জনস্বাস্থ্য ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন এখন বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলায় মুখ্য ভূমিকা পালনকারী রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটির পাশাপাশি চলতি মার্চ থেকে বিশ্বব্যাংকের ‘রিস্ক কমিউনিকেশন’ উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। চাকরিজীবনে তিনি আইইডিসিআরের চিকিৎসা সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউএস-সিডিসির উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়া, ডায়রিয়ার কারণ, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়সহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ডা. মুশতাক হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন
দেশ রূপান্তর : প্রতি বছরই দেশে ডায়রিয়া-কলেরায় বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) সারা দেশে অন্ততপক্ষে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬১১ জনের রোগটিতে আক্রান্তের তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে তাদের হাসপাতালে আসা রোগীদের ২৩ শতাংশ তীব্র ডায়রিয়া বা কলেরায় আক্রান্ত। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে গত ৬০ বছরের ইতিহাসে এত রোগীর চাপ সামলাতে হয়নি তাদের। এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
মুশতাক হোসেন : ডায়রিয়ার এই ব্যাপক বিস্তার অবশ্যই পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি বা জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি। একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশে তীব্র ডায়রিয়ায় বহু মানুষ মারা যেত। কিন্তু বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাই ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ওরস্যালাইন আবিষ্কার করেছেন। সারা পৃথিবীই এই আবিষ্কারের সুফল পাচ্ছে। আর দেশে ওআরএস বা খাবার স্যালাইন সুলভ হওয়ায় এবং ডায়রিয়ার চিকিৎসায় উন্নতির কারণে মৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে। আমরা এখন এই রোগের কারণটা জানি, চিকিৎসাটাও জানি। যেখানে আমরা অল্প খরচেই ডায়রিয়ার কারণ বা উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি সেখানে এরকম ব্যর্থতা দেশের আর্থসামাজিক সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। তাই এটা দেশের জন্য লজ্জাজনকও। এটা খেয়াল করা দরকার সাম্প্রতিক কালেও আমরা এই রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছি। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে মারাত্মক ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রেও সফল হয়েছে। বিদেশিরাও এখান থেকে শিখছে। তারপরও এখনো দেশে প্রতি বছর ডায়রিয়ার কারণে এমন জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া দুঃখজনক।
দেশ রূপান্তর : প্রতি বছরই একটা নির্দিষ্ট সময়ে মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। বলা হচ্ছে এবার মৌসুমের আগেই ঢাকাসহ সারা দেশে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। গরমের দিন শুরু হতে না হতেই ডায়রিয়া হয় কেন? জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে এর সম্পর্কটা কী?
মুশতাক হোসেন : গরমকালে বর্ষা শুরু হওয়ার আগে আগে আর বর্ষা শেষে প্রতি বছরই ডায়রিয়া হয়। এটাই ডায়রিয়ার মৌসুম। এসময় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ডায়রিয়ার ব্যাকটেরিয়াগুলো দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। আরেকটা কারণ হলো এই মৌসুমে দেশে পানির সংকট দেখা দেয়। ডায়রিয়া পানিবাহিত রোগ। কিন্তু সুপেয় পানির, নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার স্থায়ী সমাধান আমরা করতে পারছি না। একদিকে নিরাপদ পানি নেই আরেকদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষ মলমূত্র ত্যাগে অনিরাপদ বা স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাওয়ায় দ্রুত ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অর্থাৎ এসব ব্যবস্থাপনার জন্য আর্থসামাজিক কাঠামো উন্নয়নে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না। এসব কারণেই প্রতি বছর ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : পানিবাহিত এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সুপেয় পানি নিশ্চিত করা, স্যানিটেশন বা নিরাপদ পয়ঃব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব না দেওয়াকে দায়ী করছেন আপনি। অথচ আমরা জানি, প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মিঠাপানির প্রাপ্যতার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীতে এক নম্বর। সারফেস ওয়াটার আর বৃষ্টির পানি মিলিয়ে হিসাব করলেও বাংলাদেশ পৃথিবীতে পানির প্রাপ্যতায় শীর্ষস্থানীয় দেশ। তাহলে আমরা এখনো দেশের মানুষের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে পারছি না কেন? এটা কি আর্থসামাজিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন?
মুশতাক হোসেন : আমাদের আর্থসামাজিক সক্ষমতা তো আছেই! এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছি কি না। আপনি সুন্দরভাবে বলেছেন যে সুপেয় পানির প্রাপ্যতায় আমরা বিশে^র শীর্ষস্থানীয় দেশ। তবুও এই সংকট দূর না হওয়ার কারণ দেশের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান প্রকট অর্থনৈতিক বৈষম্য।
দেখুন, এখন ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব কথা বলা হচ্ছে সেখানে সমস্যার গভীরে কেউ যেতে চাইছে না। বিষয়টা খোলাসা করে কেউ বলছেনও না। আগে দেখতে হবে ডায়রিয়ার কারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। সচ্ছল আর বিত্তবানরা কিন্তু এই সমস্যায় ভুগছেন না। তাদের কেউ আক্রান্ত হলেও আর্থিক সক্ষমতার কারণেই দ্রুত সেরেও উঠছেন। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের এমন সংকটের শিকার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব মানুষ। শহর আর গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষ।
আমরা বলছি পানি ফুটিয়ে খান। কিন্তু তাদের ঘরে তো ভাত ফুটিয়ে খাওয়ার মতো জ¦ালানি নেই, তারা পানি ফুটিয়ে খাবেন কীভাবে? তাদের বেশিরভাগই তো নদীর পানি, খালের পানি কিংবা সরবরাহ লাইনের অনিয়মিত সংযোগ থেকে পানি সংগ্রহ করে খাচ্ছেন। সরবরাহ লাইন ফুটো করে এমন অনিয়মিত সংযোগ থেকে পানি সংগ্রহের যারা ব্যবস্থা করে দিয়ে এসব গরিব মানুষের কাছ থেকে টোল আদায় করা হয়। এখানে আরেকটা মুশকিল হলো, এসব সংযোগের কারণে সরবরাহ লাইনের মধ্যে স্যুয়ারেজের বর্জ্য থেকে শুরু করে নানারকম দূষণ ও রোগজীবাণুও ঢুকে পড়ে পাইপলাইনে। যা আরও বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
দেশ রূপান্তর : আপনি বলছিলেন পরিস্থিতি মোকাবিলায় যেসব পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সেটা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। বিষয়টা আরেকটু বিশদভাবে জানতে চাই।
মুশতাক হোসেন : একটা দিক তো হলো ডায়রিয়া আক্রান্ত কিংবা ডায়রিয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষরা যেসব এলাকায় যে পরিবেশে থাকেন সেখানে নিরাপদ বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে না পারা, নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারা। আবার বলা হচ্ছে আপনারা খোলা জায়গার খাবার খাবেন না। এখন আমি আপনি হয়তো সেসব খাবার না খেয়ে দামি দোকানের খাবার খেতে পারি। কিন্তু শ্রমজীবী ও ভ্রাম্যমাণ মানুষরা যারা দিন-রাতের বেশিরভাগ সময় রাস্তাঘাটে শ্রম দিয়ে কাটান, তারা কমদামে নিরাপদ খাবার কোথায় পাবে? ধরুন কেউ রাস্তার পাশে গরম শিঙাড়া খাচ্ছে। তেলেভাজা এমন গরম খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি কম। কিন্তু ওই খাবারটাও পরিবেশন করা হচ্ছে ময়লা-নোংরা প্লেটে বা পুরনো কাগজে। খাবার ভালো হলেও এভাবে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। এখন এ ধরনের দোকানপাটে যাতে রানিং-ওয়াটারে থালা-বাসন ধোয়ার, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ধরনের কিছু উদ্যোগ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা করেছেও। এখন স্বাস্থ্য দপ্তর, সিটি করপোরেশন এরা এমন উদ্যোগগুলো গ্রহণ করে সেটা বহু জায়গায় অনুসরণ করার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু আমরা দেশে এ ধরনের উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না।
দেশ রূপান্তর : আপনি গরিব মানুষ বা নিম্নআয়ের মানুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বলছিলেন। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের করা এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু গরিব মানুষ নয়, বরং বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ অপরিচ্ছন্ন এবং অনিরাপদ উৎসের পানি পান করছে। পানির নিরাপদ উৎসগুলোর ৪১ শতাংশই ক্ষতিকারক ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াযুক্ত। পাইপের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা পানিতে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮২ শতাংশ। এছাড়া ১৩ শতাংশে রয়েছে আর্সেনিক। এমনকি রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহর-বন্দরের পাইপলাইনে সরবরাহ করা পানিও পানের জন্য নিরাপদ নয়। একদিকে, দেশের নদ-নদীতে মারাত্মক দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে আমরা ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নিঃশেষ করছি। দেশের পানি ব্যবহারের এমন বাস্তবতা জনস্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব রাখছে বলে মনে করেন?
মুশতাক হোসেন : জনস্বাস্থ্যের বিবেচনায় এটা অবশ্যই বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। আমি বলছি, উচ্চআয়ের মানুষেরা পাইপলাইনে সরবরাহের যে পানি পান করছে সেখানেও কিন্তু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যাচ্ছে। এখন সরবরাহ লাইনে কেন এবং কীভাবে এসব জীবাণু ঢুকছে সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব কার। আমরা বলছি, পানি সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাদেরই পারস্পরিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে এটা দেখতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে খালি পানি দিলেই হবে না, ওয়াসার মতো প্রতিষ্ঠানেরই দায়িত্ব তাদের পাইপলাইন যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, দেখভাল করা। আবার স্বাস্থ্য দপ্তর এবং স্থানীয় সরকারেরও দায়িত্ব আছে বিভিন্ন এলাকায় মানুষের জন্য নিরাপদ পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করার। এসব সংস্থাকে তাই মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : এখনকার পরিস্থিতিকে আপনি পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি বা জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা বলছিলেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন কী কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
মুশতাক হোসেন : প্রথমত, যেসব এলাকা থেকে ডায়রিয়ার রোগী বেশি আসছে সেখানকার পানি পরীক্ষা করে স্বাস্থ্য বিভাগ সমস্যাটা নির্ণয় করবে ওয়াসা বা পানি সরবরাহকারী এবং স্থানীয় সরকারকে বিষয়টা অবহিত করবে। পাশাপাশি এসব এলাকায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে হবে। সেটা ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে হোক বা অন্য কোনোভাবে। দ্বিতীয়ত, যেসব স্থানে মানুষ খোলা জায়গায় খাবার-দাবার খায় সেসব স্থানে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে পরিষ্কার কাগজে খাবার দেওয়া এবং রানিং-ওয়াটারে থালা-বাসন ধোয়ার, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, ঘনবসতি এলাকাগুলোতে মানুষ কি খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করছে নাকি ক্লোজড ল্যাট্রিন ব্যবহার করছে সেসব দেখতে হবে এবং নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, শিশু থেকে শুরু করে সবার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসচেতনতা নিশ্চিত করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এভাবে নিরাপদ পানি, নিরাপদ খাবার, নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করতে পারলেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
