র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিগগিরই প্রত্যাহার হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সরকার ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা আমেরিকার সঙ্গে একাধিক মিটিংয়ের আয়োজন করেছি।
এ ছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপি-জামায়াত আটটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই লবিস্ট নিয়োগে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেই তথ্যও সংসদে দিয়েছেন তিনি।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপি-জামায়াত ও সরকারের লবিস্ট নিয়োগের প্রসঙ্গ নিয়ে এই বিবৃতি দেন।
আব্দুল মোমেন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিতে সরকার ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। প্রসেস কালকেই হবে না, সময় লাগবে। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক মিটিংয়ের আয়োজন করেছি। ইনশা আল্লাহ আমরা যখনই তথ্যগুলো সঠিকভাবে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারব, আমার বিশ^াস র্যাবের মতো একটি ভালো প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিশ্চয়ই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার র্যাবের এবং এর কতিপয় সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা ছাড়াই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অপপ্রচারের কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা এসেছে। র্যাবের বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন লবিস্ট প্রতিষ্ঠান, আমাদের প্রতিপক্ষের লবিস্ট প্রতিষ্ঠান...তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে কেবল মিথ্যা তথ্য কিংবা অসত্য ঘটনা প্রকাশ করেনি, সেই সঙ্গে পৃথিবীর বড় বড় যেসব মানবাধিকার সংস্থা আছে তাদেরও প্রতিনিয়ত ফিডব্যাক করেছে যে “র্যাব খুব খারাপ” প্রতিষ্ঠান।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘র্যাব জনগণের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তারা দুর্নীতিমুক্ত হয়ে মানুষের সেবা করে। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের এ রকম একটি ভালো প্রতিষ্ঠান, যেটা দেশের সন্ত্রাস, মাদক বন্ধ করেছে, মানব পাচার মোটামুটিভাবে বন্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পলিসি হচ্ছে মানব পাচার ও মাদক কমানো। র্যাব এ কাজগুলোই করে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তারা এই কাজ করছে। সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু লোকজন বিভিন্ন রকমের ভুল তথ্য দিয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ব্যবস্থা করিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের র্যাব এমন বাজে কাজ করেনি যে যার জন্য তারা টেররিস্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে বিবেচিত হবে; বরং টেররিস্টের বিরুদ্ধে তাদের কাজ। র্যাবের কারণেই হোলি আর্টিজানের পর থেকেই...স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে বলেছে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী তৎপরতা কমেছে। হোলি আর্টিজানের পরে আর কোনো লোক সন্ত্রাসবাদে মারা যায়নি। বাংলাদেশ এ রকম দেশ যেখানে খুব উত্তপ্ত ছিল, সেখানে সন্ত্রাসী তৎপরতা কমেছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অবহিত করেছে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার আমাকে জানায়। জানার পরপরই আমি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করি। আমার আলাপ অত্যন্ত পজিটিভ ছিল। এসব সমস্যা দূর করার জন্য যদি কোনো অভিযোগ থাকে তা নিরসনের জন্য আমাদের নম্বরস অব ডায়ালগ আছে। তিনি (মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) বলেছেন, সেগুলো তিনি করবেন।’
তিনি বলেন, ‘আগামী মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পার্টনারশিপ ডায়ালগের কাজ শুরু হবে। এপ্রিলে সিকিউরিটি ডায়ালগ হবে। তা ছাড়া রয়েছে ইকোনমিক পার্টনারশিপ...। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক মিটিংয়ের আয়োজন করেছি। বিশ^াস করি এই নিষেধাজ্ঞা আমরা প্রত্যাহার করাতে পারব।’
শান্তিরক্ষী বাহিনী থেকে র্যাবকে বাদ দিতে কতিপয় এনজিওর চিঠির প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সম্প্রতি ১২টি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলকে একটি চিঠি লিখেছেন। বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা ও অনুমান এখানে লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা বলেছে, র্যাব বিভিন্ন রকম মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।’
তিনি বলেন, ‘তাদের ভাষায় র্যাব বিভিন্ন রকম অপকর্মে নিযুক্ত, মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এ জন্য তারা র্যাবকে শান্তিরক্ষায় না নেওয়ার অনুরোধ করেছে। তারা গত নভেম্বরের ৮ তারিখে চিঠি দিয়েছে। দুই মাস হলো জাতিসংঘ এটা পেয়েছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মুখপাত্র গণমাধ্যমকে বলেছেন, জাতিসংঘ যখনই কাউকে শান্তিরক্ষা বাহিনীতে নেয়, তারা নিজের নিয়মে যাচাই-বাছাই করেই কাজটি দেয়।’
আব্দুল মোমেন বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে এই চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিশ^াস, এসব অপপ্রচার ও দুরভিসন্ধিমূলক কাজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। র্যাব তো একটা ভালো প্রতিষ্ঠান। এই অপচেষ্টা যারা করছে, আমি বিশ্বাস করি তারাই এ জন্য দুঃখিত হবেন। এ রকম একটি ভালো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের জন্য যারা উদ্যোগ নিয়েছেন, তারা লজ্জিত হবেন।’
এ সময় দেশের সব রাজনৈতিক দলকে সজাগ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার প্রধানের কাছে প্রায় ১৮টি কমিটির লোকজনকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠি দিয়ে তারা বাংলাদেশে সব ধরনের সাহায্য বন্ধ করতে বলেছেন। তারা এ-ও বলেছেন বাংলাদেশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। তারা রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া নিয়েও অপপ্রচার চালিয়েছেন।’
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এ দেশ আপনার আমার সবার। দলের বিরুদ্ধে আপনি অভিযোগ-অনুযোগ করতে পারেন। কিন্তু দেশের বিরুদ্ধে যারা এ ধরনের অপপ্রচার করেন, তাদের প্রতি ধিক্কার। শেম অন দেম। দলের কর্মীরা যারা মাঠে-ময়দানে কাজ করেন, তারা এসব শুনলে আপনাদের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন। বলবেন এ রকম অপকর্ম থেকে দূরে থাকুন। আমি সেদিনের প্রতীক্ষায় আছি।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে জামায়াত একটি ফার্ম নিয়োগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য। এ জন্য তারা দেড় লাখ ডলার দেয়। বিচার বন্ধে তারা আরেকটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে প্রভাবিত করার জন্য পিস অ্যান্ড জাস্টিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ৩২ হাজার ডলার দিয়ে নিয়োগ করে।
বিএনপির বিদেশি লবির কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিএনপি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৭ লাখ ডলার প্রতি বছর, আর প্রতি মাসে রিটেইনার ফি ১ লাখ ২০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। এ তথ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ কে মোমেন আরও বলেন, বিএনপি ২০১৭ সাল পর্যন্ত চারটি এবং ২০১৯ সালে একটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে জামায়াত-বিএনপি তিনটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ সে দেশের আইনে বৈধ প্রক্রিয়া। বিশে^র বিভিন্ন দেশ এবং প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কোন্নয়নে লবিস্ট নিয়োগ দিয়ে থাকে। কিন্তু লবিস্ট নিয়োগের উদ্দেশ্য কী, সেটি হলো মুখ্য বিষয়।
