চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে মাদ্রাসা থেকে এক শিশুর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের চার দিনের মাথায় আরেকটি মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তার নাম মো. আরমান হোসেন (১৪)। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে পাঁচলাইশের মুরাদপুর ডানকান হিল পিলখানা এলাকার আলী বিন আবি তালিব (রা.) মাদ্রাসার পেছনের পরিত্যক্ত জায়গা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া মাদ্রাসাছাত্রের মরদেহের মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন পাঁচলাইশ থানার ওসি জাহিদুল কবীর।
এদিকে লাশ উদ্ধার হওয়া আরমান মাদ্রাসায় শিক্ষকের হাতে যৌন হয়রানির কথা জানিয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগে সেখানে আর যেতে চাইছিল না বলে জানিয়েছেন তার এক স্বজন। আরমানের বাবার দাবি, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের ধারণা, মাদ্রাসার ভেতরে একটি ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে এই মাদ্রাসাছাত্রের।
নিহত আরমান চট্টগ্রামের নগরীর মির্জাপুল এলাকার আলী আব্বাস ও সাহানারা দম্পতির একমাত্র ছেলে। মাত্র দুই মাস আগে সে আলী বিন আবি তালিব (রা.) মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ভর্তি হয়। এর আগে সে দারুল আরকান তাহফিজুর কুরআন মাদ্রাসা থেকে কোরআনে হাফেজি শেষ করে।
ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে আরমানের বাবা আলী আব্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবার বিকেলে মাদ্রাসা থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হয় আরমান মাদ্রাসার ছাদে খেলতে যাওয়ার পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে আমিসহ আমার আত্মীয়স্বজন এসে মাদ্রাসা ও আশপাশ এলাকায় খোঁজ করি। কিন্তু কোথাও তাকে না পেয়ে রাতে ফিরে যাই। পরে আজ (গতকাল মঙ্গলবার) সকাল সোয়া ১০টার দিকে আমাদের ফোন করে জানানো হয় আমার ছেলের লাশ পাওয়া গেছে।’
বিলাপ করতে করতে আব্বাস আরও বলেন, ‘আমার ছেলে কোরআনে হাফেজ ছিল। এ বছর রোজায় তারাবির নামাজ পড়াবে বলে তার কোরআন চর্চার জন্য তাকে আমরা এই মাদ্রাসায় ভর্তি করি। আমার ঘরে আর কোনো সন্তান নেই, সে ছিল আমাদের সবকিছু। তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা না হলে আমার সুস্থ ছেলেটা কেন ছাদ থেকে পড়বে?’ আরমান সপ্তাহ দুয়েক আগে মাদ্রাসায় শিক্ষকের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিল উল্লেখ করে তার ফুপু রেহেনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সে আমার সঙ্গে করোনার টিকা নিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে যায়। তখন আমাকে জানায় সে আর মাদ্রাসায় যেতে যায় না। কেন যেতে চায় না জিজ্ঞেস করলে সে বলে, মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি করছে এক শিক্ষক। কিন্তু সে ছোট মানুষ, মাদ্রাসায় না যাওয়ার ভয়ে এমন বলছে ভেবে আমি ধমক দিয়ে মাদ্রাসায় পাঠাই।’
গতকাল মুরাদপুর ডানকান হিল পিলখানা এলাকার মাদ্রাসাটিতে গিয়ে দেখা যায় ফটকের বাইরে নিহত আরমানের বাবা, মামা ও তিন ফুপু বসে কাঁদছেন। পরে মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে এই প্রতিবেদক আরমানের মৃত্যুর বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেও কেউ বাইরে এসে কথা বলতে রাজি হয়নি।
আরমানের মৃত্যুর বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদ্রাসাটির এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘সে (আরমান) আমাদের সঙ্গে প্রথম তলায় ক্লাস করত। অন্যদিনের মতো সে বিকেলে ছাদে খেলতে যায়, এরপর আমরা নেমে চলে আসি। পরে তাকে না দেখে মাদ্রাসার হুজুরকে জানালে সবাই মিলে খোঁজাখুঁজি করি।’
মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৫টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী খেলতে ছাদে যায় এবং ছাদেই দৌড়ঝাঁপ করে। খেলাধুলা শেষে সবাই নেমে এলেও আরমানকে নামতে দেখা যায়নি। ফুটেজের সময় আগপিছ করেও দেখা মেলে না তার নামার।
পাঁচলাইশ থানার ওসি জাহিদুল কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি কোনোভাবে খেলতে গিয়ে সে (আরমান) পড়েছে এবং পড়ে আঘাত পাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে। ছাদে গিয়ে আমরা দেখেছি ছাদের এক অংশে শেডের ওপর অনায়াসে উঠে যাওয়ার জায়গা আছে, যা খুবই বিপজ্জনক। তাছাড়া রেলিংগুলো নিচু হওয়ায় পড়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমরা লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছি। সেটির রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ বিস্তারিত জানা যাবে।’
তবে পুলিশের ধারণা ভুল দাবি করে নিহত আরমানের মামা মো. সুমন বলেন, ‘মাদ্রাসার রেলিংগুলো যথেষ্ট উঁচু এবং ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর যদি পড়েও যায় তাহলে ঘটনাস্থলের আশপাশে রক্তে ভরে থাকার কথা। কিন্তু আমরা এসে সামান্য রক্ত ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা হত্যা। মাসখানেক আগে সে (আরমান) বাসায় ছুটিতে এসে জানায় যে তাকে মারধর করায় কানে আঘাত পেয়েছে। আমরা ভাবলাম দুষ্টুমি করেছে, তাই মাদ্রাসার শিক্ষকরা বকা দিয়েছেন। এরপর থেকে মাদ্রাসা যেতে রাজি হয়নি। তাও আমরা পাঠিয়েছি কারণ আমাদের পরিবারের সবার ইচ্ছা ছিল তার পেছনে আসছে রোজায় তারাবির নামাজ আদায় করব।’
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘মাদ্রাসার শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট বাকি সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাকিটা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে বলা যাবে।’
