বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত করবে কারা

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২২, ১০:৪১ পিএম

ঢাকাকে চারপাশ থেকে প্রাকৃতিকভাবে ঘিরে রাখা বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, বালু-টঙ্গী ও তুরাগ নদের দূষণ-দখল বন্ধে বছরের পর বছর ধরে নানামুখী কার্যক্রম নেওয়া হলেও দূষণ তো কমেইনি বরং ক্রমাগত বাড়ছে নদীগুলোর দূষণ। সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের নদীর মান পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুকনা মৌসুমে ঢাকার পাঁচ নদীর পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মান অনেক জায়গায় শূন্যে নেমে এসেছে। ২০২১ সালের মার্চে মিরপুর সেতুর কাছে বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে ‘ডিও’-এর মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ। অথচ আগের বছরের এপ্রিলেও সেখানে তা ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। আর তুরাগ নদের গাবতলী সেতুতে গত বছর ‘ডিও’ ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ পরের বছরের মার্চেই তা অর্ধেকে নেমে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এই গবেষণাই বলে দিচ্ছে, ঢাকার নদ-নদীর দূষণ কী ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে।

সরকারি দপ্তর, দেশি-বিদেশি বিশ^বিদ্যালয় ও নানা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে ঢাকার নদীগুলো দূষণের ক্ষেত্রে মোট চারটি বড় উৎসকে দায়ী করা হয়। সেগুলো হলো শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য, ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের কঠিন বর্জ্য এবং নৌযানের বর্জ্য। সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায় আছে এসব দূষণে এবং দূষণের তদারকিতে। কিন্তু এসব দপ্তরের মধ্যে কে কতটা দূষণ করছে, তা নিয়ে একে অন্যকে দোষ চাপানোর চেষ্টা আছে। যেমন পরিবেশ অধিদপ্তর বরাবরই পয়োবর্জ্যরে কারণে দূষণের কথা বলে আসছে। পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্র্তৃপক্ষ ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণের দায় পরিবেশ অধিদপ্তরের। অন্যদিকে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পদক্ষেপ, উচ্চ আদালতের রায় কোনোকিছুতেই থামছে না বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণ। তার ওপর দেখা যাচ্ছে, নদী দখলমুক্ত করে স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আবার নদীর ওপর উঠছে অবৈধ স্থাপনা। তেমনি নদী দূষণকারী কল-কারখানা সিলগালা করে দিয়ে যাওয়ার কদিনের মধ্যেই আবার সেসব কারখানায় পুরোদমে চলছে উৎপাদন আর সেইসঙ্গে চলছে নদীদূষণ।

শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘টাকায় খুলে যাচ্ছে সিলগালা কারখানা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ঢাকার কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ওয়াশিং ও ডাইং কারখানার নদীদূষণের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, কেরানীগঞ্জের এসব অবৈধ কারখানা বন্ধে রয়েছে হাইকোর্টের নির্দেশনা। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে অনেক কারখানা একাধিকবার সিলগালার পরেও অল্প দিনের বিরতিতে সেগুলো খোলে টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে। মালিক সমিতির তথ্যমতে, কেরানীগঞ্জে ওয়াশিং ও ডাইং কারখানা রয়েছে ৮৭টি। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা হবে শতাধিক। এসব কারখানার একটিরও নেই ইটিপি (বর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্ট)। গত বছরের শুরুতে বুড়িগঙ্গার পানি দূষণরোধে দুই তীরে ইটিপি ছাড়া স্থাপিত সব ওয়াশিং, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা বন্ধ এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। তবে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। হাইকোর্টের আদেশের পরে বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করতে কেরানীগঞ্জে নদীর তীর ঘেঁষে স্থাপিত অনেকগুলো ওয়াশিং ও ডাইং কারখানা পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার সিলগালা করে সম্পূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সিলগালার পর অল্প দিনের বিরতিতে পুনরায় চালু হয় কারখানাগুলো। প্রতিবার কারখানা সিলগালার সময় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সিলগালা কারখানা বারবার কীভাবে চালু হয়, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ কীভাবে পুনরায় চালু হয় এ নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

খেয়াল করা দরকার, বুড়িগঙ্গার দূষণ কমাতেই সরকার হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানাগুলো স্থানান্তর করেছে সাভারের নবনির্মিত ট্যানারিপল্লীতে। কিন্তু কার্যকর বর্জ্য পরিশোধনাগার পুরোপুরি চালু না হওয়ায় সেখান থেকেও দূষণ হচ্ছে। আবার ট্যানারি স্থানান্তর হলেও কেরানীগঞ্জের ওয়াশিং ও ডাইং কারখানাগুলোর বিষাক্ত বর্জ্যে বাড়ছে বুড়িগঙ্গা দূষণ। এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, ওয়াশ মিল মালিকরা উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত টাকা-পয়সা দিয়ে অবৈধভাবে কারখানাগুলো চালাচ্ছে। টাকা-পয়সা দিতে যখন সামান্য ঝায়ঝামেলা হয়, তখনই উপজেলা থেকে আর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কারখানাগুলো লোক দেখানো বন্ধ করে দিয়ে যায়। আবার টাকা তাদের পকেটে গেলেই সব অবৈধ বৈধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথা যুক্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আবার সরেজমিনে পরিদর্শনে যেমন এই বাস্তবতা দেখা গেছে তেমনি দেশ রূপান্তরের কাছে এমন বেশ কয়েকটি কারখানার মালিক ও ম্যানেজাররা স্বীকারও করেছেন যে, তারা টাকা-পয়সা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করেই কাগজপত্রে ‘সিলগালা’ হয়ে যাওয়া এসব কারখানার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, সিলগালা করে দেওয়ার পরও পরিবেশ অধিদপ্তর আর উপজেলা প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে কীভাবে বারবার কারখানাগুলো চালু হয়? এই যদি হয় বাস্তবতা তাহলে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার নদীগুলোর দূষণ বন্ধ করবে কারা?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত