সাফারি পার্কে নয় জেব্রার ‘রহস্যময়’ মৃত্যু, স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় ১০ নির্দেশনা

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:২৫ পিএম

এশিয়ার বৃহৎ সাফারি পার্ক গাজীপুরের শ্রীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক বেশ দর্শনার্থীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দেশি-বিদেশি নানা প্রাণী ও পাখির বৈচিত্র্যময় সম্ভারে মুগ্ধ আগত দর্শনার্থীরা। 

এই সাফারি পার্কে বিভিন্ন সময় প্রাণীর মৃত্যু ঘটলেও সব চেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে গেছে গত বিশ দিনে। এই কয়দিনে অন্তত ৯ টি বড় আকারের জেব্রা মারা গেছে। এ নিয়ে সাফারি পার্কে চাপা ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা-সমালোচনাও চলছে। এতগুলো জেব্রার মৃত্যুর রহস্য কাটছেই না।

কি কারণে পর পর অল্প কদিনে এতগুলা জেব্রা মারা গেল তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বলে জানিয়েছেন পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. তবিবুর রহমান।

সাফারি পার্কের নয়টি জেব্রার মৃত্যুর ঘটনায় ৬ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের ছয় সদস্য হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক আবু হাদি নুর আলী খান, সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রফিকুল আলম, অধ্যাপক কাজী রফিকুল ইসলাম, জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. উকিল উদ্দীন, পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. সাজ্জাদ জুলকার নাইন মানিক ও ঢাকা চিড়িয়াখানার সাবেক কিউরেটর এবিএম শহীদুল্লাহ। 

মঙ্গলবার বিকেলে পার্কের প্রকল্প পরিচালক মো. জাহিদুল কবির ও মেডিকেল টিমের সদস্য এবিএম শহীদুল্লাহ সাংবাদিকদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেন।

তারা জানান, মৃত প্রাণীর শরীরের কিছু নমুনা পরীক্ষায় পাঁচটি ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আরও কিছু পরীক্ষার রেজাল্ট আসতে সময় লাগবে। এ ছাড়া, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে চারটি জেব্রা মারা গেছে।  

মেডিকেল টিম দশটি নির্দেশনা দিয়ে প্রাণীর স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় কাজ করতে পার্ক কর্তৃপক্ষকে বলে দিয়েছে।

এবিএম শহীদুল্লাহ বলেন, নয়টি জেব্রার পাকস্থলীর বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করে নাইট্রো ফসফরাসসহ পাঁচটি ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে কোনো ভাইরাস পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলো হলো- স্টেপটৌ কক্ককাস, ই-কলাই, ক্লোসটিডিয়াম, সালমোনেলা ও পেস্টোরেলা। 

পার্কের প্রকল্প পরিচালক মো. জাহিদুল কবির জানান, পার্কের আফ্রিকান সাফারি জোনে অন্য সব প্রাণীদের সঙ্গে জেব্রার পাল বসবাস করে। জেব্রাগুলোর এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। মৃত প্রাণীর শরীর থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে বিভিন্ন ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। 

সূত্র জানায়, এ বছরের শুরুতেই একটি জেব্রা মারা যায়। পরে পর্যায়ক্রমে ২ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি সোমবার পর্যন্ত একের পর এক করে নয়টি জেব্রার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মৃত প্রাণীগুলোর মধ্যে সাতটি পুরুষ ও দুইটি নারী জেব্রা রয়েছে। আরও বেশ কটি জেব্রা অসুস্থ বলে সূত্র জানিয়েছে।

পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. তবিবুর রহমান জানান, পার্কে আফ্রিকা থেকে জেব্রাসহ অন্যান্য প্রাণী আমদানি করা হয়। পার্কে মোট ৩১ টি জেব্রা ছিল। এখন নয়টি জেব্রার মৃত্যুর পর রয়েছে ২২টি জেব্রা। মৃত প্রাণীর মরদেহের নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সোমবার পার্কে ঘাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক সিরাজুল ইসলামকে নিয়ে মানিকগঞ্জে গিয়েছি। সেখান থেকে ঘাসের স্যাম্পল (নমুনা) সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘাস উৎপাদন করা কৃষকদের সঙ্গেও কথা বলেছি। সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাফারি পার্কের চারণভূমির ঘাস ও পার্কের মাটি পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। 

তিনি বলেন ক্রমাগত জেব্রার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এখান থেকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় সম্প্রতি কিছু জেব্রা পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন মৃত্যু পার্ক সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মচারী জানান, সাফারি পার্কে জেব্রাসহ অন্য প্রাণীদের খাওয়ার জন্য কাঁচা ঘাস সরবরাহ করে মাহবুব এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। পার্কের চারণভূমির ঘাস খাওয়ানোর পাশাপাশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘাস এনে জেব্রাসহ অন্য প্রাণীদের খাওয়ানো হয়। এসব ঘাসেও বিষক্রিয়া হতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছে। এমন চিন্তা থেকেই মানিকগঞ্জের যে সব এলাকা থেকে কাঁচা ঘাস আনা হতো পার্কের কর্মকর্তারা সেসব এলাকায় পরিদর্শনে গেছেন। ঘাস চাষিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেসব এলাকার ঘাসের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।    

পার্কের প্রকল্প পরিচালক মো. জাহিদুল কবির বলেন, এক সাথে এতগুলো জেব্রার এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান চলছে। প্রত্যেকটির মরদেহ ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। মরদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে কিছু প্রাথমিক রিপোর্ট এসেছে মেডিকেল টিমের কাছে।

তিনি বলেন, মেডিকেল টিম নতুন করে প্রাণীর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে দশটি নির্দেশরা প্রদান করেছেন। আমরা আরও সতর্ক থাকব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত