শত শত বছর ধরে উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো জীবন্ত রাবার ফিগ গাছ থেকে জটিল সেতু তৈরি করছে। নতুনভাবে কিছু তৈরি না করে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রাচীন সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের এ গল্প ঠাঁই পেয়েছে ইউরোপীয় শহরগুলোতেও। রাবার ফিগ গাছের তৈরি জীবন্ত সেতু নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
মেঘালয়ের সেতু
আকাশে বর্ষার মেঘ গুড়গুড়িয়ে উঠল। শৈলিন্দা সায়েমলিহ হেঁটে যাচ্ছেন। সামনে নদী দেখে থমকে দাঁড়ালেন এক মুহূর্ত। নদীর ওপর দিয়ে বিশাল এক সেতু। সেতু ধরে নদী পার হচ্ছেন আর পায়ের নিচে স্রোতের খেলা দেখছেন। চোখ বন্ধ করলে মানসচক্ষে যে সেতু দেখতে পাই, সে সেতুর ধারেকাছেও নেই এটি। এখানে কংক্রিটের খেলা নেই, ধাতুর ঝনঝনানি নেই, নেই কোনো বিশেষ আকৃতি। প্রকৃতিতে বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ব যখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর কথা ভাবছে, তখন এ সেতু বাঘা বাঘা স্থপতিদের থমকে দিচ্ছে। দৈত্যাকার রাবার ফিগ (Ficus elastica) গাছ নদীর এ পারে ডালপালা ছড়িয়ে বসে আছে। থরেথরে ছড়িয়ে আছে তার বায়বীয় শেকড় (Air root)। শৈলিন্দা যখন হেঁটে ওপারে যাচ্ছেন তার পায়ের নিচে থাকা পূর্বপুরুষের বানানো শতবর্ষী সেতু মনে করিয়ে দিচ্ছে ইট-কাঠ-পাথরের বাইরেও মানুষ টিকে ছিল। প্রযুক্তি মানেই কেবল নতুন কিছু তৈরি আর নতুন কিছুর প্রয়োগ নয়। প্রযুক্তি মানে সামনে থাকা প্রাকৃতিক জিনিসের নতুন রূপ দেখাও বটে। রাবার ফিগ গাছের বায়বীয় শেকড় বুনে বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা হয়েছে শক্তপোক্ত এক সেতু। এ সেতু প্রকৃতিতে কার্বনের হার বাড়াবে না, এ সেতু বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করবে না, পালটে দেবে না নদীর স্রোত। মেঘালয়ের পুবদিকের পার্বত্য অঞ্চলের তিরনা গ্রাম। কয়েকশ বছর ধরে আদিবাসী খাসিয়া ও জৈন্তিয়া সম্প্রদায়কে বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠা নদী অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে এ প্রাকৃতিক সেতুগুলো। শৈলিন্দার মুখ থেকে শোনা গেল তার পূর্বপুরুষের আখ্যান। তিনি জানালেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা নদী পার হতে পারতেন না। তারা ছিলেন বুদ্ধিমান। সে কারণে গাছকেই জীবন্ত সেতু করে তুলেছিলেন।’
মেঘালয় পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের স্থানগুলোর একটি। বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে ধরা হয় মাওসিনরাম গ্রামকে। এখানের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১১ হাজার ৮৭১ মিলিমিটার (৩৯ ফুট)। সহজ ভাষায় বললে এ এলাকা একবার প্লাবিত হলে তিনতলা বাড়িকেও নিমজ্জিত করার ক্ষমতা রাখে। বৃষ্টিপাতের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সোহরা। এখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১১ হাজার ৪৩০ মিলিমিটার (৩৭.৫ ফুট)। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। সে মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের আর্দ্র সমভূমি হয়ে মেঘালয়ের পার্বত্য ভূখ-ের বায়ুর সঙ্গে মিলিত হয়। ওই মিলিত আর্দ্র বায়ু মুষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু করে।
যখন বর্ষার বৃষ্টি নিকটবর্তী শহরগুলো থেকে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোকে আলাদা করে ফেলে, তখন তাদের সহায় হয়ে দাঁড়ায় এ জীবন্ত সেতুগুলো। প্রকৃতি মানুষের পারস্পরিক সঙ্গ যাপনের অপূর্ব নিদর্শন এই সেতু। বর্ষার জলে প্লাবিত অঞ্চলে রাবার গাছের বায়বীয় শেকড় বুনে বুনে জীবন্ত সেতু তাদের থমকে যাওয়ার জীবনে আনন্দ যাপনের স্বাদ এনে দেয়।
গবেষকরা এই জীবন্ত সেতুগুলোকে আদিবাসী জলবায়ু সহনশীল স্থাপত্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন। নদীর দুপাশে সংযোগ দেওয়া ছাড়াও এ সেতু বর্তমানে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্থানীয় লোকদের আয় বাড়িয়েছে এই সেতু। এদিকে গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন সেতুগুলো পরিবেশে পুনরুৎপাদনের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। জীবন্ত স্থাপত্যের এই ধারণাটি অন্যান্য আধুনিক শহরেও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আরও ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করবে।
নির্মাণে কয়েক দশক
এ সেতুগুলো তৈরিতে সাধারণত কয়েক দশক সময় প্রয়োজন হয়। বলা যায় ফাইকাস ইলাস্টিকার একটি চারা রোপণের সঙ্গে সঙ্গে সেতু তৈরির কাজ শুরু হয়। মেঘালয়ের উপক্রান্তীয় অঞ্চলে বিশেষত নদীতীরে এ গাছ প্রচুর পরিমাণে জন্মে। প্রথমে গাছগুলো প্রধান শেকড় বিকশিত হয়। গাছের বয়স ১০ বছর হলে পরিপক্ব সে গাছগুলোর ওপরের অংশ থেকে অনেক গৌণ শেকড় বের হয়। মূলত সে শেকড় দিয়েই তৈরি হয় জীবন্ত সেতু। সেসব বায়বীয় শেকড়ের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো স্থিতিশীল রূপ লাভ করে।
কয়েকশ বছর ধরে নিখুঁতভাবে সেতু নির্মাণের সঙ্গে জড়িত খাসিয়া লোকজন নদীর এক তীরে বায়বীয় শেকড় বুনে বুনে বড় করে। এরপরে সেতুর ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। সেই দীর্ঘ ব্যাপ্তি অবশেষে নদীর অন্য তীরে গিয়ে ঠেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেতু তৈরিতে ব্যবহৃত মূল শেকড় আশপাশ দিয়ে আরও অনেক শাখা শেকড় ছাড়ে। নদী থেকে উঠে আসা জলীয় বাষ্প শাখাশেকড়কে পুষ্ট হতে সাহায্য করে। পরে এই শেকড়গুলো নিয়ে নদীর অন্যতীরের ভিন্ন এক রাবার ফিগের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়। অ্যানাস্টোমোসিস নামক এক প্রক্রিয়ায় গাছের বায়বীয় কাণ্ড একীভূত হয়ে একটি কাঠামো দাঁড় করায়। কখনো কখনো আবার খাসিয়া নির্মাতারা কাঠামোর বড় বড় ফোকর ঢাকতে পাথর ব্যবহার করে থাকেন। শেকড়ের এই ঘন জাল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারবহনে পক্ব হয়। এ ধরনের সেতু সাধারণত একবারে ৫০ জনের ওজন ধরে রাখতে সক্ষম।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে
প্রাথমিকভাবে সেতু নির্মাতাদলের পরবর্তী প্রজন্মের ওপরে সেতু রক্ষণাবেক্ষণের ভার বর্তায়। ছোট আকৃতির সেতু রক্ষণাবেক্ষণে একজন ব্যক্তিই যথেষ্ট। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবার বা পুরো গ্রামের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এক একটি সেতু পূর্ণ রূপ পায়। কখনো কখনো কয়েক গ্রামের মানুষ মিলে এক একটি সেতু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেনএমনটিও দেখা যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের যতœ ও উন্নয়নের এই প্রক্রিয়া জীবন্ত সেতুগুলোকে শত শত বছর ধরে ব্যবহারোপযোগী করে রেখেছে।
জীবন্ত সেতুগুলো স্থাপত্যের বিচারে পুনরুৎপাদনের একটি মাধ্যম। প্রাকৃতিকভাবেই প্রতিটি সেতু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়, বদলায় কাঠামো, ভার নেওয়ার ক্ষমতা। কারণ সেখানে এক গাছের সঙ্গে অন্য গাছের শেকড় এসে যুক্ত হয়। সময়ের বিচারে মনুষ্যনির্মিত স্থাপত্যের মতো এই জীবন্ত স্থাপত্য ক্ষয়ে যায় না। বরং জীবনের প্রকাশে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, প্রাকৃতিকভাবেই মেরামত করতে পারে নিজস্ব ক্ষত, বয়সের সঙ্গে প্রবীণ সেতুর ঝুলিতে থাকে একা একা পথচলার অভিজ্ঞতার পালক। তাই এখানকার কিছু সেতুর বয়স ৬০০ বছর। শৈলিন্দা বললেন, ‘যখন ভারী বৃষ্টিপাত হয় তখন সিমেন্টের সেতুগুলোয় সিমেন্টের আস্তরণ ধুয়ে যায়। ইস্পাতের সেতুতে মরচে ধরে। কিন্তু জীবন্ত সেতুগুলো বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, কারণ বৃষ্টি তাদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। আমার পূর্বপুরুষ বুঝতে পেরেছিল আধুনিক সেতুর বিপরীতে আমাদের জীবন্ত সেতুগুলো অনেক বেশি টেকসই আর তাতে তেমন কোনো খরচ নেই। তাই গ্রামবাসীরা এখন যেকোনো বন উপত্যকায় কোনো জীবন্ত সেতুতে কোনো বড় ফাটল দেখার আগেই সেটা মেরামত করে ফেলে।’
এ সেতুগুলো পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠার পেছনে অব্যাহত অবদান রেখেছে ‘লিভিং ব্রিজ ফাউন্ডেশন’-এর রাংথাইললিয়াং গ্রামের বাসিন্দা মর্নিংস্টার খোংথাও। তার দলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জীবন্ত সেতুর প্রতি মানুষের নতুন করে আগ্রহ জন্মেছে, বেড়েছে সচেতনতা। স্থানীয় মানুষ আগের চেয়ে সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে অনেক বেশি সচেষ্ট।
বিশেষজ্ঞের চোখে
প্রচলিত সেতুর বাইরে শেকড়ের এই সেতুগুলো জীবন্ত স্থাপত্যই শুধু নয়, গাছের জীবদ্দশায় তারা প্রচুর গ্রিনহাউজ গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে। মাটিকে করে স্থিতিশীল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বর্ষার সময় পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের পরিমাণ আশঙ্কাজনক অবস্থায় বেড়ে যায়। ভূমিধস রোধ করে এই জীবন্ত সেতু। মিউনিখের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচারের গ্রিন টেকনোলজির অধ্যাপক ফার্দিনান্দ লুডভিগ গত ১৩ বছর ধরে জীবন্ত সেতু নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, প্রচলিত সেতুগুলো মাটির স্তরকে ব্যাহত করতে পারে, কিন্তু শেকড় বিভিন্ন স্তরের মাটির কাঠামোকে নোঙরের মতো আটকে রাখতে পারেযা মাটি ক্ষয়রোধ করে।
মেঘালয়ের স্থানীয় মানুষ এবং বায়োডাইভার্সিটি ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানী সালভাদর লিংডো বলেন, স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গাছ। কিন্তু ফাইকাস ইলাস্টিকার কাজের প্রভাব আরেকটু বেশি। হিমালয় সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই গাছ। ফাইকাস গোত্রের বেশিরভাগ প্রজাতি তার চারপাশের জীববৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করে। কাণ্ডে মস জন্মে, শাখায় বাস করে কাঠবেড়ালি, পাখিরা তাদের ছাউনিতে বাসা বাঁধে এবং পোকামাকড় বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরাগায়নে ভূমিকা রাখে এই গাছ। তিনি আরও বলেন, এ গাছগুলোকে সেতুতে পরিণত করার মাধ্যমে প্রাণী বাসস্থানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। বনের এক স্থান থেকে অন্যস্থানে হরিণ ও চিতাবাঘ চলাচল করতে পারে এ সেতুর মাধ্যমে।
লুডভিগ এই সেতুগুলোকে কেবল টেকসই উন্নয়ন হিসেবে দেখেন না। জীবন্ত সেতুগুলোকে তিনি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার পুনর্জন্ম হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘(প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া) এ সেতুগুলো নির্মাণের কোনো উপায় নেই। কীভাবে এ শেকড় টানা, বাঁধা হয় এবং একসঙ্গে বোয়া হয় তার পদ্ধতি নির্মাতা ভেদে আলাদা হয়। ফলে কোনো দুটো সেতুর চেহারা একরকম হয় না।’
সেতুগুলো সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে লিখিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। গবেষণার ক্ষেত্রে তথ্য স্বল্পতা একটি চ্যালেঞ্জ। উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় পর্যন্ত মেঘালয়ের স্থানীয় খাসিয়া অধিবাসীদের লিখিত লিপি ছিল না। কারণ খাসিয়া জীবনযাত্রা সাধারণত মৌখিক ইতিহাসের মাধ্যমে চলে। ফলে সবমিলিয়ে জীবন্ত সেতু নিয়ে নথিভুক্ত তথ্য বিরল। লুডভিগের গবেষক দল তাই খাসিয়া সেতু নির্মাতাদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে সেতু নির্মাণ কৌশল বোঝার চেষ্টা করেছেন। ফটোগ্রাফ ব্যবহার করে রুট ব্রিজগুলো রেকর্ড, জরিপ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেগুলোর ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেছেন।
লুডভিগ ভেবেছিলেন তারা ইউরোপেও এ পদ্ধতির মাধ্যমে কিছু না কিছু তৈরি করতে পারবেন। কিন্তু তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। কারণ খাসিয়া লোকদের জীবনাচরণের সঙ্গে মিশে গেছে এই সেতু। তারা জানে কীভাবে গাছের ক্রমাগত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণ ও মিথস্ক্রিয়া করবে এবং তারা সে অনুযায়ী অবস্থার সঙ্গে খাপ খেতে সক্ষম।
তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের উপায় একটিই। তা হলো টেকসই ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিসের প্রতি উৎসাহী হওয়া। এগুলো ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। সেতুগুলো অনুলিপি করার জন্য নয়, বরং দেশীয় প্রকৌশলের উপাদানের ধারণা থেকে বোঝার চেষ্টা করা যে, আমরা কীভাবে আমাদের শহুরে পরিবেশে এটিকে মানিয়ে নিতে পারি।’ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থপতি ও সহকারী অধ্যাপক জুলিয়া ওয়াটসন আদিবাসীদের প্রকৃতিভিত্তিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন। তিনি জানালেন, ‘সেতু তৈরির এ প্রক্রিয়া আমাদের গাছ দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দিয়েছে।’
তিনি বলেন, শহরগুলোতে গাছকে নিষ্ক্রিয় উপাদান হিসেবে না দেখে আমরা তাদের সক্রিয় অবকাঠামো হিসেবে দেখতে পারি। শহুরে প্রেক্ষাপটে গাছগুলোর বাস্তুতন্ত্রের ভালো দিকগুলো আমরা চাইলেই সম্প্রসারণ করতে পারি। উদাহরণস্বরূপকংক্রিটের কাঠামো তাপ শোষণ করে শহরগুলোকে উষ্ণ রাখে। সেখানে ছায়া দেওয়া গাছ শহুরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিল্ডিংয়ের সামনে বা ছাদে গাছ রাখার বিষয়টি আমরা চাইলেই অবিচ্ছেদ্য করে তুলতে পারি।
জীবনাচরণে সেতুর প্রভাব
ফিরে আসি মেঘালয়ে। খাসিয়া সম্প্রদায়ের জৈব প্রকৌশলের অভ্যাস গাছের সঙ্গে চারপাশকে একীভূত করার কাজটি খুব সহজে করে দিয়েছে। মানুষের সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রকে একত্রিত করার মধ্যে দিয়ে সম্প্রদায়গত জীবনাচরণকে উৎসাহিত করে তারা। মানুষ যখন সেতুনির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য একত্রিত হয়, তখন সমাজে শান্তি বিরাজ করে। কারণ সম্প্রদায় কখনো নিজের কথা বা আজকের কথা ভাবে না। নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যায়।
লিভিং ব্রিজ ফাউন্ডেশন ছাড়াও মর্নিংস্টার খোংথাও পর্যটকদের জন্য একটি জাদুঘর ও একটি শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ করেছেন। যেখানে পর্যটকরা ফাইকাস ইলাস্টিকার জীবন্ত সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো সম্পর্কে জানতে পারেন। জুলিয়া ওয়াটসন বলেন, ‘জীবনযাপনের অবকাঠামোয় কেবল মানুষ নয়, প্রকৃতির মেলবন্ধনও দরকার।’
খাসিয়া সংস্কৃতির অংশ হওয়ার পাশাপাশি এসব জীবন্ত সেতু তাদের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধাও বয়ে এনেছে। এগুলোর মাধ্যমে নিকটবর্তী শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পান ও ঘাস পরিবহনের মাধ্যমে খাসিয়াদের অর্থনৈতিক চাকাও সচল রাখে জীবন্ত সেতু। জীবন্ত সেতু তো জীবনের কথাই ভাববে, তাই না?
