আমরা বহু দিন ধরে চিন্তা করেছি যে, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বিজ্ঞান আলোচনার জন্য এখনো তৈরি নয়। জাতির জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এ বিষয়ে দুটি কথার অত্যন্ত প্রয়োজন রয়েছে। এর প্রয়োজনীয়তা কী এবং কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত তা আপনারা আশা করি এ বিবৃতিটি পাঠ করার পর নিজেরাই নির্দিষ্ট করতে পারবেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানের একটা বিশিষ্ট শাখার অধ্যাপনার মাধ্যমে দেশের সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের দেশ শিক্ষায় অনগ্রসর বলে এখানে বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে দেশবাসীর যেমন কোনো চেতনাই ছিল না, শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধেও তাদের ধারণা ছিল অনবগতির মধ্যে সুপ্ত। সুতরাং পূর্ববর্তী রাষ্ট্রনায়কদের সহযোগিতার অভাব পদে পদে অনুভব করেছি এবং পূর্ব পাকিস্তানের শৈশবের কয়েকটি বছর কেমন যেন এক বিমুখ পরিস্থিতির মধ্যে কাটাতে বাধ্য হয়েছি।
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস থেকেই এ দেশে শিক্ষাকে সংস্কার করে জাতীয় জীবনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পরিতাপের কথা, সে পথে কোনো সাহায্যই পাইনি। তবু পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামের একটি ছোট থানায় অভাব-অভিযোগ সত্ত্বেও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলাম। শুনলাম তার ফলে আজ সেখানে লেখাপড়া জানা লোকের সংখ্যা শতকরা পঞ্চাশে দাঁড়িয়েছে। চেয়েছিলাম এই শিক্ষাধারাকে পাল্টে দিয়ে তাতে নতুনভাবে বিজ্ঞানের শিক্ষা প্রবর্তন করতে, কিন্তু সে অবসর পাইনি। সুতরাং বিজ্ঞানকে জীবনের অন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর মতো এ দেশে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।
তখন থেকে বিজ্ঞানের শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক কর্মধারার অভাবের কথা নিয়ে আমাদের তৎকালীন নেতাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে একটু সহানুভূতি ও সাহচর্যের প্রার্থনা জানিয়েছিলাম। কিন্তু পরিতাপের সঙ্গে আজ আমায় স্বীকার করতে হচ্ছে যে, বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে কারও মনেই যেন কোনোরূপ চেতনার আবির্ভাব দেখলাম না। মনে হলো, পাকিস্তানের এবং এক্ষণে বাংলাদেশের কর্ণধাররা বিজ্ঞানের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধই রাখেন না। আজিকার দিনে সে কথা বলা যাবে না, উপরন্তু মনে হয় এখন এ বিষয়ে আমরা কিছুটা সজাগ হয়ে উঠেছি। যারা বিজ্ঞানকে সাহিত্যালোচনার মধ্যে একটি বিশিষ্ট আসন দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন, তাদের সন্তোষের জন্য বাংলার সঙ্গে বিজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বিষয়ে দুটি কথা বলা আবশ্যক মনে করছি।
...
জাতীয় জীবনকে সর্বতোভাবে সম্পূর্ণ করার জন্য তার সাহিত্যের উন্নতি বিশেষভাবে প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি যে, আমাদের সবার মিলিত প্রচেষ্টা, সাহিত্য সম্মিলনে বিজ্ঞানকে বিশিষ্ট স্থান দিয়ে, বঙ্গভাষার মধ্যে বিজ্ঞানকে বিকশিত করার এই সুযোগ ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রেরণা পাবে। আমি মনে করি, বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক পরিভাষা সৃষ্টি করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। একটু যতœ নিলে ও পরিশ্রম করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে বিজ্ঞানের শব্দসম্ভারে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারব এবং ভাষাও তখন মনোজ্ঞ ও সুন্দর রূপ নেবে। এই কার্যে আপনাদের সবার সম্মিলিত আন্তরিকতাপূর্ণ সহায়তা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে কৃতকার্যতা আনতে একটুও বেগ পেতে হবে না।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের সূচনা অনেক আগেই হয়েছে। এরই মধ্যে কত নতুন পরিভাষা তৈরি হয়ে গিয়েছে এবং আরও কত নতুন শব্দ নিত্য তৈরি হয়ে চলেছে। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, বিজ্ঞানের আলোচনা, বিজ্ঞান নিয়ে পুস্তক রচনা এবং বিজ্ঞানের বিষয় অবলম্বন করে বক্তৃতা দেওয়া, এই বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আমরা দ্রুত নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করতে অগ্রসর হয়েছি। বিজ্ঞানের জন্য সাহিত্য রচনার সর্বাপেক্ষা সহজ উপায় হবে আমাদের বালক-বালিকাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাধারার মধ্যে বিজ্ঞানকে বাধ্যতামূলকভাবে স্থান দেওয়া। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে অবহিত হলে নতুন বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সৃষ্টির কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।
...
বর্তমানের বৈজ্ঞানিক কীর্তিধারার পরীক্ষায় প্রতীতি হয় যে, বিজ্ঞান আজিকার জীবনযাপনের পথে প্রত্যেক স্তরেই ওতপ্রোতভাবে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন, বসন ও ব্যসনের, আহার ও বিহারের মধ্যে জড়িত হয়ে পড়েছে। পাশ্চাত্য জাতি আজ সম্পূর্ণরূপে বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু তারা নিজ কর্মকুশলতা ও নবীন প্রেরণার সাহায্যে বৈজ্ঞানিক সম্পদরাজি নিজে নিজে প্রস্তুত করে নিজেকে পরনির্ভরশীলতা থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু আমাদের অবস্থা ভিন্ন। বিজ্ঞানের দান বিভিন্ন যানবাহন থেকে আরম্ভ করে আহার ও পরিধেয় বস্ত্র পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসই অন্যান্য দেশ থেকে নিয়ে আমাদের অভাব পূরণ হচ্ছে। যত দিন বিজ্ঞানের সাধনাকে আমরা ওইসব দেশের মতোই জীবনের সঙ্গে জড়িত করে নিতে না পারব, তত দিন আমরা আর্থিক সচ্ছলতার ক্ষেত্রে অন্যান্য জাতির সমকক্ষতা লাভ করতে পারব না। এখন সেই জন্য প্রয়োজন আমাদের জীবনযাত্রার পথকে বিজ্ঞানের সাহায্যে সহজ করে তোলা। কেবল যে বাংলা ভাষার দীনতা বৈজ্ঞানিক পরিভাষা দিয়ে অতিক্রম করতে হবে তা-ই নয়, বাংলার আনাচে-কানাচে প্রত্যেকটি শিশু এবং যুবক-যুবতীকে অবহিত হতে হবে যে, বিজ্ঞানের সাধনা দেশের মঙ্গলের জন্য আশু প্রয়োজন। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে, চিন্তাক্ষেত্রে বা কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই বিজ্ঞানকে তার প্রাপ্য স্থান এখনই দিতে হবে।
উপসংহারে এই বিনীত নিবেদন পেশ করতে চাই, আসুন বিজ্ঞানকে আমাদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্ববিধ বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে গিয়ে আমরা সবাই মিলে নতুন সাহিত্য সৃজন করি। এ কাজের সহায় হিসাবে বিজ্ঞানকে অবশ্যপঠনীয় বিষয় বলে আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষালয়ে প্রতিষ্ঠিত করুন। মাধ্যমিক ধাপের শিক্ষাকে পূর্ণতর করার জন্য কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষাকে ব্যাপকতর ও পূর্ণতর করে তুলুন। বিজ্ঞানের জীবন ও স্থিতি নির্ভর করে গবেষণার ওপর। প্রত্যেকটি কর্মক্ষেত্রে কৃতকার্যতা লাভ করতে হলে গবেষণার ব্যাপক ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণা ব্যাপকভাবে হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ব্যবহারিক গবেষণার জন্য বহু কেন্দ্র দেশে স্থাপন। করতে হবে। এ কাজের জন্য যে গবেষণাগার এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার জন্য উন্নত শ্রেণির বিজ্ঞানী তৈরি করুন যারা আরদ্ধ কাজ সম্পূর্ণ করতে পারবেন ও দেশের নতুন সম্পদের জন্য আরও বিভিন্ন শ্রেণির গবেষণাগারের সৃষ্টি করবেন। কোনো দেশ আজ পর্যন্ত গবেষণাকে বাদ দিয়ে শিল্প গড়ে তুলতে পারেনি, কিন্তু একমাত্র এ দেশেই সেরূপ প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে সত্যিকার শিল্পোন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য নতুনতর গবেষণাগারের প্রয়োজন আমরা প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করছি।
কিন্তু বিজ্ঞানের সাফল্য, সে শিক্ষাক্ষেত্রেই বলুন আর শিল্পক্ষেত্রেই বলুন, তখনই সম্ভব হবে যখন দেশে সত্যিকারের বিজ্ঞান সাহিত্য গড়ে উঠবে। বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টার সঙ্গে আপনাদের মঙ্গলকর যুক্ত করুন, নিশ্চিত তাহলে নতুন সাহিত্য গড়ে উঠবে। এ দেশের বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবার কাছে বিজ্ঞানের কথা সাহিত্যসহযোগে বহন করে নিয়ে চলুন। ঘুমন্ত দেশে কর্মের প্রেরণা জেগে উঠুক। বিশ্বপিতার অসীম করুণার স্রোত বন্যাবেগে বাংলাদেশের ওপর নেমে আসুক।
* আবদুল্লাহ আল-মুতী সম্পাদিত বাংলাদেশের বিজ্ঞানচিন্তা, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৮ থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে চয়িত।
