নারায়ণগঞ্জে আমরা একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে দেখলাম। এতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে প্রায় ৬৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। সেলিনা হায়াৎ আইভীর এবারের জয়ের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক)মেয়র নির্বাচিত হলেন। তিনি জয়ের হ্যাটট্রিক করলেন। আমি নবনির্বাচিত মেয়র আইভীকে অভিনন্দন জানাই। একইসঙ্গে এই নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারার জন্য। এই নির্বাচনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়।
প্রথমত, এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল। এখানে কোনো হানাহানি, মারামারি হয়নি। এখানে দুই প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব সহিংসতায় পরিণত হয়নি। আরেকটা হলো এখানে কোনো কুৎসা রটনা হয়নি, মোটামুটিভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেই নির্বাচনের প্রচারণা ও ভোট গ্রহণ হয়েছে। প্রধান দুই প্রার্থী শিষ্টাচার রক্ষা করেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। যেটা আজকাল দেখা যায় না।
দ্বিতীয়ত, নাসিক নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্বাচন কমিশন এখানে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কোনো অভিযোগ লক্ষ করা যায়নি। তারা সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেছে।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে সরকার কোনোভাবেই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা করেনি। নারায়ণগঞ্জে এই নির্বাচনের সবচেয়ে লক্ষণীয় বার্তাটিও এই যে, সরকার যদি চায় তাহলে প্রভাব বিস্তার না করে, পক্ষপাতমূলক আচরণ না করে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। আর সরকার যদি বাধা দেয় তাহলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যাহত হয়। আসলে সরকার বাধা দিলেই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হয়। আমরা অতীতে বেশ কয়েকটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হতে দেখেছি। আমরা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন দেখেছি বিগত জাতীয় নির্বাচনে। আমরা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন দেখেছি গাজীপুর সিটি নির্বাচনে, খুলনা সিটি নির্বাচনে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক মাত্রায় পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছে। সেখানে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের হয়রানি করা হয়েছে, ঘরছাড়া করা হয়েছে। নানাভাবে বিরোধী প্রার্থীদের হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কিংবা সবার জন্য সমতল নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বিরাট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে জাতীয় নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে সিলমারার বিষয়েও তাদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে এবার আমরা এমন কিছু দেখিনি। অর্থাৎ এটা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ছিল না।
একটা নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ যুক্ত থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্টতা থাকে নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপরই দেওয়া আছে। এজন্যই তাদের স্বাধীন করা হয়েছে। এটাই তাদের দায়িত্ব। এরপর নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি সরকারের। সরকার মানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার মানে প্রশাসন। ফলে তারা যদি সহায়তা না করে কিংবা কোনো পক্ষ অবলম্বন করে তাহলে আর নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখা সম্ভব হয় না। তবে, এখানেও একটা কথা থাকে যে, নির্বাচন কমিশনের হাত কিন্তু অনেক লম্বা। সরকারে অসহযোগিতা কিংবা পক্ষপাতিত্বের কারণে যদি কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নাও হয় সেক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন কিন্তু চাইলে সেই নির্বাচনটি ঠেকিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, কমিশন ভোটগ্রহণ স্থগিত করে দিতে পারে, ফলাফল ঘোষণা স্থগিত করতে পারে এবং প্রয়োজনে তদন্ত সাপেক্ষে নির্বাচন বাতিল করে দিতে পারে। তবে, নির্বাচন যেহেতু রাজনৈতিক বিষয় এবং সরকার যেহেতু রাজনৈতিক তাই সরকারের ভূমিকাই আসলে শেষপর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নাসিক নির্বাচনে সরকার আসলে যে বার্তাটি দিতে চেয়েছে সেটা হলো, তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব এবং তাই সরকারের ওপর আস্থা রাখা যায়। সরকার এখানে একটা ঝুঁকি নিয়েছে। একটা ক্যালকুলেটিভ রিস্ক। হয়তো এটা তাদের জন্য বিরাট ঝুঁকি নয়। কারণ তাদের প্রার্থী হলো তারকা প্রার্থী। অতীতে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে, এমনকি দলীয় মনোনয়ন না নিয়েও তিনি বিজয়ী হয়েছেন। ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর একটা নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। ফলে মনোনয়ন দিয়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বানানোর পর সরকার যদি তার অনুকূলে বিশেষ কোনো ভূমিকা নাও নেয় তবুও তিনি বিজয়ী হয়ে আসার সম্ভাবনা রাখেন। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরটি হলো এটা একটা সিটি করপোরেশন নির্বাচন, এখানে জয়-পরাজয়ের কারণে ক্ষমতার বদল হয়ে যাবে না। এটা জাতীয় নির্বাচন নয়, এটা স্থানীয় নির্বাচন। এরপরও কথা থাকতে পারে যে, আওয়ামী লীগ সরকার এই ঝুঁকিটা নিল কেন? তারা এই ক্যালকুলেটিভ রিস্ক নিয়েছে কারণ সরকার এখন অনেক চাপের মধ্যে আছে। এই চাপ আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ দুটোই। আন্তর্জাতিক চাপ হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) শীর্ষ কর্মকর্তাসহ আমাদের কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এটা একটা বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশকে ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ না জানানোও একটা নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকার এসব মোকাবিলা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কারণ, এসব ঘটনায় বহির্বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মধ্যে পড়ছে। এ বিষয়ে সরকার যেমন চেষ্টা করছে তেমনি আমরা সবাই এসব বিষয়ে উদ্বিগ্ন। কেননা এটা সরকারের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি নাগরিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আর অভ্যন্তরীণ চাপের বিষয়টি হলো, এই নির্বাচন কমিশনের সব অপকর্মের জন্য সরকার প্রবলভাবে সমালোচিত হয়েছে। কারণ সরকারই এই নির্বাচন কমিশনকে নিয়োগ দিয়েছে। এছাড়াও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা নিয়েও সরকার চাপের মধ্যে আছে। সবাই নির্বাচন কমিশন আইন করার জন্য দাবি করা সত্ত্বেও সরকার আইন করা নিয়ে গড়িমসি করছে। আর নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সংলাপের নামে তারা একটা অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতার মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, এই নির্বাচন নিয়ে সরকার দেশের জনগণকে এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে তাদের ওপর আস্থা রাখা যায়। কারণ নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার পাশাপাশি আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির যে প্রাণ, অর্থাৎ উৎসবমুখর নির্বাচন সেটিও সেখানে দেখা গেছে। এদেশের মানুষ যে ভোট পাগল এটা নারায়ণগঞ্জে এই করোনার মধ্যেও ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন না হলে জনগণ ভোট দিতে আসে। ফলে নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার জনগণকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছে যে, তাদের ওপর আস্থা রাখা যায়। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। কারণ আস্থার প্রশ্নে দেশের মানুষের অত্যন্ত খারাপ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৩ সালেও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। কিন্তু একসময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই ছিল তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দাবিদার। তারাই একসময় বলেছিল যে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হয় না। দেখা গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তখন পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবং সবখানেই ক্ষমতাসীন দল ব্যাপক ভোটে পরাজয় বরণ করে। খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং রাজশাহীতে তখন আওয়ামী লীগের মেয়ররা ছিলেন এবং তাদের অনেকেই অনেক ভালো কাজও করেছিলেন। তবুও তারা পরাজিত হয়েছেন। এই চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের পরাজয়ের পর ২০১৩ সালের শেষ দিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়। বলা হতো গোপালগঞ্জের পর গাজীপুর হলো আওয়ামী লীগের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি। সেখানে সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করে নির্বাচনে জেতার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নির্বাচনকে প্রভাবিত করেনি। তাই সেখানেও ক্ষমতাসীনরা ব্যাপক ভোটে পরাজিত হয়েছে। সরকার মানুষকে এই বার্তাটিই দিতে চেয়েছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলেও কোনো সমস্যা নেই, দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়া সম্ভব। কিন্তু পরে দু-দুটো জাতীয় নির্বাচনের সময় দেশের মানুষের ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার অঙ্গীকার করেছিল যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পর সবাইকে নিয়ে একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তারা করবে। কিন্তু সরকার সেই অঙ্গীকারও রক্ষা করেনি। তাই অতীতে এমন বিশ^াসভঙ্গ হওয়ার কারণে এবারও এই একই কায়দায় কাজ হবে কি না, অর্থাৎ দেশের মানুষ দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হওয়ার এই বার্তার ওপর আস্থা রাখবে কি না সেটা বলা মুশকিল।
পরিশেষে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। নাসিক নির্বাচনে অনেক ইতিবাচক ঘটনার পাশাপাশি একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্তও আমলে নেওয়া দরকার। সেখানে ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি সত্ত্বেও ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের কারিগরি ত্রুটির জন্য ভোটগ্রহণ বিলম্বিত হয়েছে। অনেকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শেষে ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন। এখানে একটা কথা খেয়াল রাখা দরকার যে, বাংলাদেশে আমরা যে ইভিএম ব্যবহার করছি, এতে ভোট দেওয়ার কোনো পেপার ট্রেইল নেই। অর্থাৎ কাগজে কোনো রেকর্ড থাকছে না। ফলে নির্বাচন কমিশন আমাদের ভোটের বিষয়ে যা জানাবে সেটাই চূড়ান্ত, এটা ক্রস চেক করার কোনো ব্যবস্থা নেই। স্মরণ করা যেতে পারে এই কারণেই দেশের বিশিষ্ট প্রযুুক্তিবিদ অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী (কিছুদিন আগে প্রয়াত) এই ইভিএম কেনার অনুমোদনপত্রে স্বাক্ষর করেননি। আর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কারণে দেশটির নির্বাচন কমিশন পেপার ট্রেইলসহ ইভিএম ব্যবহারে বাধ্য হয়। ফলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এইরকম ত্রুটিপূর্ণ ইভিএম ব্যবহার করাটা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। বিষয়টি নির্বাচন কমিশন এবং সব রাজনৈতিক দলেরই আমলে নেওয়া দরকার।
লেখকঃ স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
