অতিরিক্ত লবণ বন্ধ করতে পারলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমবে

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২২, ০৮:২৯ পিএম

প্রতিদিন একজন মানুষের ৫ গ্রাম অর্থাৎ এক চা চামচ লবণ খাওয়া দরকার। তবে দেখা যায় লবণ গ্রহণের মাত্রা কয়েক গুন বেশি। শুধু ভাত-তরকারিতে নয়, না জেনে বাইরের খাবার থেকেও শরীরে ঢুকছে মাত্রাতিরিক্ত লবণ। যে কারণে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি।

উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ হিসেবে অতিরিক্ত লবণ খাওয়াকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, অতিরিক্ত লবণ বন্ধ করতে পারলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমবে বলে ধারণা। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স-বিআইপি এর মিলনায়তনে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বিষয়ক এক সেমিনারে বিশেজ্ঞরা এসব কথা বলেন।

তারা বলেন, উচ্চ রক্তচাপ একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত সমস্যা। ৫০ শতাংশের বেশিই জানেন না তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। এর কারণে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়, যা সব সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে প্রতি ৫ জনে ১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে। দেশে এ বিষয়ে গণসচেতনতা এবং চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, অতিরিক্ত লবণ বন্ধ করতে পারলে ৫০ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে যেতো। একজন মানুষের প্রতিদিন ৫ গ্রাম লবণ প্রয়োজন অর্থাৎ এক চামচ। কিন্তু তার বেশি তারা খাচ্ছেন। জেনে খাচ্ছেন আবার না জেনেও খাচ্ছেন। ঘরে তিনি জেনে খাচ্ছেন। আর ঘরে-বাইরে যে খাবার খাচ্ছেন, তাতে কী পরিমাণ লবণ আছে, তা না জেনেই খাচ্ছেন। যেমন চিপসে ১০ গ্রাম লবণ থাকে। তা অনেকে জানেন না। শিঙারা-সমুচা বা হোটেল-রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন খাবার খাচ্ছেন, তাতে কী পরিমাণ লবণ রয়েছে তা তিনি না জেনেই খাচ্ছেন। ফলে শরীরে ঢুকছে মাত্রাতিরিক্ত লবণ।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২০ সালে বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি, যা ২০৩০ সাল নাগাদ গিয়ে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৮০ লাখ।

বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে-২০১৮ অনুযায়ী, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২১ শতাংশ (নারী ২৪ দশমিক ১ শতাংশ, পুরুষ ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ) উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং এদের মধ্যে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে মাত্র ১৪ শতাংশ, যা প্রতি ৭ জনে একজনেরও কম।

অন্যদিকে ‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭-১৮’ অনুযায়ী,  ২০১১ থেকে ২০১৭-১৮ সাল সময়ের মধ্যে ৩৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পুরুষের মধ্যে ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে এবং নারীর ক্ষেত্রে এ হার ৩২ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে এমন নারী এবং পুরুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার হার যথাক্রমে ৪৯ শতাংশ এবং ৪২ শতাংশ, যেখানে স্বাভাবিক ওজনের নারী এবং পুরুষের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ২৫ শতাংশ এবং ২৪ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অর্ধেক নারী (৫১ শতাংশ) এবং দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষই (৬৭ শতাংশ) জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই (৬৪ শতাংশ) কোনো ওষুধ সেবন করে না। এমনকি বাংলাদেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ। দেশে বছরে ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদ্‌রোগজনিত অসুস্থতায় মারা যায়, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫ লক্ষাধিক মানুষ অসংক্রামক রোগে মৃত্যুবরণ করেন, যার প্রায় অর্ধেক হৃদ্‌রোগজনিত।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, প্রথমে স্ক্রিনিং করতে হবে। স্ক্রিনিংয়ে আসার পর যাদের আছে, তাদের সেই হিসেবে ট্রিটমেন্ট দেওয়া। আর যাদের নেই তাদের যাতে না হয় সে হিসেবে কি কি লাইফস্টাইল চেঞ্জ করতে হবে সে বিষয়ে আমরা বলব। প্রথম কাজ হচ্ছে সবাইকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা।

এ সময় আরো বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ মুজিবুল হক, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শামীম জোয়াদ্দার, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত