, এ আইনের আগেই বাংলাদেশের (আদিতে ছিল পাকিস্তানের) চৌহদ্দিস্থিত মাটিতে যাদের নিজের কিংবা পিতার কিংবা মাতার কিংবা পিতামহের কিংবা মাতামহের জন্ম তারা ১৯৫১-এর ১৩ এপ্রিল এ আইন বলবতের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের নাগরিক বনে যাবেন আপসেআপ, যদি কি না ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্টের পরে আর বাংলাদেশের (আদিতে ছিল পাকিস্তানের) বাইরে অন্য কোনো দেশের স্থায়ী নিবাসী না হয়ে থাকেন। ‘বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পরারি প্রভিশনস) অর্ডার’-এর ২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধানও তেমনি স্পষ্ট, এই আইনের আগেই বাংলাদেশের মাটিতে যাদের নিজের কিংবা পিতার কিংবা মাতার কিংবা পিতামহের কিংবা মাতামহের জন্ম তারা ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ এ আইন বলবতের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের নাগরিক বনে যাবেন আপসেআপ, যদি কি না ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ বাংলাদেশের চৌহদ্দির অন্দরে স্থায়ী নিবাসী থেকে থাকেন এবং তারপরও তেমনি থাকেন।

জ্ঞান বাবু জন্মেছেন বটে বাংলাদেশের চৌহদ্দিস্থিত মাটিতে কিন্তু, সটকেছেন তো ১৯৭১-এর ২৬ মার্চের ১০ (মতান্তরে ২০) বছর আগে। বাস করেছেন গিয়ে ভারতের চব্বিশ পরগনার নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে। ভারতবাসের সময়কালটাতে তার স্থায়ী নিবাস ছিল কোথায়? নাগরিকত্বের মামলায় প্যাঁচটা এইখানে। ভারতে আবাস যার তার নিবাস বাংলাদেশে হয় কী করে! সিধে কথা সাদা পোশাকের এসবি পুলিশের। সরকারই বিশ্বাস না করলে কে আর বিশ্বাস করবে পুলিশকে! আড়াই প্যাঁচ লাগিয়েছেন তো জ্ঞান বাবু আড়চোখে। বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারী গোলাম আযমের নাগরিকত্ব যদি না আটকায় তবে এই গোবেচারির নাগরিকত্ব যায় কী করে! তত দিনে গোলাম আযমের নাগরিকত্বের মামলায় হেরে গেছে সরকার সুপ্রিম কোর্টে। একবার নয়, দু-দুবার। হাইকোর্টে একবার (দ্বৈত বেঞ্চে মতদ্বৈধতায় তৃতীয় বেঞ্চে নিষ্পত্তি), আপিল বিভাগে শেষবার (সর্বসম্মত)। সবটাতেই নাহক রিভিউ বাধিয়ে আটকে রাখার ‘ভিউ’ তখনো জাগেনি সরকারের, তাই আপিলেই শেষ। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া গোলাম সাহেব শেষটায় বাস করেন গিয়ে পাকিস্তানেরই করাচিতে। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে বাংলাদেশের চৌহদ্দির বাইরে বাস করায় তাকে আর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গোনা যায় না, বরং তিনি বনে গেছেন পাকিস্তানি নাগরিক বলে তাকে বাংলাদেশের নাগরিক থাকার অযোগ্য ঘোষণা করে সরকার ১৯৭৩-এর ১৮ এপ্রিল। সেই আদেশ বেএক্তিয়ারি বলে ১৯৯৩ সালে বাতিল করে হাইকোর্ট বিভাগ। বহাল হয় সেই রায় আপিল বিভাগে ১৯৯৪ সালে। সেই রায় ছাপানো ৪৬ ডিএলআর (এডি) ১৯২-২৩৮ পৃষ্ঠার নজির পেশ করেন জ্ঞান বাবু। আরও করেন ৩৩ ডিএলআর ৩১৪, ৩২ ডিএলআর ১৬০, ২৫ ডিএলআর (এসসি) ৯। নাগরিকত্বের মামলা-ঝামেলার শুরু এ দেশে ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের পর থেকে। পাকিস্তানি জমানায় চোটটা (বেশির ভাগ) গেছে হিন্দুদের ওপর দিয়ে। চোট পাওয়াদের ব্যথা সারিয়ে গেছে সুপ্রিম কোর্ট। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পাসপোর্ট-ভিসা চালু হওয়ার আগে চিকিৎসার জন্য ভারত গিয়ে দেশে ফিরে কিরণ চন্দ্র দত্ত নাগরিকত্ব খোয়ানোর ঝামেলায় পড়েন। উদ্ধার পান হাইকোর্টে (১৫ পিএলআর ঢাকা ৪৩৬)। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় জান বাঁচাতে ভারত ভাগেন বিনয় ভূষণ, বর্ডার পারাপারে ঝামেলা এড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন একখানা মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট। দু-এক মাস পর ফিরেই পড়েন ঝামেলায়। উদ্ধার পান সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়ে ১৯৭৩ সালে [২৫ ডিএলআর (এসসি) ৯]। ভারতে গিয়ে দীর্ঘকাল পরে ফিরে এসে ঝামেলায় পড়েন আদিত্য চন্দ্র অধিকারী, উদ্ধার পান হাইকোর্টে ১৯৮১ সালে (৩৩ ডিএলআর ৩১৪)। অসিত রঞ্জন ১৯৬৪ সালে ভারতে গিয়ে ৮ বছর পর জ্ঞান বাবুর মতো ফিরে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২-এ। জ্ঞান বাবুর মতোই নাগরিকত্ব খোয়ানোর ঝামেলায় পড়েন। উদ্ধার পান হাইকোর্টে ১৯৮০ সালে (৩২ ডিএলআর ১৬০)। নাগরিকত্ব বিচারে স্থায়ী নিবাসটাই মাপা হয় আগে সব দেশে, সব রাষ্ট্রে। আবাস আর নিবাস এক নয় এ ক্ষেত্রে। আবাস অস্থায়ী (টেম্পরারি রেসিডেন্স), নিবাস স্থায়ী (Permanent Abode)। নাগরিকত্বের সঙ্গে যে স্থায়ী নিবাসের সম্পর্ক আইনি পরিভাষায় তাকে বলে ‘ডমিসাইল’ (Domicile)। ‘ডমিসাইল’-এর সম্পর্ক একটা দেশের সঙ্গে, রাষ্ট্রের সঙ্গে। যেই দেশে, যেই রাষ্ট্রে থাকে ‘ডমিসাইল’, সেই দেশের, সেই রাষ্ট্রের হয় নাগরিক। ‘ব্ল্যাকস ল ডিকশনারি’-তে সংজ্ঞায়িত হয়েছে, স্থায়ী নিবাস (পারমানেন্ট অ্যাবোড) হলো ডমিসাইল তথা ‘অনড় আবাস’, যা প্রয়োজনে বা খেয়ালখুশিতে সাময়িক ছেড়ে গেলেও চিরস্থায়ীভাবে পরিত্যাগ করার পরিকল্পনা থাকে না মোটে। ডমিসাইল হলো সেই আবাস যেখানে সত্যিই তার ভিটেমাটি, আসল গৃহস্থালি, কায়কারবার এবং নিজে কখনো সশরীরে না থাকলেও প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনাটা থাকে। রাজনৈতিক সমাজে আইনি ডমিসাইলটাই গুরুত্বপূর্ণ। এটার ওপরই নির্ভর করে ব্যক্তির সব ধরনের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা, দায়দায়িত্ব।

ডমিসাইল হতে পারে দু-রকমের : ‘ডমিসাইল অব অরিজিন’ (আদি নিবাস), আর ‘ডমিসাইল বাই চয়েস’ (চয়িত নিবাস)। প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকেই নির্দিষ্ট একটা ‘ডমিসাইল’ (Dmicile) তথা স্থায়ী নিবাস (Permanent Abode) দেয় আইন। সেটাই হলো ‘ডমিসাইল অব অরিজিন’ (আদি নিবাস)। এটা আসে জন্মসূত্রে। সেটাও আসতে পারে দুভাবে। জন্মভূমির সূত্রে, লাতিন ভাষায় যাকে বলে ‘Jus Soli’। আরেকটি হলো জন্মদাতা-দাত্রীর সূত্রে, বাংলায় বলে রক্তসূত্রে, লাতিনে বলে ‘Jus Sanguinis’। দুই সূত্রই আছে আমাদের নাগরিকত্বের আইন দুটিতে। আমাদের হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ দেশ-বিদেশের আইন-কানুন ঘেঁটে প্রথম থেকেই বলে চলেছে, ব্যক্তি যতই নড়া-চড়া করুক, নতুন কোনো ‘চয়িত নিবাস’ (ডমিসাইল বাই চয়েস) না নেওয়া পর্যন্ত ‘আদি নিবাস’ (ডমিসাইল অব অরিজিন) ‘নট নড়ন-চড়ন’। আদি নিবাস থেকে, নিজ দেশ থেকে সাময়িক অনুপস্থিতির কারণে কারও আদি নিবাস খোয়া যায় না, খারিজ হয় না নাগরিকত্ব। কতক্ষণে হবে সাময়িক? হতে পারে কয়েক বছর, যুগ, আমৃত্যুও; অবস্থাভেদে একেক রকম। ভিন্ন একটা দেশে গিয়ে হাজির হলেই সেই দেশের নাগরিক ‘বন গ্যায়া’, আর নিজ দেশের নাগরিকত্ব ‘খো গ্যায়া’ এমন ‘মজার মুল্লুক’ নাই বিশ্বে। ছেলের হাতের মোয়া নয় কোনো দেশের নাগরিকত্ব। রাষ্ট্রের ইশারা ছাড়া কেবল আপন আকাক্সক্ষায় কারও নাগরিকত্ব আসেও না, যায়ও না (অমলেন্দু পালের মামলা, পিএলআর ১৯৬০ ঢাকা ৩২৯)। গোলাম আযমের মামলায় প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বলা কথার সারকথা, স্থায়ী নিবাস আঁকড়ে রাখতে শেকড় গজিয়ে বসে থাকা লাগে না সেখানে। নানা কারণেই বাইরে যাওয়া পড়ে নাগরিকের। শুধু বাইরে থাকার কারণেই স্থায়ী নিবাস হাওয়া হয়ে যায় না কারও। সেই মামলায় আলাদাভাবে রায় লিখে তার সিদ্ধান্তের সহমত পোষণ করেছিলেন বিচারপতি এ টি এম আফজাল, বিচারপতি মুস্তাফা কামাল ও বিচারপতি লতিফুর রহমান। একে একে তারা প্রত্যেকে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন পরে। বিচারপতি মুস্তাফা কামাল তো বলেন (সারকথা), দেশে ভিটেমাটি না থাকলেও স্থায়ী নিবাসী থাকা আটকায় না কারও। প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান আরও বলেন (সারকথা), আদি নিবাস কারও চয়নের বা খেয়ালখুশির ব্যাপার নয়। ব্যক্তি এটা পায় ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনের ফলে। অগস্ত্যযাত্রা (চির জনমের জন্য যাওয়া) না হলে (Animo Non Revertendi, ‘আবার আসিব ফিরে’ বলে ইচ্ছেটা রেখে যাওয়া) অন্যখানে সরে গেলেই আদি নিবাস হাওয়া হয়ে যায় না। আদি নিবাসটা ঠিকই আছে বলে আইনের অনুমান খণ্ডাতে ‘মুন্ডু ঘোরানো’ প্রমাণ লাগবে। প্রমাণের দায় তার যে বলে আদি নিবাস খোয়া গেছে। তাকেই দেখাতে হবে, আদি নিবাসের বদলে নতুন নিবাসটা কোথায় চয়িত হয়েছে।  (পরবর্তী অংশ আগামী কিস্তিতে)

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত