সরকারি তথ্যে বাস্তবতার মিল নেই : সানেম

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ১২:৪৮ এএম

মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাচ্ছে না বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-সানেম। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত হারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জানুয়ারি মাসে বিবিএস পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হিসাব দিলেও সানেম শহর এলাকার চার শ্রেণির মানুষের জীবন-মানের তথ্য হিসাব করে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি পেয়েছে। আর গ্রামে তা হয়েছে ১১ দশমিক ২১ শতাংশ।

একইভাবে ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের হিসাবে শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে হয়েছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।

পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, রিকশা ও ভ্যানচালক এবং ছোট ব্যবসায়ী এই চার শ্রেণির মানুষের জীবনধারণ প্রবণতার তথ্য নিয়ে মূল্যস্ফীতির এই হিসাব করা হয়েছে বলে জানায় সানেম।

ড. সেলিম রায়হান বলেন, ২০১৮ সালে সানেম ও পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ১০ হাজার ৫০০টি পরিবারের দেশব্যাপী সমীক্ষার বিশদ তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে এই হিসাব করার ক্ষেত্রে। ওই সমীক্ষার তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে আমরা প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি সাধারণ খাদ্যসামগ্রীর তালিকা বা ফুড কনজাম্পশন বাস্কেট তৈরি করেছি। এই তালিকার প্রতিটি সামগ্রীর জন্য আমরা নতুন করে প্রতিমান গণনা করেছি।

তিনি আরও বলেন, ‘ওই তালিকা বা ফুড বাস্কেটের ওপর ভিত্তি করে সরকারের কৃষি বিপণন বিভাগ এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সংগৃহীত খুচরা মূল্যের উপাত্তের ভিত্তিতে মাসিক পয়েন্ট টু পয়েন্ট খাদ্য মূল্যসূচক এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার হিসাব করা হয়েছে।’

বিবিএস ২০০৫-০৬ অর্থবছরে পরিচালিত খানা আয়-ব্যয় জরিপকে ভিত্তি ধরে ভোক্তা মূল্যসূচক তৈরি করে বলে মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদনে এখন যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা যৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক।

তিনি বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আরেকটি খানা আয়-ব্যয় জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকেই সেই জরিপের তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব। অথচ তুলনামূলক সেই হালনাগাদ উপাত্ত কেন ব্যবহার করছে না, সেটি স্পষ্ট নয়।

সেলিম রায়হান বলেন, দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বাড়ছে তার প্রভাব বিবিএসের হিসাবে দেখা যাচ্ছে না। বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই বিশ্ববাজার এবং দেশীয় বাজারে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পেলেও বিবিএসের হিসাবে গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারি মাসে কমে গেছে।

বিবিএসের জানুয়ারি মাসের হিসাবে খাদ্য খাতে সামান্য কিছু বেড়েছে। কিন্তু সাধারণভাবে গ্রামাঞ্চলেও কমেছে। এমনকি শহরাঞ্চলেও সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারি মাসেও শহরাঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে দেখাচ্ছে। ওই মাসে গ্রামাঞ্চলের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মতো দেখিয়েছে।

সরকারি এই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেলিম রায়হান বলেন, ‘টিসিবি ট্রাকের পেছনে যে লম্বা লাইন দেখছি, এগুলো কিন্তু কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে যদি বিবিএস আমাদের বলে মূল্যস্ফীতি উদ্বেগজনক নয় এবং মূল্যস্ফীতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে আমাদেরকে সেই জিনিসটা ভাবায়। এই ভাবনা থেকেই আপনাদের সামনে বিষয়টা তুলে ধরা।’

সানেমের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় সব ধরনের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর সব দেশেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। একইভাবে বাংলাদেশের বাজারেও সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধির পরও সরকারের পক্ষ থেকে সহনীয় মূল্যস্ফীতি বলে যে তথ্য দিচ্ছে, এটা বিভ্রান্তিকর।’

‘সরকারি পরিসংখ্যান বনাম প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সানেম চেয়ারম্যান অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার বলেন, ‘বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০১১ সালের পরে ২০২১ সালে বিশ্বে খাদ্য পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি ২৮ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা এখনো চলমান রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশ এটার বাইরে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।’

তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ে সানেমের উপস্থাপন করা তথ্য মানতে রাজি নন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল বিকেলে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সানেম কীভাবে এই পরিসংখ্যান বের করেছে, তা আমাদের জানা নেই। সরকারি সংস্থা বিবিএস যে পরিসংখ্যান দেয়, সেটিই সঠিক। এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও ব্যবহার করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত