রাজধানীর শাহজাহানপুরে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১০টার দিকে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে গুলি করার সময় ঘটনাস্থলে থাকা কলেজছাত্রী সামিয়া আফরান প্রীতিও নিহত হন।
নিহত প্রীতি বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী। আকস্মিকভাবে তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নেটিজেনরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রীতিকে ‘রাজনৈতিক ও দুর্বৃত্তায়নের বলি’ বলে উল্লেখ করছেন তারা।
রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা মসজিদ এলাকায় যানজটে আটকে থাকা জাহিদুলের মাইক্রোবাসকে লক্ষ্য করে হেলমেট পরিহিত অজ্ঞাতরা এলোপাতাড়ি গুলি করলে পাশে রিকশায় থাকা প্রীতিও গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় টিপুর পরিবারের পক্ষে মামলা করা হলেও প্রীতির পরিবার মামলা করবেন না বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমকে। মামলা না করার কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, গরিব মানুষ, মামলা চালানোর টাকা নেই। এ ছাড়া বিচার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।
মামলা না করার বিষয়টিও আলোচনা হচ্ছে ফেসবুক জুড়ে। কেউ কেউ মনে করছেন এর পেছনে ‘অন্য কোনো চাপ’ থাকতে পারে। স্বাধীন দেশের একজন মানুষের রাজধানীর মতো জায়গায় জীবনের নিরাপত্তা নেই এই বিষয়টিই অনেকের স্ট্যাটাসে উঠে আসছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, মানুষের নিরাপত্তা ও বিচারহীনতার বিষয়গুলো ফের আলোচনায় এসেছে।
প্রীতির মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবেশী আনাস আদ্রিয়ান নামে একজন একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি প্রীতির চারিত্রিক দৃঢ়তা ব্যাখ্যা করে এমন মৃত্যুর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া কবি সাদ রহমান এক স্ট্যাটাসে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন মাহতাব হোসেন নামে এক সংবাদকর্মী।
নিচে তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো তুলে ধরা হলো-
আনাস আদ্রিয়ান লিখেছেন, ‘সামিয়া প্রীতি আপুকে চিনি অনেক আগে থেকেই। খুব ছোটবেলায়, মক্তবে পড়ার সময়ে যখন শান্তিবাগের মসজিদের পেছনের গলিতে ক্রিকেট খেলতাম আমরা, তখন আপু মাঝেমধ্যে এসে ব্যাট করতো। বেশির ভাগ সময়ই ব্যাটে বল লাগতো না। আমাদের আস্তে বল করতে বলতো। সামিয়া আপুর সঙ্গে সামনা-সামনি এর চেয়ে বেশি স্মৃতি আমার নাই। এর পরে ওই গলিতেও ক্রিকেট খেলা হয় নাই আর বেশি দিন।’
তিনি প্রীতির দৃঢ়চেতা মনোভাবের বিষয়ে লিখেছেন, ‘তবে শান্তিবাগে প্রায়ই সামিয়া আপুর দেখা পেতাম। সে সব সময় দৃষ্টিগোচর হতো, কারণ তার হাঁটার ধরন ছিল অন্য সবার চেয়ে ভিন্ন; ছুটে চলার মতো। যদ্দূর বুঝতাম, সে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছিলো, দুরন্ত ছিল, স্বাধীনচেতা ছিল। ফলে এলাকার গান্ডুদের কাছে সে বেশ সমালোচিতও ছিল। তাকে উচ্ছৃঙ্খল বলা হতো। আমাদের কানে আসতো সেসব আলোচনা। তবে বুঝতাম এমন আলোচনা-সমালোচনাকে সামিয়া আফরান প্রীতি ভালো মতোই বুড়ো আঙুল দেখাইতে পারতো। কোনো কিছুই তার উড়ন্ত ছুটে চলাকে থামাতে পারতো না। বুঝতাম, কখনো পারবেও না।’
ওই এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘শাহজাহানপুর, খিলগাঁও, মালিবাগ, শহীদবাগ ইত্যাদি এলাকার নেতাদের কোন্দল বেশ পুরোনো। এখানে নেতারা মারামারি করে মরে। তাতে আমার মতো মানুষের খুব দুঃখ নাই। কিন্তু, এসব মারামারির গুলি খেয়ে- সামিয়া আপুর মতো দুরন্ত, সম্ভাবনাময় তরুণীর মৃত্যুর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় আমি জানি না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও এই সব মারামারি করা নেতাদের প্রতি ঘৃণা জানানো ছাড়া আর কিছুই করার নাই।’
প্রীতির বাবার আইনি পদক্ষেপ না নেয়ার কারণ হিসেবে আনাস লিখেন, ‘সামিয়া আপুর বাবা বললো সে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিবে না। তার এমন বলার কী কারণ জানি না। কিন্তু, এর পেছনে বড় কোনো প্রেশার আছে ভেবে শঙ্কিত হই। জানি, বাংলাদেশে বিচার নামক জিনিসটা হারিয়ে গেছে বহু আগেই। আজ থেকে সামিয়া আফরান জামাল প্রীতির উড়ন্ত ছুটে চলার সমাপ্তি।’
কবি সাদ রহমান লিখেছেন, ‘শান্তিবাগে মায়ের বাসায় গেলে এখনো মেয়েটাকে রাস্তায় এবং দোকানে-টোকানে দেখতাম। দেখতাম, সেই ছোটবেলা থেকেই। যথেষ্ট চঞ্চল আর ড্যাম কেয়ার প্রকৃতির ছিলেন, দূর থেকে দেখলেও সেটা ঠিকই বোঝা যাইতো।
গতকালকে নাকি গুলি খাইয়া মারা গেলেন। আজকে পত্রিকায় ঘটনাটা পইড়া আমি তো অবাক। খারাপও লাগলো, কারণ মেয়েটাকে আর শান্তিবাগের রাস্তায় তার চঞ্চল প্রকৃতি সহ উইড়া বেড়াইতে দেখবো না।’
ঘটনাস্থল নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকার এই সাইডটা বসবাসের জন্য এখনো ক্যানো এতো রিস্কি এবং অনিরাপদ, এবং পুলিশ ও সরকারের এইটা নিয়া ক্যানো কোনো মাথাব্যথা নাই? আমি পুলিশ প্রশাসন এবং প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। মালিবাগের ওইপাশে- শাহজাহানপুর, শহীদবাগ, খিলগাঁও, বাসাবো, মুগদা, মেরাদিয়া ইত্যাদি এলাকাগুলা এখনো খুব ভয়ংকর হইয়া আছে।’
মাহতাব হোসেন লিখেছেন, ‘বদরুন্নেসা থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়া প্রীতির সামনের মাসে একটি নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। ১৫ হাজার টাকা বেতনের সেই চাকরিতে যোগ দেওয়া হলো না তাঁর। ২২ বছরের একটা বুলেটে নাই হয়ে গেল। ২৪ ঘণ্টাও হয়নি সে চলে গেছে।
প্রীতির আসলে ভাগ্যটাই খারাপ। গত ৪ দিন ধরে সে বান্ধবী সুমাইয়ার বাসায় ছিল। গতকালই সে বাসায় ফিরেছিল, একদম বাসার কাছাকাছিও চলে এসেছিল। সে সময় মা হোসনে আরা বেগম, ফোন দিয়ে বললেন, আরেকদিন সুমাইয়ার বাসায় থাকতে। কারণ বাসায় মামা-মামী চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন। তাই প্রীতি সুমাইকে ফোন দিয়ে ডেকে নিয়েই তার সঙ্গে রিকশায় ফিরে যাচ্ছিল তিলপাপাড়ায়।
আর ফিরতে পারলো না প্রীতি ক্ষমতা ভাগাভাগির বলি হতে হলো প্রীতিকে। রিকশাতেই গুলি খেয়ে পড়ে যায় প্রীতি।
দেশে যেভাবে ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি চলছে তাতে আমি ও আপনি যে কোনো সময় প্রীতির জায়গায় চলে আসবো। ছবি হয়ে যাব, দেশে বলার নেই কওয়ার নেই। মানুষও চুপচাপ, নিজের গায়ে আঁচ না লাগা পর্যন্ত টু শব্দও করে না।
আজব এক রাষ্ট্রে বসবাস করছি, যেখানে লজ্জায় প্রীতির কাছে ক্ষমাও চাইতে পারি না আমরা...।’
