ব্যাংককে চিকিৎসাধীন রওশন এরশাদ, খবর নেয় না কেউ

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৪৯ পিএম

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ প্রায় তিন মাস ধরে ব্যাংককের বামরুণগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তারও আগে আড়াই মাস ধরে চিকিৎসা নিয়েছেন রাজধানীর হাসপাতালে। বেশ সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে শেষাবধি ব্যাংককে নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ এত দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকার পরও দলের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার কোনো খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে না। নিশ্চুপ রওশন এরশাদপন্থী নেতারাও।

রওশন এরশাদের রোগমুক্তি কামনায় দলের পক্ষ থেকে কোনো দোয়া মাহফিলেরও আয়োজন করা হয়নি। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত পার্টির প্রেসিডিয়াম বৈঠকেও এই শীর্ষ নেতার ব্যাপারে কোনো আলোচনা হয়নি ও ন্যূনতম দোয়াটুকু পর্যন্ত করা হয়নি। অথচ সম্প্রতি অসুস্থ হওয়ায় দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও দলের আরও কয়েকজন নেতার রোগমুক্তি কামনায় একাধিক দোয়া মাহফিল হতে দেখা গেছে।

জাপার নেতারা অভিযোগ করেছেন, জাপা এখন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল। সে হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকেও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের এই শীর্ষ নেতার চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে না।

রওশন এরশাদ কেমন আছেন এবং তার চিকিৎসা ব্যয় কিভাবে নির্বাহ হচ্ছে- এ ব্যাপারে জানতে শুক্রবার জাপার চার শীর্ষ নেতার সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হয়। কিন্তু এসব নেতারা এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তাদের কাছে রওশন এরশাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই বলেও অকপটে জানিয়েছেন।

এসব নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ব্যাংককে রওশন এরশাদের সঙ্গে থাকা তার ছেলে ও রংপুর-৩ আসনের জাপার দলীয় সাংসদ রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ নিজে থেকে ফোন দিলেই তারা তথ্য জানতে পারেন। এ ছাড়া দলের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেওয়ার আর কোনো ব্যবস্থা নেই।

অবশ্য এসব নেতারা দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলে রওশন এরশাদের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, রওশন এরশাদ শুধু দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী-ই নন, তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ও দলের শীর্ষ নেতা। দলে তার অবদান জন্মলগ্ন থেকেই।

এ ব্যাপারে জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, রওশন এরশাদের শারীরিক অবস্থার সরাসরি কোনো খবর আমি জানি না। কারণ তার সাথে যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংককে আছেন। সাদ এরশাদ যদি ফোন করে, তখন জানি। ৮-১০ দিন আগে আমাকে ফোন করেছিল। অবস্থা একটু ভালো। এরপর আর কোনো ফোন পাইনি। খবরও জানি না।

জাপার মহাসচিব আরও বলেন, সত্য কথা বলতে কি, তার প্রতিদিনের সংবাদটাও পাচ্ছি না। সাদ এরশাদ যোগাযোগ না করলে আমাদের যোগাযোগ করার সুযোগ নেই। এ জন্য আমরাও একটু উদ্বেগে আছি। দেখি কয়েক দিনের মধ্যেই ওনার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করব।

তবে এই নেতা রওশন এরশাদের দলে অবদানের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, দলে তার যথেষ্ট আবদান আছে। পার্টির সৃষ্টিলগ্ন থেকে ওনার অবদান। দুঃসময়ে আবদান আছে। তার আবদানের শেষ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, বেঁচে থাকতেই রওশন এরশাদের সঙ্গে দল যে আচরণ করছে, তা উচিত হচ্ছে না। দেশে থাকতেও তার চিকিৎসার কোনো খবর নেওয়া হয়নি। এখন বিদেশে চিকিৎসাধীন। সেখানেও কোনো খোঁজ রাখা হচ্ছে না। তার সুস্থতা কামনায় কোনো মিলাদ-দোয়া মাহফিলের আয়োজনও করা হয়নি। অথচ গত ১৬ জানুয়ারি পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের করোনা আক্রান্ত হলে তার সুস্থতা কামনায় দলের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অথচ রওশন এরশাদ যে এত দিন ধরে অসুস্থ হয়ে দেশের বাইরে আছেন, তার জন্য কোনো আয়োজন দেখা যায়নি। এবারের পার্টির ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের  জাঁকজমক আয়োজনেও রওশন এরশাদের কোনো নাম-ডাক ছিল না। সংগঠনের ব্যানার-পোস্টার সারা দেশ ভরে গেলেও রওশন এরশাদের কোনো ছবিই দেখা যায়নি সেদিনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। অথচ তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি ও দলের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালের দল প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রওশন এরশাদ।

কেন রওশন এরশাদের খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে না- জানতে চাইলে দলের নেতারা দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, মার সাথে থাকা ছেলে সাদ এরশাদ তাদের ফোন ধরছেন না। সে জন্যই মূলত তার খোঁজ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

দলের নেতারা জানান, গত বছর থেকেই রওশন এরশাদ বার্ধক্যজনিত নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছিলেন। তখন প্রায় আড়াই মাস ধরে তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। সে বছরের ২০ অক্টোবর থেকে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। তার ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দেয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে গত বছরের ৫ নভেম্বর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে নেওয়া হয়। রওশন এরশাদের বর্তমান বয়স ৭৮ বছর।

এ ব্যাপারে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম দিকে তার সম্পর্কে কিছু খবর পেলেও এখন তিনি কেমন আছেন তা বলতে পারব না। তার সাথে যোগাযোগ করার যে মাধ্যম সেখান থেকেই যোগাযোগ করা হচ্ছে না।

অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য লোটন সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রওশন এরশাদ হাসপাতালে আছে, এটুকুই জানি। ব্যাংককে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে আছেন। কেবিনে দিয়েছে। এর বেশি জানি না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন রওশন এরশাদের এমন করুণ পরিণতির জন্য তিনি নিজেও দায়ী। দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন যারা নেতৃত্বে, তারা রওশন এরশাদ বিরোধী। তা ছাড়া বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদও দুই নৌকায় পা দিয়েছেন। দেশের এখন যে অবস্থা, সে জন্য রওশন এরশাদও দায়ী। কারণ পার্টিকে সরকারের দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এ জন্যও অনেকে তার ওপর ক্ষুব্ধ।

এমনকি রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতারাও তার চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর নিচ্ছেন না বলে জানান এই নেতা। তিনি বলেন, সর্বশেষ প্রেসিডিয়াম বৈঠকেও রওশন এরশাদের চিকিৎসা, তার শারীরিক অবস্থা, এসব নিয়ে কোনো কথা হয়নি। সেখানে তার রোগমুক্তি কামনায় কোনো দোয়া পর্যন্ত করা হয়নি। তখন সে বৈঠকে দলের কয়েকজন নেতা চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা সরাসরি বৈঠকে বলেছেন, রওশন এরশাদের মতো অবস্থা অন্যদেরও হতে পারে। এই পরিস্থিতি অন্যদেরও হতে পারে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত