পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) লেক থেকে মাঝেমধ্যেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন শিক্ষার্থী, নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। অন্যান্য বছরের মতো এবারও তারা বিভিন্ন সময়ে লেকের মাছ ধরেছেন। তবে দুই দিন ধরে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বহিরাগতরাও। রাতে জাল ফেলে মাছ শিকারের ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরেও বহিরাগতরা জাল ফেলে মাছ শিকার করেন সেখানে। অন্যান্য সময় মাছ ধরার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডি পদক্ষেপ নিলেও এবার আশ্চর্যভাবে নীরব তারা। অভিযোগ উঠেছে, মাছ ছাড়ার সময় হওয়া দুর্নীতি আড়াল করতেই এখন মাছ চুরির নাটক সাজানো হয়েছে।
গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহীন আলম নামে এক শিক্ষার্থী লেক থেকে জাল ফেলে মাছ ধরার ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করলে বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় জল্পন-কল্পনা।
শাহীনের পোস্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় লেক সংস্কার করে মাছ ছাড়া হয়। তখন সেখানে মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এখন বড় বড় জাল ফেলে মাছ ধরার মহোৎসব চললেও প্রক্টরিয়াল বডি, এস্টেট অফিসার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ জানান, ক্যাম্পাসের লেক সংস্কার করে সেখানে চাষের জন্য প্রতি বছর মাছ ছাড়ে কর্র্তৃপক্ষ। কয়েক দিন আগে প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কিছু ছাত্রনেতা প্রথমে বড়শি দিয়ে মাছ মারতে শুরু করেন। এরপর কর্মচারী, নিরপত্তা প্রহরী, গাড়িচালক ও আনসার সদস্যরাও মাছ ধরতে শুরু করেন। পরে বহিরাগতরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।
একই কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকারী রেজিস্টার এস এম জহুরুল ইসলাম প্রিন্স। তিনি বলেন, এর আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসারের দায়িত্বে ছিলাম। তখন প্রশাসনের একটি সুযোগসন্ধানী চক্র লেকে মাছ ছাড়ার নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লুট করার চেষ্টা করে। তারা মাঝারি সাইজের রঙিন মাছ ২০০ টাকা করে ক্রয় করে ছাড়ার পর প্রতিটি মাছ ৯০০ টাকা দাম ধরে ভাউচার অনুমোদন করতে চেষ্টা করে। বিরোধিতা করায় আমাকেই এস্টেটের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
জহুরুল বলেন, প্রক্টর হাসিবুর রহমানের নেতৃত্বে চক্রটি সামান্য কিছু মাছ ছেড়ে লাখ লাখ টাকা বিল তুলেছে। সেই ঘটনা আড়াল করতেই পরিকল্পিতভাবে মাছ ধরা হচ্ছে। মাছ চুরির নাটক সাজিয়ে তারা নিজেদের দুর্নীতি জায়েজ করতে চাইছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানান।
এই কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে প্রক্টর হাসিবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে দেশ রূপান্তর। প্রক্টর হাসিবুরকে বেশ কয়েকবার ফোন করেও সাড়া মেলেনি। মোবাইলে বার্তা পাঠিয়েও মেলেনি কোনো উত্তর।
আর বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট কর্ককর্তাসহ অন্তত চারজন সহকারী প্রক্টর ক্যাম্পাসের বাইরে আছেন জানিয়েছে দায়িত্ব নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা সকলেই বলেছেন, এ বিষয়ে কেবল প্রক্টরই কথা বলতে পারবেন।
পাবিপ্রবির বর্তমান এস্টেট কর্মকর্তা কাজী আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত ভ্রমণে জেলার বাইরে এসেছি। তাছাড়া অল্প কিছুদিন আগে এস্টেটের দায়িত্ব নেওয়ায় ঠিক কত টাকার মাছ ছাড়া হয়েছে তাও জানা নেই। এটি প্রক্টরিয়াল বডি দেখভাল করছে। মাছ চুরির বিষয়েও আমার জানা নেই।’
সহকারী প্রক্টর ফারুক হোসেন বলেছেন, শিক্ষার্থীরা শখ করে মাঝে মাঝে মাছ ধরে। তবে আমি গত কয়েক দিন ক্যাম্পাসে না যাওয়ায় বিষয়টি জানি না। জাল ফেলে মাছ লুটের বিষয়েও আমার কিছু জানা নেই।
একই কথা বলেছেন আরও দুই সহকারী প্রক্টর। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। তারা দুজনেই প্রক্টর হাসিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
সহকারী প্রক্টর আরিফুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি জানান, ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। মাছ ধরার কোনো ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবগত নন। মাছ ছাড়ার সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, মাছ ছাড়া হয়েছে প্রক্টর হাসিবুর রহমানের নেতৃত্বে। তিনিও সে সময় উপস্থিত ছিলেন। তবে মাছের পোনার দাম বেশি দেখানো হয়েছে কিনা সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তিনিও বিষয়টি নিয়ে প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) বিজন কুমার ব্রহ্ম বলেন, মাছ ছাড়া এবং নিরাপত্তার বিষয়টি প্রক্টরিয়াল বডি দেখাশোনা করে। গত দুদিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে আমি খোঁজ নিতে পারিনি। এই ঘটনায় নিরাপত্তা কর্মীদের কোনো অবহেলা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা হাসিবুর রহমান বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। আমাদের নিরাপত্তা কর্মীদের দোষারোপ করা হচ্ছে। আমরা সব সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকি। এ বিষয়ে প্রক্টর স্যারই ভালো বলতে পারবেন।
