করোনা মোকাবিলায় দেশে টিকা উৎপাদনে জোর দিতে হবে

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০৩:১২ পিএম

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন, দেশে চলমান করোনার টিকাদান কর্মসূচি, করোনা সংক্রমণ ও টিকাসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : দেশে করোনা সংক্রমণের দুই বছরের কাছাকাছি সময় অতিক্রম করছি আমরা। এই সময়ে এসে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে ডেল্টা ধরন নিয়েও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছিল। কিছুদিন আগে করোনা শনাক্তের হার ১ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু এখন আবার পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার বেড়ে ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মহামারীর বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন?

ডা. এ কে আজাদ খান : এই মুহূর্তে করোনা পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে সত্যি। আবার ওমিক্রনে যত লোক আক্রান্ত হচ্ছেন তার তুলনায় হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর সংখ্যা কম। এটা হচ্ছে আশার কথা। তবে এখনো করোনা পরিস্থিতি সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই আছে। অনেক মানুষের কাছে ওমিক্রন সাধারণ ঠান্ডাজনিত অসুখের মতো মনে হবে। আক্রান্ত হওয়ার পর কারও কারও গলা শুকিয়ে যায়, সর্দি হয়, শরীরের জয়েন্টে ব্যথা বা মাথাব্যথা হতে পারে।

ওমিক্রনের লক্ষণগুলো খুবই হালকা হয়। ডেল্টা বা অন্য ধরনগুলোর মতো অতটা প্রকট নয়। অনেকের ফুসফুসের ওপরের দিকে ব্যথা হতে পারে। করোনার লক্ষণ দেখা গেলে যেসব সতর্কতা অবলম্বনের কথা আগে বলা হয়েছে, এখন সবাইকে সেগুলো মানতে হবে। ওমিক্রনের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার নেই। অনেকে করোনায় আক্রান্ত হলে দেখা গেছে, স্বাদ বা গন্ধের অনুভূতি চলে যায়। কাশি এবং উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর হয় কারও কারও। এখনো করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এই তিনটি প্রধান লক্ষণই দেখা যাচ্ছে। ওমিক্রনে আক্রান্ত হলে অনেক সময় হালকা ঠান্ডা লাগা বা সাধারণ অসুস্থতা মনে হতে পারে।

ওমিক্রনের সংক্রমণের যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে বুকের ওপরের অংশে ব্যথা, মাথাব্যথা, জ্বর, ক্লান্ত লাগা, শরীরে ব্যথা, গলা শুকিয়ে যাওয়া। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ওমিক্রন অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্তে জানা যাচ্ছে, ওমিক্রন একটু হালকা ধরনের। ডেল্টায় আক্রান্তদের মতো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা কম। এর ধরন ভালোভাবে জানার জন্য আমাদের আরও বেশি সিকোয়েন্সিং করতে হবে। তাহলে ধরনটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। আমাদের দেশে এটি কম হচ্ছে। তবে ওমিক্রন যে করোনার অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে কম ক্ষতিকর, তা নিশ্চিত করে বলার মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। করোনার সব ধরনের ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত নিজেদের বিস্তার করছে। এ কারণেই করোনার এরকম নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের জন্ম হচ্ছে। অনেক ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাসকে আরও বেশি ক্ষতিকর করে তুলতে পারে। আবার অনেকগুলো শুধু নিজেকে বিস্তার করে বা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওমিক্রন অতটা ক্ষতিকারক নয়। করোনার শুরুর দিকে যেভাবে লোকজন শ্বাসকষ্টে ভুগেছে এবার তা কম হচ্ছে। তাই হাসপাতালে যেতে হচ্ছে কম ও মৃত্যুর হারও কম। এটা সত্যি যে, করোনার ডেল্টা বা অন্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ওমিক্রন খুব দ্রুত ছড়ায়। এটাও ঠিক, ওমিক্রন ততটা প্রাণঘাতী নয়। বিশ্বব্যাপী দেখা গেছে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও অন্যগুলোর তুলনায় রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার হার অনেক কম।

এখন কেউ ওমিক্রন নাকি ডেল্টায় আক্রান্ত হয়েছেন, সেটা নিয়ে ভাবনার চেয়ে বরং করোনায় যাতে আক্রান্ত না হন, সবাইকে সে চেষ্টা করতে হবে। সেজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক পরতে হবে। কোনোভাবে আক্রান্ত হয়ে গেলে আইসোলেশনসহ চিকিৎসার যেসব পদ্ধতি আছে, সেগুলোই অনুসরণ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : করোনার ডেল্টা ধরনের দাপটে গত বছরের মাঝামাঝি দেশে করোনায় মৃত্যু, রোগী শনাক্ত ও শনাক্তের হার বেড়েছিল। তবে আগস্টে দেশব্যাপী করোনার গণটিকা দেওয়ার পর সংক্রমণ কমতে থাকে। গত ডিসেম্বরের প্রথম দিকেও দেশে করোনা শনাক্তের হার ১ শতাংশের ঘরেই ছিল। এখন নতুন করে বৃদ্ধির কারণ কী?

ডা. এ কে আজাদ খান : আগেই বলেছি ওমিক্রন যে হারে ছড়িয়ে পড়ছে সে হারে কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে না। মৃত্যুও তুলনামূলক কম। তবে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এখন যে হারে শনাক্ত হচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে পরীক্ষার বিপরীতে। করোনার যে ধরনটি এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, সেটি আমাদের দেশে আসার আগে প্রতিবেশী দেশে এসেছে। ইউরোপে এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এই ভাইরাসটি দেশে প্রবেশের পরেই দ্রুত বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের সীমান্ত এলাকায় স্ক্রিনিং বাড়াতে পারিনি। বিমানবন্দরসহ দেশে প্রবেশের অন্য ক্ষেত্রগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। ভাইরাসটি তাই প্রবেশ করতে পেরেছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে।

দেশ রূপান্তর : এর আগে আমরা করোনার শুরুর বছর লকডাউনের নানা ধরন দেখলাম। কঠোর লকডাউন, কঠোরতম লকডাউন থেকে শুরু করে শিথিল লকডাউনের দেখা মিলেছে। এমন পরিস্থিতিতে এবার সরকার ১১টি বিধিনিষেধ দিয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ডা. এ কে আজাদ খান : এখন দেশে করোনার যে সার্বিক পরিস্থিতি তাতে চলমান বিধিনিষেধ যা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে যে কোনো ধরনের শিথিলতাই ঝুঁকি বয়ে আনবে। এখন সরকার নানা দিক বিবেচনা করে, বিচার-বিশ্লেষণ করে যেটি প্রয়োজনীয় ও লাভজনক মনে করছে, সেটিই করবে। জনস্বাস্থ্যের বিবেচনায় এখন এই বিধিনিষেধ শিথিল করার সুযোগ নেই।

আমি বরং বাইরের একটি দেশের কথা বলতে পারি। যেমনএকটি দেশে যেখানে ধূমপান যারা করেন, তারা সরকারকে সে জন্য বাড়তি ট্যাক্স প্রদান করেন। কারণ, ধূমপান যিনি করেন তিনি তার নিজের ক্ষতির পাশাপাশি তার আশপাশের লোকজনের ক্ষতি করছেন। সেই ক্ষতিপূরণ করতে অর্থাৎ, তার চিকিৎসায় সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়। তাই যিনি ধূমপান করেন, তার অতিরিক্ত ট্যাক্স আদায় করতে হয়।

এখন আমাদের দেশেও যারা মাস্ক পরিধান করতে আপত্তি তাদের সাজার আওতায় আনা যেতে পারে। তবে আমাদের দেশের যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা সেটি করার আগে জনসাধারণকে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করা যেতে পারে। আমাদের যে পোশাক কারখানা রয়েছে তাদের ব্যবহার করে সরকার চাইলে যাদের মাস্ক কেনার সক্ষমতা নেই তাদের কাপড়ের মাস্ক যেটি বারবার ব্যবহার করা যায় তা দেওয়া যেতে পারে। যাতে করে পরে কেউ মাস্ক ব্যবহার করতে আপত্তি জানালে তখন তাকে শাস্তির আওতায় আনা যায়। সরকার চাইলে এটি সহজেই করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশের যে সরকারি ওয়েবসাইট সেখানে দেখা গেল ঢাকা ও রাঙ্গামাটি জেলা করোনা সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। এটি কেন বলে মনে করেন?

ডা. এ কে আজাদ খান : এই অঞ্চলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তাই এমনটা হয়েছে। ঢাকা একটি জনবহুল শহর এখানে সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে নতুন ধরন দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। আর রাঙ্গামাটি যেহেতু পর্যটন এলাকা, এমন হতে পারে কেউ ভাইরাসটি বহন করে সেখানে গিয়েছে। আর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়েছে।

দেশ রূপান্তর : দেশে করোনার এই বিরাজমান ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতিতে আপনার পরামর্শ কী?

ডা. এ কে আজাদ খান : এখন প্রথম যেটি করতে হবে, টিকার জন্য নিজস্ব উৎপাদনে যেতে হবে। দেশের ১৭ কোটি জনসাধারণ, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য আমদানিনির্ভর টিকার দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী টিকা উৎপাদনের কথা ঘোষণা দিলেও সরকার কেন সেদিকে অগ্রসর হচ্ছে না, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের দেশে টিকা উৎপাদনের সব ব্যবস্থাই আছে। তবুও শুরু করা যাচ্ছে না। এখন বিশে^র করোনার যে পরিস্থিতি তাতে করোনা আরও কিছুকাল স্থায়ী হবে বলেই মনে হয়। তাই করোনো মোকাবিলায় নিজেদের টিকা উৎপাদনের দিকেই মনোযোগী হতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনি একজন ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ। করোনার এই সময়ে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য কেমন ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন?

ডা. এ কে আজাদ খান : অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। অতিরিক্ত ওজন, মেদবাহুল্য, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, উচ্চ শর্করা ও কম আঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাস থাকলে ডায়াবেটিস হতে পারে। এ ছাড়া পরিবারের কারও ডায়াবেটিস থাকলে অর্থাৎ, উত্তরাধিকারসূত্রে হতে পারে, জন্মের সময় ওজন কম থাকা, প্রবীণদের মধ্যেও ডায়াবেটিস দেখা যায়। ডায়াবেটিস রোগীরা হৃদযন্ত্র ও রক্তনালি, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, অন্ধত্বসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। তাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এড়াতে সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, শারীরিক ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। এখন এই করোনা মহামারীর সময়ে ডায়াবেটিক রোগীদের নিয়মিত পরীক্ষা এবং ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ডায়াবেটিককে অনিয়ন্ত্রিত করা যাবে না। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিক রোগী করোনায় আক্রান্ত হলে তার ভয়াবহতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ডা. এ কে আজাদ খান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত