অপরাধে পুলিশের ৫০০ সোর্স

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৩:০৭ এএম

পুলিশের অন্তত ৫০০ সোর্স অপরাধে জড়িত, যাদের অনেকেরই বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড, চাঁদাবাজি, হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এ তথ্য জানিয়ে পুলিশ সূত্র বলছে, এই দাগি সোর্সদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ আসছে। এর ভিত্তিতে তাদের পরিচয়সহ একটি তালিকা করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সব মহানগর পুলিশের কমিশনার ও ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে চিঠি পাঠিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর সোর্সদের লাগাম টানতে বলেছে। পুুলিশের যারা সোর্স ব্যবহার করেন, তারা যেন তাদের আমলনামা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেন। অনেক সোর্স আছেন তারা নিয়মিত অর্থ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ এসেছে। নির্দিষ্ট অঙ্কের সোর্সমানিও বণ্টন করা হচ্ছে না। ফলে সোর্সরা অপরাধে ঝুঁকছেন।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হায়দার আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোর্সরা পুলিশের নাম ব্যবহার করে অপরাধ চালায় বলে আমরা প্রায়ই অভিযোগ পাচ্ছি। অপরাধ যারা করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদক, অস্ত্র উদ্ধার, জঙ্গি দমন অভিযান আরও গতিশীল করতে সোর্সদের জন্য টাকা খরচের বিষয়টি জবাবদিহির মধ্যে আনা হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যদের আশকারা পেয়েই সোর্সরা অপরাধ কর্মকা- চালায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট মহানগর এলাকায় সোর্সরা বেশি অপরাধ করছে। জেলা শহরেও যে কম হচ্ছে তা বলা যাবে না। এসব স্থানেও সোর্সদের কারণে অপরাধ হচ্ছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে সোর্সদের অপরাধের বিষয়টি জানিয়ে। ওই সব সোর্সের বিরুদ্ধে শিগগির অভিযান শুরু হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর যেসব এলাকায় মদের বার রয়েছে, সেই সব এলাকায় সোর্সদের তৎপরতা বেশি। মদ্যপান করে আসা ব্যক্তিরাই তাদের প্রধান টার্গেট। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্লাব থেকে আসা নারী-পুরুষরাও নিয়মিত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে; বিশেষ করে পুরান ঢাকার ওষুধ, কাপড় ও ভাঙারি ব্যবসায়ীরা সোর্সদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এ বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দিলে কিছুদিন সোর্সদের অপকর্ম বন্ধ থাকে। এরপর আবার শুরু হয়ে যায়। অপরাধে জড়িত সোর্সদের চিহ্নিত করতে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করে। ইতিমধ্যেই অধিকাংশ থানার ওসি এসব সোর্সের তালিকা তৈরি করে মহানগর পুলিশ কমিশনার ও এসপিদের কাছে পাঠান। পরে তারা ওই তালিকাটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছেন। অপরাধে জড়িত থাকলেও তালিকায় পছন্দের সোর্সদের নাম রাখা হয়নি বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া অনেকে নিজের নাম কাটাতে তদবিরও করছেন। এ জন্য অর্থ লেনদেন হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের সোর্সরা অনেক সময় নাম ভাঙিয়ে অনেক অপকর্ম করে। এটা বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। এ কারণে ম্যানুয়ালি সোর্সনির্ভরতা কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সোর্সদের সঙ্গে অপরাধ কর্মকান্ডে কোনো পুলিশ সদস্যদের নামে অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সাদাপোশাকের পুলিশের কার্যক্রমও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সোর্স দেশ রূপান্তরকে জানান, বিভিন্ন থানা এলাকায় উপপরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপপরিদর্শকদের (এএসআই) পছন্দের সোর্স রয়েছে। রাতে দায়িত্ব পড়লে সোর্সদের ডেকে নেওয়া হয়। এরপর টার্গেট করে তারা মাঠে নামেন। রাত শেষে অবৈধ উপার্জনের ২৫ শতাংশ সোর্সরা ভাগ পান। মাসে অন্তত ১২ দিন রাতে তারা দায়িত্ব পালন করেন। ওই ১২ দিনই সোর্সরা উপার্জন করে সংসার চালান। আবার অনেক সোর্স মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা জোগাড় করতেও তারা পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করে থাকেন।

জানা গেছে, পুলিশের উপস্থিতিতে দেহ তল্লাশির নামে নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বেশি তুরাগ, মিরপুর, কাফরুল, পল্লবী, ভাষানটেক, লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, যাত্রবাড়ী, কদমতলী, কোতোয়ালি, ডেমরা ও শেরেবাংলানগর থানা এলাকায়।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার দিকে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন হাসান ও পারভেজ নামের দুই বন্ধু। তাদের বহনকারী রিকশাটি মিরপুর ২ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় পৌঁছালে দুই সোর্স তাদের গতিরোধ করে। তারা দেহ তল্লাশি করতে চায়। এ সময় তাদের বাধা দেওয়া হলে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেন পুলিশের পিকআপচালকও। শেষমেশ চা-নাশতা খাওয়ার জন্য কিছু টাকা দিতে বলেন। পরে স্থানীয় লোকজন জড়ো হলে পুলিশের গাড়িতেই ওই দুই সোর্স স্থান ত্যাগ করে। সেখানে উপস্থিত একজন এসআইয়ের বুকে নেম প্লেট খোলা অবস্থায় ছিল। সে কারণে তার নাম জানতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। তবে মাথার চুল লাল বলে জানান তারা।

এর আগে ২২ জানুয়ারি রাতে মিরপুর এলাকায় অস্থায়ী চেকপোস্টে পুলিশের তল্লাশির শিকার হন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাদাপোশাকের কাফরুল থানা পুলিশ তাকে থামিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করতে শুরু করে। এ সময় তাদের সঙ্গে অন্তত দুজন সোর্স ছিল। তল্লাশির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি নিজেকে কাফরুল থানার পরিদর্শক অপারেশন বলে ভুক্তভোগীর কাছে পরিচয় দেন। এভাবে সোর্সরা তল্লাশি করতে পারে কি না, জানতে চাইলে উল্টো ভুক্তভোগীর কাছে মাদক আছে বলে দাবি করে বসে তারা। পরে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে তিনি ফোন দিলে তারা স্থান ত্যাগ করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত