ক্যাম্প থেকে বের হয়ে শত্রুপক্ষকে তছনছ করে দিতাম

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ০৫:৫৫ এএম

আমি যখন যুদ্ধে যাই, তখন আমার বয়স ২৪/২৫ বছর হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সুদৃঢ় প্রত্যয়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য সক্রিয়ভাবে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। আমার জন্ম চট্টগ্রামের মিরসরাই থানার ১৩ নম্বর মায়ানী ইউনিয়নের সৈদালী গ্রামে ১৯৪৫ সালে। বাবা মরহুম আবদুল সাত্তার ও মা মরহুমা রাবেয়া খাতুন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মিরসরাই থানার দক্ষিণে ফেনাপুনি পুল এবং বড়তাকিয়া বাজারে চট্টগ্রামমুখী পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এ সময় অনেক গোলাগুলি হয়। পরে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে বড়তাকিয়া বাজারের পশ্চিম পাশের গ্রাম সৈদালীতে গণহত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় তারা। সেদিন ছিল ২০ এপ্রিল। সেদিন আমাদের গ্রামে ২০ জন শহীদ হন এবং পরে আহত একজন মারা যান। আমার জ্যাঠাতো ভাই শহীদ কবির হোসেনও সেদিন হানাদারের বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। সেদিন আমাদের ঘর ও আমার চাচা-জ্যোঠাদের ঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পাকিস্তানি সৈন্যরা। আমি অনেককে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করি এবং আহতদের আবুতোরাব বাজারে নিয়ে চিকিৎসা করাই। এরপর সৈদালী গ্রামে বিরানভূমি দেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অনেক সাথী-ভাইকে নিয়ে ভারতে চলে যাই।

ভারতে দেড় মাস প্রশিক্ষণ শেষে ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন এনাম, ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা, মেজর রফিকুল ইসলাম এবং লেফটেন্যান্ট ফারুকের নেতৃত্বে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করি। বাংলাদেশ বর্ডারের পাশে ভারতের সাবরুম বাজার, মনু বাজার ও হরবাতলীএ তিন জায়গায় আমাদের ক্যাম্প গঠন করা হয়। সেখান থেকে আমরা আমরিঘাট, আন্দার মানিক, বাগান বাজার, হলদিয়া ডেবা, চিকনছড়া, রামগড়, তবলছড়ি, বিলাইছড়ি, কালাপানিয়া, ফবাড়ি, চামলাইশ্যা, কইলা, কাঁঠালছড়ি ও চা বাগানসহ বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করি।

প্রায় সময় আমরা সন্ধ্যা ৫টা-৬টার দিকে এবং বেশিরভাগ সময় ভোর ৩টা-৪টায় ক্যাম্প থেকে বের হয়ে শত্রুপক্ষকে তছনছ করে দিতাম। পরে সাধারণ মানুষের মাধ্যমে জানতে পারতাম যে এতে কত পাকিস্তানি সৈন্য নিহত ও আহত হয়েছে। বিভিন্নভাবে খবর পেতাম যে, রাজাকার, আলবদর, আল-শামস, মুজাহিদরা হানাদার বাহিনীর কাছে আমাদের মা-বোনদের বিভিন্নভাবে তুলে দিত। কোনো অপারেশনের আগে আমরা পাঞ্জাবিদের অবস্থান শনাক্ত করতে সাধারণ মানুষ সেজে রেকি করতে যেতাম। তখন দেখতাম স্কুল-কলেজ পড়–য়া মেয়েদের শুধুমাত্র আন্ডারওয়্যার পরিয়ে গোসল করাতে নিয়ে আসত। এ রকম আরও অনেক ঘটনা আছে, যা প্রকাশ করার মতো নয়।

অনেক সময় আমরা কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান নিতাম। পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন আমাদের সীমানায় উপস্থিত হতো তখন হামলা চালিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতাম। এ রকম হামলায় তাদের অনেক সৈন্য নিহত হতো।

যুদ্ধকালীন হাবিলদার বিল্লালের নেতৃত্বে আন্দার মানিক স্থানে একটি অ্যামবুস বানাই। সেখানেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ হয় এবং ৭ জন পাঞ্জাবি নিহত হয়। এর কয়েক দিন পর আমরা সেখানে আবার অ্যামবুস বসাই। তখন ওই অ্যামবুসের কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন হাবিলদার মেজর মজিবর। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান। তখন সেখানে আমার নেতৃত্বে যুদ্ধ হয়। ওই ঘটনার কিছুদিন পর ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা শহীদ হন।

একদিন ক্যাপ্টেন মাহফুজ আমাদের ডেকে বললেন যে, চিকনছড়ায় যদি কোনো অ্যামবুস বসানো হয় তাহলে আমাদের কোনো জওয়ান ওখান থেকে ফিরে আসতে পারবে না। কারণ নকশা অনুযায়ী ওই জায়গাটা ছিল খুবই বিপজ্জনক। তখন লেফটেন্যান্ট ফারুক সুবেদার হাফেজকে বললেন, ওই চিকনছড়ায় আমার জওয়ানরা অ্যামবুস বসাবে। কিন্তু সুবেদার হাফেজ তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তখন লেফটেন্যান্ট ফারুকের নির্দেশে আমি হাবিলদার মেজর নুরুল আলমকে ডেকে আনলাম। মেজর নুরুল আলম তার প্রস্তাব মানলেন।

আমরা বিকেল ৫টার দিকে চিকনছড়ার দিকে রওনা হলাম এবং খুবই গোপনে ও সতর্কভাবে অ্যামবুস বসালাম। আমাদের সঙ্গে দুজন সাধারণ মানুষ ছিল। তারা আমাদের পথ দেখিয়ে দিত। আমরা যে রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করেছিলাম ওই রাস্তায় আমাদের পায়ের চিহ্ন দেখে হানাদার বাহিনী আমাদের ঘেরাও করে ফেলে। কিন্তু সেটা আমরা জানতাম না। যখন আমাদের ওপর ত্রিমুখী হামলা শুরু হয় তখন অ্যামবুস রেখে একটি খামারবাড়িতে আশ্রয় নিলাম আমরা। বুঝতে পারলাম, পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমরা তখন বাঁচার জন্য কৌশল অবলম্বন করি। পাকিস্তানি সৈন্যরা পাহাড়ের যে ক্যাম্পে ছিল আমরা ওই পাহাড়ের গোড়ায় আশ্রয় নিলাম। সেখানে দু’রাত একদিন পাকিস্তানিদের ঘেরাওতে ছিলাম। জলিল নামে একজন লোক এসে আমাদের রাতের অন্ধকারে পথ দেখিয়ে ভারতের মনুবাজার ক্যাম্পে পৌঁছে দেন।

এর কয়েকদিন পর আমাদের ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তখন আমরা হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। শুভপুর ব্রিজ, চিনকি আস্তানা, জোরারগঞ্জ, মিরসরাইসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করি। বাঁশবাড়িয়া থেকে কুমিরা ঘাটঘর ও কুমিরা টিবি হাসপাতাল এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি শেষ যুদ্ধ হয়।

সে দিনটি ছিল ১৪ ডিসেম্বর। সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে আমাদের বিমান হামলা, ট্যাংক হামলাসহ তুমুল যুদ্ধ হয়। এতে আমাদের ১৫০-২০০ গজ পেছনে থাকা মিত্র বাহিনীর ১৫০-২০০ সৈন্য নিহত হন। এটি ছিল আমাদের স্মরণীয় যুদ্ধ।

সেদিন আমাদের দুজন শহীদ হন। একজন শহীদ কামাল, অন্যজন শহীদ আবুল কালাম। আমিসহ আহত হই আরও অনেকে।

তার দুই দিন পর অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

লেখক : যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত