এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পতনের ধ্বনি

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:১৪ পিএম

ভাবতেই অবাক লাগে, জোর যার মুল্লুক তার এটাই এখনো এই বিশ্ব পরাশক্তিদের মূলমন্ত্র। আর যার ফলাফল হচ্ছে ইউরোপে আরেকটা যুদ্ধ এবং বহু যুদ্ধের আশঙ্কা। বিশ্ব যেন উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আখড়া বাড়িতে পরিণত হয়েছে। যারা নিজেদের উদারপন্থি হিসেবে দাবি করে তারাও নিজেদের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে চায় এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন ছলচাতুরীতে যুদ্ধ বাধাতেও কম যায় না। এমনিতেই গত দুই বছর করোনার মতো অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত। করোনার প্রকোপ কিছুটা কমতে না কমতেই বিশ্ব আবার নতুন করে আরেক সংকটের মুখোমুখি। এ যেন এক নিরন্তর ধারাবাহিক দুর্যোগের মধ্যে বসবাস। আফগানিস্থান ও সিরিয়া যুদ্ধ শেষ, লিবিয়ার যুদ্ধের এক ধরনের সমাপ্তির মধ্যেই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের শুরু এবং এবার যখন করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ একটু ভালোর দিকে তখনই আবার নতুন সংকট শুরু। পৃথিবীব্যাপী জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতির উচ্চহার পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন ওষ্ঠাগত। রাশিয়া-ইউক্রেনের এই সংঘাত তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে দেবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু এই সংঘাত সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন পক্ষে যারা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দায়ী তারা কতটুকু তা অনুধাবন করতে পারেন তা বলা মুশকিল।

এরই মধ্যে অনেক গণমাধ্যমই এই সংঘাতের পেছনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের একগুঁয়েমিকে দায়ী করছে এবং এর বদৌলতে পুতিন সম্পর্কে বিশ্বমঞ্চে এক সাম্রাজ্যবাদী নেতার প্রতিচ্ছবি আমাদের সবার সামনে উঠে এসেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে পশ্চিমাদের সম্পর্ক কখনোই মধুর ছিল না। পশ্চিমাদের চোখে পুতিন একনায়ক, সাম্রাজ্যবাদী ও খলনায়ক, অন্যদিকে পুতিনের চোখে পশ্চিমারা প্রতারক, কথা দিয়ে কথা না রাখাদের দলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় রাশিয়াকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পশ্চিমারা ভঙ্গ করেছে। তবে ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর পশ্চিমাদের বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে বিপর্যস্ত রাশিয়ার জাতীয়তাবাদী নেতা পুতিন নিজেকে ধীরে ধীরে রাশিয়া তথা বিশ্বব্যাপী এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত করতে পেরেছেন। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুতিন যেমন পশ্চিমাদের চোখে খলনায়ক, কিছুদিন আগে এই পুতিনই ছিলেন কারও কারও কাছে পরম সহায়। পশ্চিমাদের দ্বারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে সিরিয়ায় যে নৈরাজ্য তৈরি হয়েছিল পুতিনের হস্তক্ষেপ ছাড়া এত তাড়াতাড়ি শেষ হতো বলে মনে হয় না। 

আমরা সময়ে সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক নৈরাজ্য, সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞ দেখতে পাই তার পেছনে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর প্রচ্ছন্ন ভূমিকা রয়েছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক সমর্থন, আবার কখনো কখনো একইসঙ্গে পরোক্ষভাবে অর্থ ও অস্ত্রের জোগান প্রায়শই বিশ্বব্যবস্থাকে অস্থির করে রাখে। যার ভুক্তভোগী কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। আবার প্রায়ই ব্যাপক মিডিয়া প্রচারণার মাধ্যমে কোনো ভিন্ন মতাবলম্বী রাষ্ট্রকে ‘ইভেল স্টেট’ হিসেবে চিত্রিত করা হয় এবং তাদের একঘরে রাখা হয়। ইরান, ইরাক, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া, বলিভিয়া, কিউবা, হালের রাশিয়া ও চীন ইত্যাদি। সারা পৃথিবীতে এই রাষ্ট্রগুলো সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা আছে। বলা হয় এই রাষ্ট্রগুলো একনায়কতান্ত্রিক বা মানবাধিকারের প্রতি হুমকিস্বরূপ, এর রাষ্ট্রনায়করা জনগণের ওপর বোঝা হয়ে বসে আছে। জনগণের সব দুর্গতির জন্য এরা দায়ী। বিষয়টা আসলে সব ক্ষেত্রে সত্য না। কারণ এই রাষ্ট্রগুলোর বাইরেও তথাকথিত মুক্তবিশ্বের সাধারণ ও দরিদ্র জনগণও খুব একটা ভালো নেই। দারিদ্র্য, অনাহার, রোগ-ব্যাধি ও নানা রকমের সংকটে তাদের জীবন অনিশ্চয়তায় ভরপুর। আবার এই রাষ্ট্রগুলোর বাইরে পৃথিবীর সব দেশ যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চর্চাকে সম্মান করে, মানবাধিকার সমুন্নত রাখে তাও কিন্তু নয়। তারপরও এদের মধ্যে কেউ কেউ কোনো না কোনো পরাশক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারছে বহাল তবিয়তে। নিজের মত, পথ ও আদর্শকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া থেকে কেউই যেন বের হয়ে আসতে পারছে না। আর এটাই সমস্ত সংকটের মূল উৎস। কী পশ্চিমা বিশ্ব, কী তথাকথিত ‘ইভেল স্টেট’ সবাই তাদের পথটাকেই সেরা মনে করছে, সেই পথটাকেই অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজের প্রভাব বলায় বাড়ানোর চেষ্টায় রত। বর্তমান ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংকটের পেছনে রাশিয়া ও ইউক্রেন যতটা দায়ী একইভাবে দায়ী অন্য পরাশক্তি দেশগুলো। যাদের উসকানি, আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে উভয় দেশের অতি জাতীয়তাবাদীদের আস্ফালন তাদের এই যুদ্ধের ময়দানে টেনে নিয়ে এসেছে।

অনেক বিশ্লেষক বলছেন আজকের এই যুদ্ধের পেছনে ন্যাটোর সম্প্রসারণ নীতিই দায়ী, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ারশ জোটের বিপরীতে ১২টি দেশ ন্যাটো জোটের সদস্য ছিল সেখানে বর্তমানে এই সামরিক জোটের সদস্য সংখ্যা ৩০টি। গত ত্রিশ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় এভাবে একটি সামরিক জোটের সম্প্রসারণ সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী। উল্লেখ্য, জোট সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়া দেশগুলোর উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও কিছুটা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা যায়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তার দৃষ্টিতে চীন হচ্ছে সব দিক দিয়ে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিক দিয়ে চীন ধীরে ধীরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে তার আশঙ্কা ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে লক্ষ্য করে কোয়াড জোটকে শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। তখন মনে করা হচ্ছিল আমেরিকা কৌশলগতভাবে তার সমস্ত মনোযোগ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে নিবদ্ধ করবে এবং স্বাভাবিকভবে তা ন্যাটোকে কিছুটা হলেও দুর্বল করবে। এটা খুবই স্পষ্ট ন্যাটোর মূল টার্গেট রাশিয়া এবং কোয়াডের প্রতিপক্ষ চীন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যিক যুদ্ধ শুরু করলেও তিনি বহির্বিশ্বে আমেরিকার সামরিক উচ্চাভিলাষ সংকুচিত করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়কালে বিশ্ব আরেকটি যুদ্ধ দেখল। আমেরিকা এই যুদ্ধের সরাসরি প্রতিপক্ষ না, কিন্তু আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব এই যুদ্ধের দায় এড়াতে পারবে না। যেমনটা হয়েছিল বারাক ওবামা ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সময় যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে যুদ্ধ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমান ইউক্রেন ও রাশিয়া সংকট বাংলাদেশের ওপর সুর্নিদিষ্ট কী প্রভাব ফেলবে তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। কিন্তু একটি বিষয় সবার সমানে আবারও উন্মোচিত হলো যে ছোট রাষ্ট্রগুলো কখনোই নিরাপদ নয়। এর বাইরেও ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি শত ডলার অতিক্রম করেছে। এর ফলে আরেক দফা দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী, ইউরোপে রপ্তানি বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এতো গেল কিছু নেতিবাচক আশু আশঙ্কার কথা কিন্তু তার থেকে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে বিশ্বে এখন চলমান এককেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আবার বহুপক্ষীয় ক্ষমতার বলয় তৈরি হতে যাচ্ছে, শুরু হতে যাচ্ছে শীতল যুদ্ধের নতুন অধ্যায়। আর এই সময় পরাশক্তিগুলো নিজেদের দল ভারী করার জন্য বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন ও চাপ প্রয়োগ করবে, এই চাপ বাংলাদেশ কীভাবে সামলাবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। 

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত