আন্দোলনে বিএনপি জোর ভূমিকা চায় ছাত্রদলের

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:৪৮ এএম

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন তাদের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তেমন ভূমিকায় ছাত্রদলকে আর দেখা যায়নি। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য রেখেছেন।

বিএনপির ওই নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে না পারলেও নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা লাগাতে পারে, ভাঙচুর করতে পারে, জিয়ার ম্যুরাল ভাঙতে পারে। কমিটি গঠনের দায়িত্ব দিলে আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে।

বিএনপি নেতাদের এমন সমালোচনার জবাবে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অতীতে দেশে রাজনীতির পরিবেশ ছিল। এখন তো দেশে রাজনীতি নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ন্যূনতম গণতান্ত্রিক আচরণ করছে না। আন্দোলনের মাঠে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। মিছিল নিয়ে নামলেই পুলিশ গুলি ছোড়ে। ছাত্রদলের নেতাদের তুলে নিয়ে গুম করে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে ছাত্রদল কেন কারও পক্ষেই আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তারপরও দলের যেকোনো কর্মসূচি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই সফল করেন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। নব্বইয়ে আমরা স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। অনেক ঝুঁকি নিয়েছি। কিন্তু এখনকার দিনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের তেমন ঝুঁকি নিতে দেখি না। তারা দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঝুঁকি নিতে চায় না, ত্যাগ শিকার করতে চায় না। তাদের এমন মনমানসিকতার কারণে দলের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ছাত্রদলের যে কমিটি রয়েছে তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন নেতৃত্ব আনতে হবে। ঝুঁকি নিতে পারে এমন ত্যাগী নেতাদের কমিটিতে আনতে হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন যারা ছাত্রদল করে তারা টাকার পেছনে ছোটে। ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি সারা দেশে সংগঠন পুনর্গঠন কাজ করছে। একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ আসার পর তিনি কমিটি ভেঙে দেন। জেলা কমিটিগুলো গঠন করার ক্ষেত্রে এলাকার সংসদ সদস্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

বিএনপির ওই নেতারা বলেন, ২০১৯ সালের ১০ জুন ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং কার্যালয়ের তিন তলায় অবস্থানরত দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে হেনস্তা করে। পরে এসব নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।

তারা বলছেন, বর্তমান কমিটি হওয়ার পর আজ পর্যন্ত ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ গ্রেপ্তার হয়নি। তার মানে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই। অবশ্য আন্দোলনের মাঠে থাকায় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে এখন রাজনীতির পরিবেশ নেই। এরপরও দলের যেসব কর্মসূচি আসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা সফল করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই। তা ছাড়া ২৭ বছর পর কাউন্সিলের মাধ্যমে আমাদের কমিটি গঠন হওয়ার পর দেখেছি সারা দেশের বেশিরভাগ ইউনিটেই দীর্ঘদিন ধরে কমিটি নেই। এখন আমরা কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলের কমিটি গঠন করে ধাপে ধাপে শীর্ষ পর্যায়ে আসার কাজ করছি।’

তিনি দাবি করেন, ‘বিএনপি এখন কঠোর কোনো কর্মসূচি দিচ্ছে না। আমরাও তাই কঠোর কর্মসূচিতে যাই না। তারপরও সারা দেশে ছাত্রদের অধিকার আদায়ে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’  

ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ১৩-১৪ বছর যাবৎ তারা ফ্যাসিস্ট সরকারে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের মিনিমাম স্পেস তারা দিচ্ছে না। বিশ^বিদ্যালয়ে সহাবস্থান নেই। এমনকি ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। যারা একটু কাজ করতে চায় তাদের তুলে নিয়ে গুম করে ফেলে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে সর্বশেষ এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও পুলিশ এতটা কঠোর ছিল না। এখন মিছিল দেখলেই পুলিশ গুলি করে। শুধু রাজনীতি করার কারণে জীবন দিতে হবে, পরিবার তার লাশও খুঁজে পাবে নাÑ তা তো হতে পারে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের সাবেক এক সভাপতি বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সমালোচনার জবাবে দেশ রূপান্তরকে বলেন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের পর থেকে এখন পর্যন্ত যে কমিটি দেওয়া হয়েছে তাতে জনপ্রিয় নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং অজনপ্রিয় নেতাদের চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন যারা কাউন্সিলের মাধ্যমে এসেছে, তাদের নাম দেশের সাধারণ মানুষ কতজন জানে? প্রত্যাশিত ছাত্রদল পেতে হলে দলের মধ্যে ত্যাগী, পরিশ্রমী ও জনপ্রিয় নেতাদের নেতৃত্বে আনতে হবে।

ডাকসুর সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নাজিম উদ্দিন আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। অতীতের সব স্বৈরাচারী সরকারকে ছাড়িয়ে গেছে এই সরকার। বিরোধী মত সহ্য করতে পারছে না।’ তিনি বলেন, ‘এরশাদকে আমরা স্বৈরাচার বলছি, কিন্তু তার সরকার এভাবে খুন, গুম করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনকার মতো এত অসহিষ্ণু ছিল না; বিশেষ করে পুলিশ এখনকার মতো কথায় কথায় গুলি ছুড়ত না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত