করোনা মহামারীর দ্বিতীয় বছরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় রেকর্ড পরিমাণ লেনদেন হয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) গ্রাহকরা লেনদেন করেন ৭ লাখ ৭০ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। যা আগের বছরের লেনদেনের অঙ্কের তুলনায় ৩৭ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। ২০২০ সাল শেষে লেনদেন হয়েছিল ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, এক বছরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এত বেশি লেনদেন এর আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে একক মাস হিসেবে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে মে মাসে, ৭১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে লেনদেন হয় ৭১ হাজার ১৮২ কোটি টাকা।
দেশে বর্তমানে ১৩টি ব্যাংক সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে এমএফএস হিসেবে সেবা দিচ্ছে। বিকাশ, রকেট, উপায়, এমক্যাশসহ বিভিন্ন ব্যান্ডে এই সেবা দিচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক। ডাক বিভাগ থেকে একই ধরনের সেবা দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এমএফএস সেবা দেওয়ার স্থায়ী লাইসেন্স না পাওয়ায় এই লেনদেনের তথ্যে ‘নগদ’ এর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে টাকা আদান-প্রদানের সুবিধার কারণে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং এখন সহজ ও জনপ্রিয় একটি সেবা। একটা সময় এ ধরনের কাজের জন্য কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা গড়ে উঠেছিল গ্রাহকদের।
তবে তুলনামূলক কম খরচ এবং নিরাপদ লেনদেনের সুবিধা থাকায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা। সে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, লেনদেনের পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় বাড়ছে এজেন্ট ও গ্রাহকের সংখ্যা। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায় ১১ কোটি ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬৯। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ৯৩ লাখ ৩৬ হাজার। ২০২১ সালে এমএফএস সেবায় গ্রাহক বেড়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ৬২ হাজার।
বর্তমানে নিবন্ধিত গ্রাহকের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে ৬ কোটি ২৩ লাখ এবং শহরের গ্রাহকসংখ্যা ৪ কোটি ৯২ লাখ। পুরুষ গ্রাহক ৬ কোটি ৩০ লাখ এবং নারী গ্রাহক প্রায় ৫ কোটি। এক বছরের ব্যবধানে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা ৬৪ হাজার ৫৬১ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ২৩ হাজার ৫৫৮ জনে।
সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এখন আর শুধু টাকা পাঠানোতেই সীমাবদ্ধ নেই। দৈনন্দিন কেনাকাটা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ বিভিন্ন বিল পরিশোধ, মোবাইলে রিচার্জ, বীমার পলিসি জমাসহ নানা ধরনের সেবার বিল পরিশোধ করা যায় এমএফএসে।
পোশাক কারখানাসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতাদি মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যম বিতরণ করছেন। তারা আবার সেই টাকা থেকে স্বজনদের টাকা পাঠাচ্ছেন।
ডিসেম্বর মাসে এমএফএস সেবায় ব্যক্তি হিসাব থেকে ব্যক্তি হিসাবে ২০ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা লেনদেন হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা বাবদ বিতরণ হয় ২ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। বিভিন্ন পরিষেবার ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকার বিল পরিশোধ হয়। কেনাকাটার ৩ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকার বিলও পরিশোধ হয় এ মাধ্যমে।
দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করতে ২০১০ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মধ্য দিয়ে দেশে এমএফএসের যাত্রা শুরু হয়। এর কিছুকাল পরেই ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ লিমিটেড এই সেবা চালু করলেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিকাশ। তবে ক্যাশ আউট চার্জ বেশি থাকায় এই খাতের লেনদেন ধীরে ধীরে বাড়ছিল। তবে ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা ‘নগদ’ ক্যাশ আউট চার্জ কমিয়ে আনায় এই প্রতিষ্ঠানটিও ভালো গ্রাহক জোগাড় করতে সক্ষম হয়।
