‘আমি গোল আলু। আমি বিক্রমপুরের গোল আলু, অঙ্ক, জেনারেল ম্যাথ, হায়ার ম্যাথ, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজিসহ সব সাবজেক্ট পড়াই’ ধর্ম অবমাননার মামলায় ১৯ দিন কারাগারে থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল। তার মুক্তিতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো উচ্ছ্বসিত মুন্সীগঞ্জবাসী। তারা বলছেন, হৃদয় মণ্ডল কখনো অন্যায় মেনে নেননি। সবসময় প্রতিবাদ করেছেন। তবে তার প্রতিবাদ সবসময়ই হয়েছে যুক্তি মেনে।
গতকাল সোমবার হৃদয় মণ্ডলের বাল্যবন্ধু তপন সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হৃদয় সবসময় যুক্তিবাদী আর প্রতিবাদী। ছোটবেলা থেকেই অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দিত না। তার সামনে কোনো অন্যায় ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ করতে দেখেছি তাকে।’
তপন সরকার জানান, বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হৃদয় মন্ডল ও তিনি প্রাইমারি স্কুল থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। জেলার সিরাজদীখান উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের কালাগাইয়ের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের পড়াশোনা শেষ করেন তারা। ১৯৮২ সালে একই উপজেলার কুচিয়ামোড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে শ্রীনগর কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি ও ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে গণিত বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন। ২১ বছর ধরে তিনি বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষিকা ইতি রানী সাহা বলেন, ‘স্যার (হৃদয় ম-ল) খুব ভালো মানুষ। ২০ বছরের অধিক সময় ধরে তিনি শিক্ষকতা করছেন। যেখানে অনিয়ম চোখে পড়ত, সেখানেই প্রতিবাদ করতে দেখেছি তাকে। শিক্ষক হিসেবেও ভালো ছিলেন, ভালো পড়াতেন।’
ইতি রানী বলেন, তিনি কখনো আমাদের কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন এমন চোখে পড়েনি।’ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র জয় ঘোষ বলেন, আগে স্যার মেয়েদের সেকশনে পড়াতেন। এখন কয়েক বছর ধরে ছেলেদের মাধ্যমিক স্তরে পড়াচ্ছেন। আমরা কখনো স্যারের খারাপ দেখিনি, তবে প্রতিবাদী ছিলেন তিনি।
গত রবিবার কারাগার থেকে মুক্তির পর নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের হৃদয় মন্ডল বলেন, ‘আপনাদের আপ্রাণ চেষ্টায় আমি মুক্ত হয়েছি। মিডিয়া কর্মীদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।’
যারা আপনার বিরুদ্ধে মিছিল করেছে, মামলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওরা তো শিশু, ওদের কথা বাদই দিলাম। আর যারা করছে ওরা হয়তো না জেনেই করছে। খোদার কাছে প্রার্থনা করি, ওরা সুন্দর ও স্বাভাবিক মানুষ হোক। আমিও সবার মধ্যে ফিরে আসব এটাই আমার প্রত্যাশা। আমাকে যেন সবাই আপন করে নেয়, আমিও যাতে সবাইকে আপন করে নিতে পারি। কোনো কোলাহল যাতে না থাকে।’
শ্রেণিকক্ষে ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে গত ২২ মার্চ শিক্ষক হৃদয় ম-লকে আটক করে পুলিশ। ওইদিন রাতে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ তার বিরুদ্ধে সদর থানায় ধর্ম অবমাননার মামলা করেন। পরদিন আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠায়। এরপর ৪ এপ্রিল জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিন আবেদন করা হয়। পরে ১০ এপ্রিল তার জামিন হয়।
