‘পরনারীর সঙ্গে অপ্রীতিকর ছবি ও কথোপকথন’ নিয়ে ঝগড়া, বৃষ্টিকে খুন করে আসাদুল

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০৩:২৪ পিএম

আশুলিয়ার কাঠগড়া সরকার বাড়ি এলাকার গত ১৫ জানুয়ারি দুপুরে ভাড়া বাড়ি বৃষ্টি আক্তার নামের এক নারীর লাশ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা-পুলিশ। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই আশুলিয়া থানায় বৃষ্টির স্বামী মো. আসাদুল ইসলাম (২৬)-সহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের হয়।

এ মামলায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আসাদুলকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৪। সোমবার হত্যাকাণ্ড ও গ্রেপ্তারের বিস্তারিত জানায় বাহিনীটি। জানায়, স্বামীর পরকীয়া নিয়ে কহলের একপর্যায়ে বৃষ্টি খুন হন।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি র‌্যাব জানতে পারে আসাদুল ফতুল্লায় আত্মগোপনে রয়েছে। এরপর গত ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত র‌্যাব-৪ এর একটি দল অভিযান চালিয়ে আসাদুলকে গ্রেপ্তার করে।

ভুক্তভোগী মোছা. বৃষ্টি আক্তার (২৩)-এর গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে। ২০১২ সালে বৃষ্টির প্রথম বিবাহ হয়। ওই  সংসারে তার ৬ ও ৪ বছরের দুটি মেয়ে রয়েছে। গত ২০১৯ সালে প্রথম স্বামী ভুক্তভোগীকে না জানিয়ে আবার বিবাহ করলে বৃষ্টি সংসার করবে না বলে জানায়। একপর্যায়ে তাদের তালাক হয়।

বৃষ্টির ডিভোর্সের পর দুই মেয়েকে নিয়ে গাজীপুরে বোন আকলিমার কাছে চলে আসে। সেখানে পোশাক কারখানায় চাকরিকালে আসামি আসাদুলের সঙ্গে পরিচয় হয়।

র‌্যাব বলছে, আসাদুল লোভী ও ধূর্ত প্রকৃতির হওয়ায় বৃষ্টির ডিভোর্সের টাকার জন্য কৌশলে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে এবং একপর্যায়ে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে বিয়েতে রাজি করায়। ২০২০ সালে ১ লাখ টাকা যৌতুক নিয়ে বৃষ্টিকে বিয়ে করে আসাদুল। বিয়ের আগে বৃষ্টির প্রতি অনেক যত্নশীল দেখালেও বিয়ের পরপরই তার রূপ পাল্টে যায়। সে ডিভোর্সে প্রাপ্ত টাকা ও বৃষ্টির মাসিক বেতনের ওপর দৃষ্টি দেয়। এ নিয়ে কলহ শুরু হয়।

পরে তারা আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টসে চাকরির সূত্রে ওই এলাকায় বাসা ভাড়া নেয়। তারা দুজনেই একই মোবাইল ব্যবহার করত এবং তাদের বেতনের টাকা ওই মোবাইলেই আসত। বেতনের টাকা আসাদ তুলে নিতো।

বৃষ্টি দুই মেয়ের খরচের জন্য আসাদের কাছে বেতনের টাকা চাইলেও সে দিতে চাইত না। বৃষ্টির হাত খরচের জন্যও কোন টাকা দিত না। ইতিমধ্যে আসাদুল একাধিক নারীতে আসক্ত হলে তাদের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে।

৩-৪ মাস আগে আসাদের পরকীয়াকে কেন্দ্র করে তারা বাসা পরিবর্তন করে আশুলিয়ায় আসে। কিন্তু আসামি অন্য নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিল। গত ১৩ জানুয়ারি রাত ১২টার দিকে বাসায় ফিরলে বৃষ্টি আসাদুলের মোবাইলে অন্য নারীর অপ্রীতিকর ছবি ও কথোপকথন দেখতে পেয়ে রাগ করে আসাদের মোবাইল ভেঙে ফেলে। আসাদও ক্ষিপ্ত হয়ে কিস্তির টাকায় বৃষ্টির কেনা টিভি ভেঙে ফেলে। তাতেও উগ্র মেজাজ প্রশমিত না হলে ভিকটিম বৃষ্টির গলা টিপে ধরে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওড়না বা অন্য কোন কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধ করে আসাদুল তাকে হত্যা করে।

আসামির বক্তব্য অনুযায়ী, সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে বৃষ্টির মৃত্যু নিশ্চিত করে সে। পরে মৃতদেহ সিলিং ফ্যান থেকে নামিয়ে মুখ ঢেকে মা ও ফুপুকে ঘটনাটি জানিয়ে ঘর তালাবদ্ধ করে আসাদুল পালিয়ে যায়। পরের দিন বিকেলে আসাদের জনৈক ফুপু ভিকটিমের বড় বোন আকলিমাকে কল করে ‘বৃষ্টি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে, আসলেই দেখতে পাবেন’ বলে মোবাইল বন্ধ করে দেয়। একই দিন সন্ধ্যার দিকে আসামির মাও ভিকটিমের পরিবারকে মোবাইলে কল করে বলে ‘বৃষ্টি মারা গেছে’ এবং সেও মোবাইল বন্ধ করে দেয়।

বৃষ্টির নতুন বাসার অবস্থান সম্পর্কে পরিবারের ধারণা ছিল না। ভিকটিমের ভাই গাজীপুর থেকে সাভারের আশুলিয়ায় এসে সন্ধ্যা থেকে সারা রাত অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোন ঠিকানা না পেয়ে আশুলিয়া থানায় যোগাযোগ করে। ইতিমধ্যে বৃষ্টির পরিবার ১৫ জানুয়ারি গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে গিয়ে আসাদের ঠিকানা দিতে তার মাকে চাপ প্রয়োগ করে। একপর্যায়ে আসাদের মা আশুলিয়ায় সরকার বাড়ির ঠিকানা দেয়।

ওই দিন দুপুরের দিকে ভিকটিমের আপন ভাই ও খালাতো ভাই আশুলিয়ায় বাড়িতে গিয়ে দরজায় তালাবদ্ধ পেয়ে দরজার নিচের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পা দেখতে পেয়ে আশুলিয়া থানায় খবর দেয়। এরপর পুলিশ এসে তালা ভেঙে লাশ উদ্ধার করে। থানা-পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে ভিকটিমে শরীরে বিভিন্ন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং ধারণা করা হচ্ছে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন হবে। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আসামি আসাদ বৃষ্টি হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত মর্মে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

আরও জানায়, এ মামলায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ কার্যক্রমের জন্য আশুলিয়া থানায় হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত