কৃষি বিনিয়োগ ও কৃষি ভর্তুকি

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:৪৪ পিএম

একজন বিখ্যাত ধনী যিনি বিশ্বের প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শীর্ষ ধনী হিসেবেই বিবেচিত। কিন্তু তার সম্পদ কত তা না জানলেও বিল গেটস নামটি বললে বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তির অবয়ব চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তার দক্ষতা ও সম্পদের উৎস কী? তিনি মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, প্রোগ্রামিং দক্ষতার জন্য তিনি সারা পৃথিবীতে পরিচিত মুখ। ২০২১ সালে তিনি সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন অন্য আর এক কারণে। বেশুমার কৃষিজমি কিনেছেন তিনি। তিনি এখন আমেরিকার সবচেয়ে বেশি কৃষিজমির মালিক। নিশ্চয়ই শখের বসে বা খামারে বিলাসিতা করার জন্য জমি কিনছেন না তিনি। কৃষিতে দক্ষতা দেখাতে এবং মুনাফা বাড়াতে চাইছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি জমির মালিক বিল গেটস। মার্কিন সাময়িকী ল্যান্ড রিপোর্টের তথ্য মতে, বিল গেটস ২ লাখ ৪২ হাজার একর জমি কিনেছেন। এই জমি কিনতে তিনি খরচ করেছেন প্রায় ১২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমেরিকার ১৮টি অঙ্গরাজ্যে তিনি জমি কিনেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমি কিনেছেন লুইজিয়ানায় (৬৯,০৭১ একর), আরকানসাস (৪৭,৯২৭ একর) ও নেব্রাস্কায় (২০,৫৮৮ একর)। দ্য ল্যান্ড রিপোর্টের তথ্য অনুসারে, বিল গেটসের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ সংস্থা ক্যাসকেড এবং তিনি নিজেই ব্যক্তিগতভাবে এসব জমিতে বিনিয়োগ করছেন। হঠাৎ করে বিশ্বের সেরা ধনী প্রযুক্তিবিদের এত বড় কৃষিজমির মালিক হয়ে ওঠা নিয়ে আলোচনা চলছে। অবাক হয়েছেন অনেকেই। যদিও এটা অনেকেই জানেন যে কৃষির প্রতি বিল গেটসের আগ্রহ নতুন নয়, এর আগে ২০০৮ সালে বিল ও তার স্ত্রী মেলিন্ডার নামে প্রতিষ্ঠিত মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চ ফলন, টেকসই ক্ষুদ্র কৃষি উন্নয়নে ৩০৬ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে দিয়েছিলেন। পরে ওই সংস্থার পক্ষ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অধিক দুধ উৎপাদন নিয়ে একটি প্রজেক্টের বিকাশ ও সম্প্রসারণেও বিনিয়োগ করেছিলেন।

কিন্তু বিল গেটস এত কৃষিজমি কিনে কী করবেন, তা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার জানা যায়নি। কারণ, ফোর্বসের পক্ষ থেকে ক্যাসকেডের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো মন্তব্য করেননি। ব্যক্তিগতভাবে কৃপণ স্বভাবের এবং নতুন ব্যবসার পথ অনুসন্ধানী এই ধনী যে ভবিষ্যৎ ব্যবসার কথা ভেবেই জমি কিনেছেন তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না।  শুধু গেটস নয় অন্য ধনকুবেররাও জমি কিনেছেন। যেমন ওয়ান্ডারফুল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা স্টুয়ার্ট এবং লিন্ডা রেসনিকও (মোট সম্পদ ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন) জমিতে বিনিয়োগ করেছেন। তারা ১ লাখ ৯০ হাজার একর জমি কিনেছেন। লিবার্টি মিডিয়ার প্রধান জন মেলন ২২ লাখ একর জমির মালিক, সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নারের আমেরিকার আটটি অঙ্গরাজ্যে আছে ২০ লাখ একর জমি। আমাজনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেফ বোজেস লাখ একর জমিতে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। হাওয়া বুঝে ব্যবসা করা এবং ব্যবসার হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে পারেন যারা তারা যখন কৃষিজমি কিনছেন এবং বিনিয়োগ করছেন তখন বিশ্বের ভবিষ্যৎ কৃষি সম্পর্কে উদাসীন থাকার কোনো কারণ নেই। ইন্টারনেট ৭ দিন ব্যবহার না করে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না করে, পত্রিকা না পড়ে বেঁচে থাকা গেলেও খাদ্য ছাড়া যে বাঁচা যায় না, এক সপ্তাহের মধ্যে লঙ্কা-কাণ্ড ঘটে যায় তা তারা ভালোভাবেই বিবেচনায় নিয়েছেন। তাই ভবিষ্যতের লাভের কথা ভেবে তারা নজর দিয়েছেন কৃষিতে।

কৃষিপ্রধান এবং কৃষক অবহেলাকারী বাংলাদেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কৃষিকে বাদ দিয়ে ভাবা কঠিন। রপ্তানি আয় দেখিয়ে যারা অর্থনীতির শক্তি বোঝাতে চান তারা কি বুঝতে পারছেন না, ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির দেশে ৮০ শতাংশ রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। যার ভিত্তি সস্তা ও অদক্ষ শ্রম শক্তি আর বিদেশের বাজার। করোনা দেখিয়েছে এই খাত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। আর করোনা এটাও দেখিয়েছে যে কৃষির ওপর ভরসা করা ছাড়া উন্নয়ন কতটা ভঙ্গুর। ৬ কোটি ৮২ লাখ শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রধান খাদ্য ভাত, মাছ, ডিম ও মাংসে স্বনির্ভর হওয়ার ব্যাপক ঘোষণা সত্ত্বেও এখনো দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ দৈনিক প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর খাবার পায় না। খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও দেশের সাধারণ মানুষের বেশ বড় একটা অংশ খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছে। কৃষিতে বিনিয়োগ না বাড়ালে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে না। এসব কথা বললে সরকারি দল হই হই করে উঠে বলবেন যে, আপনারা সরকারের উন্নয়ন দেখেন না। কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ভার্চুয়াল সংলাপে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এই সংলাপে আরও বলা হয়েছে, দেশের ৩২ শতাংশ মানুষ মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষি খাতে মাথাপিছু বিনিয়োগ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একেবারে নিচের সারিতে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সংলাপে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরতে গিয়ে এফএও বাংলাদেশের বাজার ও বাণিজ্যবিষয়ক পরামর্শক মনিরুল হাসান বলেন, নেদারল্যান্ডস কৃষি খাতে বছরে মাথাপিছু ৩১৪ ডলার, ভারত ৩৪ ডলার ও মিয়ানমার ২৬ ডলার বিনিয়োগ করে। সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ১৬ ডলার বিনিয়োগ করা হয়। যে কারণে বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি ধানের উৎপাদন ৪ হাজার ৭৩৫ কেজি। আর চীনে তা ৭ হাজার কেজির বেশি। অন্যদিকে দেশে কৃষিজমি কমে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা সমস্যা বাড়ছে। তাই খাদ্যনিরাপত্তাকে টেকসই করতে হলে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একরপ্রতি ধানসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের উৎপাদন বাড়াতে হবে। ভার্চুয়াল সংলাপে খাদ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা গেইন, বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রুদাবা খন্দকার বলেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও এখনো গরিব মানুষ মূলত ভাত থেকে তাদের পুষ্টিচাহিদার বড় অংশ মেটায়। তাই ভাত কম খান বললেই চলবে না, ভাতের উৎপাদনের পাশাপাশি পুষ্টিকর ও বহুমুখী খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে।

উৎপাদন বাড়ানোর উপায় কি আছে? দেশের ৭৮ লাখ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা যায়। এক হেক্টর মানে সাড়ে সাত বিঘা। বিঘায় গড়ে ২০ মণ ধান উৎপাদন ধরলে হেক্টরে ৫ টনের বেশি উৎপাদন হয়। তাহলে বোরো মৌসুমে ২ কোটি ৫ লাখ টন ধান উৎপাদন সম্ভব। আমন মৌসুমে দেড় কোটি টন আর আউস মৌসুমে ৫০ লাখ টন ধান উৎপাদন তো সহজেই করা সম্ভব। তাহলে ৪ কোটি ৭৫ লাখ টন ধান উৎপাদন করতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ধান থেকে ৬৬ শতাংশ চাল উৎপাদন হয়। সে হিসেবে ৩ কোটি ১০ লাখ টন চাল তো উৎপাদিত হতেই পারে। আমরা ভাত বেশি খাই বলে কৃষিমন্ত্রী যতই কটাক্ষ করুন না কেন তার হিসাবেই তো দিনে গড়ে ৪০০ গ্রাম চাল খাই আমরা। ছোট শিশু থেকে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ সবাইকে এই হিসাবে ধরলে বছরে চাল লাগার কথা ২ কোটি ৪৮ লাখ টন। তাহলে খাদ্য ঘাটতি কেন, চাল আমদানিতে এত ব্যস্ত হতে হয় কেন, চালের বাজার এত চড়া কেন?   

মন্ত্রী বলেছেন, সারের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে, ফলে সার বাবদ বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে ২০২১-২২ অর্থবছরে লাগবে ২৮ হাজার কোটি টাকা। বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে ভর্তুকিতে লেগেছিল ৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। সে বছর ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাকি টাকা কোথায় গিয়েছে জানা নেই। এই প্রথম কোনো মন্ত্রী বললেন এ বছর ভর্তুকি খাতে বাজেট মাত্র ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মাত্র কথাটা এর আগে কখনো শোনার ভাগ্য হয়নি জনগণের। মন্ত্রী বলেছেন, সারের জন্য তার আরও প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ৬ লাখ কোটি টাকার বাজেট এই ভর্তুকি কি অতিরিক্ত কোনো অর্থনৈতিক বোঝা? ডিজেলের দাম বাড়ানোতে সরকারের লাভ হলেও কৃষকের খরচ গেছে বেড়ে। উত্তরবঙ্গের কৃষকরা বলেন, বোরো মৌসুমে এক হেক্টর জমিতে ১০ থেকে ১৫ বার সেচ দিতে হয়। এতে প্রয়োজন হয় ৪০-৫০ লিটার ডিজেল। এই হিসাবে প্রতি হেক্টরে বোরো চাষে ডিজেলের বাড়তি দামে কৃষকের অতিরিক্ত খরচ হবে ৭০০ টাকার বেশি। তাদের মতে, তেলের দাম বাড়ায় ধানের চাষ করাই দুষ্কর হয়ে গেছে। হালচাষের খরচ বেড়ে গেছে। শ্যালো মেশিনে সেচের খরচ বেড়ে গেছে। খরচ বেড়েছে বলে কৃষক কি তাহলে ধান চাষ কমিয়ে দেবেন? ডিজেলসহ সব উপকরণের দাম বাড়ায় ১ একর জমিতে বোরো আবাদ করতে গত বছরের চেয়ে অতিরিক্ত ২-৩ হাজার টাকা বেশি খরচ হবে। তেলের দাম বাড়ায় একরপ্রতি সেচখরচ ৪০০ টাকা, ট্রাক্টর দিয়ে চাষে ৩০০ টাকা ও মাড়াইয়ে ৩০০ টাকার খরচ বেশি পড়েছে। সারসহ অন্য উপকরণের দামও চড়া। তাই প্রতি একরে অতিরিক্ত খরচসহ মোট খরচ পড়ে ৪২ থেকে ৪৩ হাজার টাকা। অথচ প্রতি মণ ধানের দাম ৮০০ টাকা ধরে একরে ৫০ মণ ফলন হলেও ৪০ হাজার টাকার বেশি উঠবে না। তাহলে চাষ করে লাভ কী? পেটের দায়ে এবং উপায় নেই বলে কৃষক যদি চাষাবাদ করে তাকে কি স্থায়ী উন্নয়নের কৃষি অর্থনীতি বলা যাবে?

বিল গেটসরা জমি কিনছেন মুনাফার উদ্দেশ্যে কৃষিতে বিনিয়োগের জন্য। আমাদের দেশের কৃষকরা জমি চাষ করছেন টিকে থাকার জন্য। তাই কৃষককে টিকে থাকতে ভর্তুকি দেওয়া এক অর্থে দেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যই। কৃষি ভর্তুকিতে টাকার অভাবের দোহাই দিলে খাদ্য বাণিজ্য ও বাজার সিন্ডিকেটের হাতে জনগণকে অসহায় শিকারে পরিণত করা হবে।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত