ঋত্বিক কুমার ঘটক (৪ নভেম্বর ১৯২৬ ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪) এক অবিনাশী প্রতিভা। তার সামগ্রিক প্রতিভার খুব সামান্য অংশই প্রকাশ্যে আসতে পেরেছিল। তার অস্থির ও বেপরোয়া জীবনযাপন, তার শারীরিক অসুস্থতা ও দেশকাল-সময় নিয়ে মানসিক উদ্বেগ তার সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকে বারবার বিঘ্নিত করেছে। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি-সারস্বত জগতে মাইকেল মধুসূদন, কাজী নজরুল ইসলাম ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিনিও স্বভাবে বেপরোয়া আর ক্রিয়াশীলতায় অমিততেজা ছিলেন।
ঋত্বিকের প্রতিভা ছিল বহুমাত্রিক। যৌবনে, তখন তিনি রাজশাহী কলেজের ছাত্র, বন্ধুদের নিয়ে বের করেন সাহিত্য পত্রিকা ‘বসুধারা’। সেখানে প্রতি সংখ্যায় একের পর এক গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ‘দেশ’সহ বেশ কিছু প্রতিনিধিস্থানীয় পত্রপত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। বছর কুড়ি আগে তার গল্পের একটি সংকলন বেরোয়, যদিও তার সব গল্প এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গল্পকার ঋত্বিকের কোনো মূল্যায়নই হয়নি। অথচ আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগে শিক্ষাব্যবস্থার অসারতা নিয়ে তিনি ‘শিখা’ নামে যে গল্পটি লিখেছিলেন, তার আবেদন এখনো সমান।
রাজশাহীতে কলেজজীবনে তিনি নাটকে অভিনয়ও করেছেন। কলেজে তিনি যখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র, সে-সময় তিনি কলেজের নাটকে অভিনয় করেছেন। বিখ্যাত নাট্য পরিচালক ও অভিনেতা, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং পরবর্তী সময়ে কলকাতার বিখ্যাত গ্রুপ থিয়েটার বহুরূপী’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কুমার রায় ছিলেন সে-সময় ঋত্বিকের সহপাঠী। তিনিও সেই নাটকে অভিনয় করেছেন।
আমরা ঋত্বিক ঘটককে মূলত চলচ্চিত্র পরিচালকরূপে জানি। কিন্তু সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি ছিলেন নাট্যকার ও অভিনেতা। এমনকি তিনি যখন ছবির রাজ্যে দাপটের সঙ্গে বিরাজ করছিলেন, তখনও তার নাটক লেখা থেমে থাকেনি, অথবা নাট্য পরিচালনা। শেষ বয়সে তিনি কিছুদিন মানসিক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সে সময়েও অন্য আরও মানসিক রোগীদের নিয়ে, যাদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত কবি বিনয় মজুমদার, নাটকে অভিনয় করিয়েছেন। আকাশবাণী কলকাতা থেকে তার যৌবনে প্রচারিত হয়েছিল তারই লেখা বিখ্যাত নাটক ‘জ্বালা’। এ পর্যন্ত তার লেখা মৌলিক ও অনুবাদ- নাটক মিলিয়ে বরোটির সন্ধান পাওয়া গেছে এবং পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাডেমি সেগুলোর সংকলন প্রকাশ করেছে। তাছাড়া পরবর্তী জীবনে তিনি কিছুদিন নাট্যবিষয়ের একটি পত্রিকা সম্পাদনাও করেছিলেন। ঋত্বিক ঘটকের আরও একটি পরিচয় চলচ্চিত্র শিক্ষক রূপে। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে বেশ কিছুদিন তিনি পড়িয়েছেন। ছিলেন সেখানকার ভাইস প্রিন্সিপালও। প্রাবন্ধিক ঋত্বিক ঘটকের পরিচয়টিও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার জীবিতকালেই বেরিয়েছিল প্রবন্ধগ্রন্থ ‘চলচ্চিত্র, মানুষ ও অন্যান্য’। ঋত্বিক ভালো ছবি আঁকতেন। তার প্রবন্ধগ্রন্থটির প্রচ্ছদ নিজেরই করা। এছাড়া তিনি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো কিংবদন্তি সংগীতশিল্পীর কাছে সেতারের তালিমও নিয়েছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে কখনো সেতার বাজাননি, কেননা তার নিজের কথায়, গুরু আলাউদ্দীনের অনুমতি ছিল না তাতে।
চলচ্চিত্রকার ঋত্বিকের আবির্ভাব মাত্র সাতাশ বছর বয়সে ‘নাগরিক’ ছবি দিয়ে। এর আগেও তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে যুক্ত ছিলেন নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ ছবিতে। নাগরিকের আগেও অবিশ্যি ‘বেদেনী’ ছবিতে হাত দিয়েছিলেন, যদিও শেষ করতে পারেননি অর্থাভাবে। ‘অরূপ কথা’ ছবিটিও প্রাক্ ‘নাগরিক’ যে ছবিটির কুড়ি দিনের শ্যুটিং হয় ঘাটশীলায় এবং দেখা যায়, ক্যামেরায় ত্রুটি ছিল বলে ছবি ওঠেনি। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৪, এই বাইশ বছরের মধ্যে তিনি মাত্র আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি তৈরি করেছেন। এগুলোর ভেতরে আছে তার ট্রিলজি বা ত্রয়ী ছবি ‘কোমল গান্ধার’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’ এবং ‘সুবর্ণরেখা’। তার অন্তিমপর্বের ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে তোলা হয়। এ ছবির কলাকুশলীরা সবাই বাংলাদেশের। ছবির প্রযোজক ছিলেন হাবিবুর রহমান খান। ছবিতে অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র, রোজী সামাদ, কবরী, গোলাম মুস্তফাসহ আরও অনেকে। ছবিটির সহপরিচালক ছিলেন তমিজ উদদীন রিজভী। এ ছবির চিত্রনাট্যও ঋত্বিক লেখেন বাংলাদেশে বসে। নারায়ণগঞ্জের ঢাকেশ্বরী মিলের গেস্ট হাউজে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ক্যামেরা হাতে নেন সেই করাল-ভয়াল দিনগুলোকে সেলুলয়েডের মাধ্যমে তুলে আনতে, যার ফলে ‘দুর্বারগতি পদ্মা’ নামে তথ্যচিত্রটি। তিনি যে সময়ের কাছে কতটা দায়বদ্ধ, ইতিহাসের কাছে নতজানু, তার প্রমাণ এই ছবিটি। ঋত্বিকের ছবি তার জীবদ্দশায় মূল্যায়িত হয়নি। মৃত্যুর পর, তিনি নিজেই বলে গিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর তার ছবির মূল্যায়ন হবে। হচ্ছেও তাই। তার ওপর বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। বই লিখেছেন ফরাসি চিত্র সমালোচক জর্জ শাদুল, দেশে-বিদেশে প্রদর্শিত হচ্ছে তার ছবি, সেমিনার হচ্ছে তাকে নিয়ে। ঋত্বিকের ছবি নিয়ে বাংলাদেশের গবেষক ও ঋত্বিক-অনুরাগীদের আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা দিন দিন বাড়ছে। তার সামান্য উদাহরণ হলো সাজেদুল আউয়ালের ঋত্বিক গবেষণা। তার লেখা ‘ঋত্বিকমঙ্গল’ ঋত্বিক গবেষণায় অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। তিতাসের দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভূমিপুত্র সাজেদুল নিজেও মালোপাড়ার জেলেদের নিয়ে রচনা করেছেন ‘ফণিমনসা’ নাটক, যা বাংলাদেশের বিখ্যাত নাট্যদল ‘ঢাকা থিয়েটার’ মঞ্চস্থ করে। সাজেদুলের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সেইসঙ্গে ঋত্বিকপ্রীতি এবং ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ তিনি এতটাই আপ্লুত ছিলেন যে নিজের একমাত্র সন্তানের নাম রেখেছিলেন এর নায়কের নামে অনন্ত।
তানভীর মোকাম্মেল অসাধারণভাবে ঋত্বিক ঘটকের ছবি বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করেছেন ‘কুরোসাওয়া জাপানি এবং আন্তর্জাতিকও। কিন্তু ওজু একান্তই জাপানি। ওজুকে সঠিকভাবে বুঝতে জাপানি শিল্প-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। ঋত্বিক ঘটকও যেন তেমনই আমাদের একান্তই বাঙালি এক শিল্পী, যার বিষয়বস্তু, গল্প বলার ধরন, বাংলাভাষার নাটকীয় প্রকাশভঙ্গি অনুযায়ী নাটকীয় সংলাপ, বাংলা মঞ্চনাটকের ধারায় উচ্চকিত অভিনয়রীতি ঋত্বিকের ছবিতে ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে শটগুলো স্মরণ করুন। এ সবই এক বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালকের একান্ত নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষার প্রকাশ। তাই ঋত্বিকের শিল্প-উৎসকে খুঁজতে হবে পশ্চিমী চলচ্চিত্রভাষায় নয়, সেটা খুঁজতে হবে বাংলার লোকজ শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে।’
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
