এবার নদী দখল দেখল না মন্ত্রিপরিষদের কমিটি!

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:৪৯ এএম

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা ও ফুলদী নদী ভরাট করে থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের কারখানা করার বিষয়টি এবার চোখে পড়ল না মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গঠিত তদন্ত কমিটির। আগেরবার জেলা প্রশাসনের কমিটি নদী, খাল ও খাসজমি দখলের সত্যতা পায়নি বলে প্রতিবেদন দিয়েছিল।

গজারিয়ার নয়ানগর মৌজায় থ্রি অ্যাঙ্গেলের জাহাজ নির্মাণ কারখানা এলাকা দখলের বিষয়টি তদন্তের জন্য গতকাল বুধবার সরেজমিন ওই এলাকায় যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি। দুটি খাল ভরাট করার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে কমিটি দ্রুত ওই দুটি খালের জমি উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছে।

তবে পরিবেশকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে করা কমিটির বিরোধিতা করেছেন। তারা ফুলদী ও মেঘনা নদী দখলমুক্ত করতে দ্রুত একটি বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের যুক্তি, যেখান দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হয় সেটাই নদী। সরকারের রেকর্ডপত্রে কী আছে, তা বিবেচ্য নয়।

গত বছর ২৮ জুলাই ‘মেঘনা-ফুলদীর বুকে কারখানা’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর ২ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন তদন্ত করে। ২০ অক্টোবর প্রশাসন নদী, খাল ও সরকারের খাসজমি দখলের অভিযোগের সত্যতা পায়নি বলে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর ১৬ নভেম্বর “দখল দেখল না ‘অন্ধ’ প্রশাসন” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে মন্ত্রিপরিষদ ফের তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। গতকাল কমিটি সরেজমিন গিয়ে দুটি খাল ভরাটের সত্যতা পায়। তবে নদী দখল হয়নি বলে জানিয়েছে তারা।

গতকাল দুপুর ১২টায় গজারিয়া ইউনিয়নের নয়ানগর মৌজায় থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় গিয়ে পৌঁছায় তদন্ত কমিটি। এ সময় কমিটির সদস্যরা স্থানীয় কৃষক, গণমাধ্যমকর্মী ও থ্রি অ্যাঙ্গেলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান সরকারের উপসচিব মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, ‘নয়ানগর মৌজায় দুটি খাল থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন দখল করেছে। এ দুটি খাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে উদ্ধার করা হবে।’ এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করেন।

দেশ রূপান্তরকে উপসচিব বলেন, ‘দুটি খাল থ্রি অ্যাঙ্গেল ভরাট করেছে। কিন্তু নদী দখলের তথ্য পাওয়া যায়নি।’ফুলদী নদী দখল হয়েছে এটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের নদী দখলদারদের তালিকায় থ্রি অ্যাঙ্গেল এক নম্বরে আছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান কিছু বলেননি। কমিটির সদস্যরা জানান, সরকারের উচ্চমহলে দ্রুতই এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবেন তারা।

তদন্তকালে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শীলু রায়, গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউল ইসলাম চৌধুরী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দা ইয়াছমিন সুলতানা, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আক্তারুজ্জামান প্রমুখ।

তদন্ত কমিটির দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি লঞ্চে করে মেঘনা ও ফুলদী নদীর ওই অঞ্চলে গিয়ে পরিষ্কার নদী দখল হওয়া দেখেছি। যেটি খালি চোখে দেখা যায় তার জন্য তদন্ত কমিটির সরেজমিন গিয়ে এসব বেআইনি কথাবার্তা বলার কোনো মানে নেই। পরিষ্কারভাবে আইনে আছে, যেখান দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হবে সেটাই নদী। সেখানে আগে কী নামে, কার নামে রেকর্ড করা ছিল এসব কোনো কিছু বলার সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন নদী কাগজ-কলমে নেই। নদী কাগজ-কলমে তোলার দায়িত্ব তো স্থানীয় প্রশাসনের। তার মানে তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেনি। এখন আবার তদন্ত করার সময় সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। আমরা মেঘনা ও ফুলদী নদী দখলের এ ঘটনায় একটা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটার কিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীর জমি ও তার প্লাবন ভূমি কতটুকু দখল হয়েছে তা বোঝার জন্য জরিপ বা সিএস, এসএ, আরএস, বিএসের মতো খতিয়ান দরকার নেই। সরকার যদি সত্যি নদী ও তার প্লাবন ভূমি দখলের চিত্র বুঝতে চায় তাহলে স্যাটালাইট ম্যাপ দেখলেই বুঝতে পারবে। যেখান দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হয় সেটাই নদীর জমি এ আইনের ভিন্ন ব্যাখ্যা করা বেআইনি কাজ। সরকার আদৌ নদী দখলমুক্ত করতে চায় কি না সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’

গজারিয়ার একাধিক গ্রামবাসী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ২০১৩ সাল থেকে মেঘনা ও ফুলদী নদীর মোহনার একটি অংশ দখল করে ভরাট করা শুরু করে থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। দুটি নদী আংশিক দখলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি দুটি খালও ভরাট করে। ভরাটকৃত জায়গায় জাহাজ মেরামত ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে তারা।

নদী দখলদার নামের তালিকা থেকে অবমুক্তির চেষ্টা : জাতীয় নদী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন ২০১৯ সালে জেলার নদী দখলদারদের একটি তালিকা নদী কমিশনে পাঠায়। ওই তালিকায় গজারিয়া উপজেলার এক নম্বর নদী দখলদার হিসেবে নাম ছিল থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের।

গত বছর ১৯ আগস্ট জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছে নদী দখলদারের তালিকা থেকে থ্রি অ্যাঙ্গেলের নাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনের বিষয়ে ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় নদী কমিশনের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম একটি চিঠি দিয়ে জানান, নদীর অবৈধ দখলদারের তালিকা থেকে থ্রি অ্যাঙ্গেলের নাম প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ নেই। দ্রুত নদীর জমির অবৈধ দখল থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয় ওই চিঠিতে।

তবে জাতীয় নদী কমিশনের এ চিঠিকে পাত্তা দেয়নি থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন। তারা নদীর জমির অবৈধ দখল থেকে তাদের জাহাজ বানানোর কারখানাটি সরিয়ে নেয়নি।বিআইডব্লিউটিসির জলযান বানাচ্ছে থ্রি অ্যাঙ্গেল : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়েরই সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) গত বছর দেওয়া এক প্রতিবেদনে থ্রি অ্যাঙ্গেলকে নদী দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিআইডব্লিউটিএর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ফুলদী নদীর ৭.৬ একর জমি বালি দিয়ে ভরাট করে দখল করেছে। এতে নদীর প্রবাহ বিঘœ হচ্ছে। এর ফলে অচিরেই এ নদীটি মারা যাবে, যা হত্যার শামিল। ঘটনাটিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে থ্রি অ্যাঙ্গেলের বিরুদ্ধে মামলা করা দরকার বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়।

তবে থ্রি অ্যাঙ্গেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। উল্টো বাংলাদেশের নদী রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যতম প্রতিষ্ঠান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আরেক সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) থ্রি অ্যাঙ্গেলকে ১৮টি জলযান বানানোর কাজ দিয়েছে। এর জন্য প্রতিষ্ঠানকে ৪২৮ কোটি ৪৯ লাখ ৬২ হাজার ৮৫০ টাকা দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।

বিআইডব্লিউটিসির ১ হাজার ৩১৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫টি জলযান ও আটটি সহায়ক জলযান নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে।

থ্রি অ্যাঙ্গেল যে ১৮টি জলযান তৈরির কাজ পেয়েছে তার মধ্যে ছয়টি ইউটিলিটি ফেরি, দুটি কোস্টাল অয়েল ট্যাংকার, দুটি ফায়ার ফাইটিং টাগ, তিনটি মডার্ন ইনল্যান্ড প্যাসেঞ্জার ভেসেল, চারটি কোস্টার সি-ট্রাক ও একটি ইন্সপেকশন বোট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত