রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদন্ড এবং দুজনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড সর্বোচ্চ আদালতে বহাল রয়েছে। খালাস চেয়ে আসামিদের আপিল ও যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্তদের সাজা বাড়াতে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল খারিজ করে গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগ এ রায় দেয়।
রায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ড. মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও ড. তাহেরের বাসার তত্ত্বাবধানকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম। যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্তরা হলেন নাজমুল আলম ও আব্দুস সালাম। বিচারিক আদালতের রায়ে এ চারজনের মৃত্যুদন্ডের রায় হয়। পরে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও আপিলের শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে এবং নাজমুল ও আব্দুস সালামের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় হাইকোর্ট। দন্ড থেকে খালাস চেয়ে আসামিরা আপিল করেন। পাশাপাশি যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্তদের সাজা বাড়াতে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে গত ১৬ মার্চ রায়ের জন্য ৫ এপ্রিল (গতকাল) ধার্য করে আদালত।
আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ মামলাটি দেশের ইতিহাসে একটি জঘন্যতম হত্যাকান্ডের মামলা। শুধু পদোন্নতির জন্য একজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা ঘৃণ্য কাজ। আজকের বিচারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলো।’ রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এটি রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) চেয়ে আবেদন করতে পারবেন আসামিরা। আপিল বিভাগ আবেদন খারিজ করলে রাষ্ট্রপতির কাছে মার্জনা চেয়ে প্রাণভিক্ষার আবেদনের সুযোগ থাকবে। প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হয়ে গেলে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেবে কারা কর্তৃপক্ষ।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক তাহেরের স্ত্রী সুলতানা আহমেদ, ছেলে সানজিদ আলভি আহমেদ এবং মেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে শেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা একজন দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক ছিলেন। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশ একজন মেধাবী শিক্ষককে হারিয়েছে। আজকের রায়ে আমরা স্বস্তি পেয়েছি। এখন এই রায় আমরা দ্রুত কার্যকর দেখতে চাই।’ আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম শাহজাহান রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে আমরা রিভিউ আবেদন করব। সংবিধান ও আইন আসামিকে যে সুযোগ দিয়েছে সেটি আমরা করব।’
২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ হন অধ্যাপক তাহের। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারের একটি ম্যানহোল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায়, তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ সেখানে ফেলে রাখা হয়। এ ঘটনায় অধ্যাপক তাহেরের ছেলে সানজিদ আলভি আহমেদ রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানায় অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের মার্চে ৬ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেনঅধ্যাপক তাহেরের একসময়ের ছাত্র ও পরে বিভাগীয় সহকর্মী মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের তখনকার সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, তাহেরের বাসভবনের তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর, জাহাঙ্গীরের ভাই আবদুস সালাম, তাদের বাবা আজিমুদ্দীন এবং জাহাঙ্গীরের স্ত্রীর ভাই নাজমুল আলম।
তদন্তে বেরিয়ে আসে অধ্যাপক মিয়া মহিউদ্দিন পদোন্নতি পেতে বিভাগে আবেদন করেছিলেন। এ পদোন্নতি পেতে তিনি প্রতারণার আশ্রয় নেন। বিষয়টি অধ্যাপক তাহের জানতে পারেন এবং পরে এটি তদন্তে প্রমাণিত হয়। যে কারণে মহিউদ্দিনের পদোন্নতি আটকে যায়। এর জেরে প্রতিহিংসাবশত অধ্যাপক তাহেরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন মহিউদ্দিন।
২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর একটি আদালত রায়ে ৪ জনকে ফাঁসির আদেশ দেয়। রায়ে সালেহী ও আজিমুদ্দীনকে খালাস দেওয়া হয়।
