দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ক্রেতাদের অসন্তোষ রয়েই গেছে। এখনো বাজার পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আসেনি বলে মনে করছেন তারা। যদিও চলতি রমজান মাসকে কেন্দ্র করে বেড়ে যাওয়া বেগুন, শসা ও লেবুসহ অধিকাংশ সবজির দাম কিছুটা কমেছে। স্থিতিশীল রয়েছে চালের বাজার। তবে সপ্তাহ ব্যবধানে বেড়েছে সব ধরনের মাছ ও মাংসের দাম। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দুদিন আগে প্রতি হালি ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া লেবু গতকাল বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকায়। আর মাঝারি আকারের লেবু প্রতি হালি বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকায়। যা দুদিন আগেও বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে লেবুর সরবরাহ বেশি তাই দাম কিছুটা কমেছে।
রাজধানীর বৃহত্তম কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজারের লেবুর খুচরা বিক্রেতা হাফিজুল জানান, গত কয়েক দিন ধরে বাজারে অভিযান চালাচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। বেশ কয়েকজন পাইকারকে জরিমানাও করা হয়েছে। ফলে পাইকাররা দাম কমিয়েছে। একইভাবে কমেছে বেগুনের দামও। দ্বিতীয় ও তৃতীয় রোজায় প্রতি কেজি ১২০ টাকায় বিক্রি হওয়া লম্বা বেগুন এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকায়। আর গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা কেজিতে। কারওয়ান বাজারে বেগুনের পাইকারি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রতি মণ বেগুন কেনা পড়ে ২৫০০-২৬০০ টাকা। তার সঙ্গে পরিবহন খরচ রয়েছে। আমাদের খুব সীমিত লাভ থাকে। কিন্তু যারা খুচরা বিক্রি করছেন তারা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। যার ফলে আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’
কারওয়ান বাজারে সবজি কিনতে আসা আশরাফ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত কয়েক দিন অতিরিক্ত দামের কারণে লেবু-বেগুন কেনা সম্ভব হয়নি। আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) দাম তুলনামূলক কম থাকায় কিনেছি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজারগুলোতে একটি সেল থাকলে মনিটরিং ভালো হতো। ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা করতে পারত না।’
লেবু-বেগুনের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে ৫-১০ টাকা কমেছে। রমজানের আগেই বেড়ে যাওয়া শসার দাম কেজিতে ১০ টাকা কমেছে। প্রতি কেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, যা প্রথম রোজার দিন বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকায়। দাম কমেছে টোমেটো ও লাউয়ের। প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকা, যা প্রথম ও দ্বিতীয় রোজায় বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকায়।
এ ছাড়া মাঝারি আকারের লাউ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা। ছোট আকারের মিষ্টি কুমড়া ৩০-৩৫ টাকা। পটোল প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকা, ঢেঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি ৭০ টাকা। এ ছাড়া ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ টাকা এবং করলা কেজি প্রতি ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে সবজির দাম কমলেও সপ্তাহ ব্যবধানে বেড়েছে ব্রয়লারসহ সব ধরনের মুরগির মাংসের দাম। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়, গত সপ্তাহে যা বিক্রি হয়েছে ১৬০-১৬৫ টাকা দরে। সোনালি মুরগি কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা কেজি দরে। লেয়ার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়।
আগের মতোই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস। ভোক্তা অধিদপ্তরের নজরদারির কারণে বড় বাজারগুলোতে গরুর মাংস ৬৫০ টাকায় বিক্রি হলেও মহল্লায় বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা কেজি দরে। হাড়ছাড়া গরুর মাংস সাড়ে সাতশ থেকে আটশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।। সরকারি হিসাবেই গত এক মাসে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ৫ শতাংশের বেশি।
গবেষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জনপ্রতি মাংসের চাহিদা ১২০ গ্রাম। সে হিসেবে বছরে মাংসের চাহিদা ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার টন। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন ছিল ৮৫ লাখ ৪১ হাজার টন, যা চাহিদার চেয়েও বেশি।
সপ্তাহ ব্যবধানে বেড়েছে সব ধরনের মাছের দামও। কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি পাঙাশ ১৫০, বড় রুই ৩৫০-৩৮০, ছোট থেকে মাঝারি রুই ২৫০-৩০০, কাতলা ২৮০-৩০০ এবং পাবদা ৪৫০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় ইলিশ প্রতি কেজি ১৩০০-১৪০০, শিং ৪৫০-৫০০ এবং ছোট মাছ কেজিপ্রতি ৩৫০-৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নতুন করে এই সপ্তাহে দাম না বাড়লেও একটু স্থিতিশীল আছে চালের বাজার, আগের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৬৫-৭০, নাজিরশাইল ৭০-৭৫, ২৮-২৯ জাতের পাইজাম এবং মোটা চাল প্রতি কেজি ৪৮-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশি মসুর ডাল ১৩০ ও বড় মসুর ডাল কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা আটা ৩৮, প্যাকেটজাত ৪৫ এবং খোলা ময়দা ৫০, প্যাকেটজাত ৬৫ টাকা। এ ছাড়া খোলা চিনি ৮০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম : রমজানের পঞ্চম দিনে এসে কমতে শুরু করেছে বেগুন ও লেবুর দাম। প্রকারভেদে বেগুনের দাম কেজিতে কমেছে অন্তত ১০-১৫ এবং আকারভেদে লেবুর দাম হালিতে কমেছে ১০-১৫ টাকা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, ২ নম্বর গেট কাঁচাবাজার, কাজির দেউরি বাজার ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বহদ্দারহাট, চকবাজার, আন্দরকিল্লা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লম্বা বেগুন প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়। এক দিন আগেও যার দাম ছিল ৭৫-৯০ টাকা। আর গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৬০-৭০ টাকা।
অন্যদিকে মাঝারি সাইজের লেবু হালিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এতদিন এ আকারের লেবু হালিপ্রতি বিক্রি হতো ৩০-৪৫ টাকা। একটু বড় আকারের লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫৫ টাকায়। বুধবারও এ সাইজের লেবু বিক্রি হয়েছে ৬০-৭০ টাকায়।
অন্যদিকে গরুর মাংস, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দামও কিছুটা কমেছে। বর্তমানে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০০-৭০০ টাকায়। আর খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭৫০-৮৫০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি গত সপ্তাহ থেকে ৫-১০ টাকা কমে ১৭৫-১৮০, পাকিস্তানি কক বা সোনালি মুরগি কেজিপ্রতি ২৮০-৩০০, পাকিস্তানি লেয়ার কেজিপ্রতি ২৫০-২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লম্বা বেগুন বর্তমানে ৫-১০ টাকা কমে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়। আর গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়। শসার দাম কিছুটা কমে আকারভেদে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি সাইজের লেবু হালিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বড় আকারের লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫৫ টাকায়।
এদিকে এক লিটার ওজনের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। খোলা সয়াবিন তেল গত সপ্তাহের তুলনায় একটু কমে ১৭৫-১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও আগের মতোই স্বর্ণা চাল (মোটা) ৪৬-৪৮, বিআর২৯ চাল ৫৮, বি২৮ চাল ৫৮-৬০, মিনিকেট ৬৮ এবং নাজিরশাইল ৭৫ টাকায় কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজি ২৫-৩৫ টাকা দরে, ফুলকপি ৫০-৫৫, বাঁধাকপি ৪০-৫০, মুলা ৪০-৫৫, শিম ৭০-৮০, টমেটো ৪০-৫০, তিতকরলা ৬০-৬৫, বরবটি ৭০-৭৫, ঝিঙা ৫০-৬০, ঢেঁড়স ৬৫-৭৫, পটোল ৬০-৭০, কাঁকরোল ৫৫-৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, রূপচাঁদা মাছ আকারভেদে বিক্রি হচ্ছে কেজি ৬০০-৮০০, চিংড়ি কেজি ৫৫০-৮০০, রুই কেজি ২২০-২৮০, পোপা ৩০০-৩৫০, সুরমা ২৫০-৩০০, ছোট কোরাল ৩৫০-৪০০ এবং বড় কোরাল ৭০০-৮০০, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
