কোটি টাকার স্থাপনায় ফাটল

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:৩১ এএম

রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কয়েকশ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দফায় দফায় সময় বাড়লেও কাজ শেষ হয় না। এ ছাড়া দুর্বল নকশা ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে অল্প সময়ে বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল দেখা দেওয়াসহ বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দিতে শুরু করেছে। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ এসব উন্নয়নে কাক্সিক্ষত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২১ জুলাই ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্প নামে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪ বছর মেয়াদি ৩৫২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পায়। অবশ্য বর্তমানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯২কোটি টাকায়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফা বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ।

তবে কয়েকশ কোটি টাকার প্রকল্পের যতটুকু কাজ ইতিমধ্যে হয়েছে তার মান নিয়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রশ্ন। এর মধ্যে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে উপাচার্যের বাসভবনের পেছন পর্যন্ত রাস্তায় দুই স্তরের ইটের সলিং বসানোর কাজ চলছে। রাস্তাটি নির্মাণে ভাঙাচোরা ও ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার হচ্ছে অভিযোগ পেয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের শেকৃবি প্রতিনিধিরা সম্প্রতি সেখানে যান। তারা অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ওই নির্মাণকাজের ভিডিওচিত্র ধারণ করেন। পরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হলে প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে ইট ভাঙা হলেও মান ঠিক আছে দাবি করে কাজ চলমান রাখেন। এর কয়েক দিন পরই একই রাস্তা নির্মাণের জন্য গভীর রাতে আবারও নিম্নমানের ইট আনা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে উপাচার্যের হস্তক্ষেপে তা সরানো হয়।

এর আগে ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেট থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে পর্যন্ত রাস্তাটির কার্পেটিংয়ের কাজে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তখন তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী কাজ বন্ধ করে দিলেও অজানা কারণে পরে একই বিটুমিন ব্যবহার করে রাস্তাটির কাজ শেষ করা হয়।

তারও আগে ২০১৭ সালে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা নির্মাণ করা হয়। ইতিমধ্যে ভবনটির চতুর্থ তলাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিম ও কলামের পাশের গাঁথুনিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ভবনটির দেয়ালসহ বেশ কিছু জায়গা ইতিমধ্যে ড্যাম (স্যাঁতসেঁতে) হয়ে গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, ওই তলাটি আগের মেয়াদে করা। দেয়ালে একই ধরনের মৃদু ফাটল ও স্যাঁতসেঁতে ভাব দেখা গেছে নবনির্মিত প্রশাসনিক ভবনের ষষ্ঠ তলাসহ বেশ কিছু জায়গায়। অথচ চলতি প্রকল্পের মধ্যেই ৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার কাজ শেষ করা হয়।

বাস্তবায়নাধীন ৩৫২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণে জোড়াতালি দিয়ে লাগানো হয়েছে টাইলস। এ ছাড়া কিছু কাজ অসমাপ্ত রাখায় ঠিকাদারের বিল আটকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শেখ কামাল ভবনটিতে রাখা হয়নি ইন্টারনেট সংযোগসহ আধুনিক কোনো সুযোগ-সুবিধা। এ ছাড়া ৩২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন টিএসসি ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার ঘটনা ঘটে। পরে ভবনটির ছাদের কিছু অংশ চটিয়ে নতুন করে ঢালাই দেওয়া হয়। তার আগে ভবনটির ছাদ নির্মাণে নকশা জটিলতা দেখা দিলে নতুন করে দুটি কলাম নির্মাণ করা হয়।

২২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ শেষ করা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা হলের চিত্রও করুণ। হলটি চালুর কয়েক বছরের মধ্যেই এ-ব্লকের ছাদ স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়ায় ইতিমধ্যে কয়েক বার ছাদ সংস্কার করা হয়। সম্প্রতি আবারও সেখানে নির্মাণ শ্রমিকদের সংস্কারকাজ করতে দেখা যায়।

বাস্তবায়নাধীন ৩৫২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে ভেটেরিনারি ক্লিনিক (৩য় তলা পর্যন্ত), ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় ক্যাম্পাসের দুটি ফটক নির্মাণ, ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ছাত্রী হল, ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ছাত্র হল এবং ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণসহ বেশ কিছু কাজ চলছে। চলমান এসব কাজও ত্রুটিপূর্ণ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

তবে এসব উন্নয়নকাজে ধীরগতির কথা স্বীকার করলেও মান খারাপ হওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আজিজুর রহমান। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সম্পূর্ণ কথা না শুনেই ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘কেন? এত কী দরকার তোমাদের এগুলা! এত মাদবর সাইজো না। ওরা কাজ করতেছে, আমরা তাগাদা দিচ্ছি, তোমার এত কিছু জানার দরকার নাই।’ এ কথাগুলো বলেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। পরে আবার কল করার কারণ জানিয়ে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানোর পর কল করা হলে রিসিভ করেন অধ্যাপক রাজ্জাক। তখন তিনি বলেন, ‘আমি কাজের উন্নয়নে চেষ্টা করতেছি।’

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও ত্রুটির বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের খবর পেয়েছি, সেগুলো সরিয়ে নিতে বলেছি। তবে আমার দায়িত্ব পাওয়ার আগে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। কিন্তু এখন যেসব কাজ হচ্ছে, আমি দেখব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত