দেশে চলমান করোনা মহামারীর সময় করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের ২২ দশমিক ২ শতাংশ নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬১ শতাংশ রোগী দেরিতে সেবা পেয়েছেন, ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ রোগী করোনা ইউনিটে স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দুর্ব্যবহার ও অসহযোগিতার শিকার হয়েছেন এবং ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ রোগীকে সেবা সম্পর্কিত তথ্য দেওয়া হয়নি। এছাড়াও নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও দালালদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছেন ১২ দশমিক ২ শতাংশ রোগী। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক জরিপ চালিয়ে এ চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ‘করোনাভাইরাস সংকট মোকাবেলায় সুশাসন : অন্তর্ভুক্তি ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে টিকা কার্যক্রমে অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি পেয়েছে টিআইবি। সরকার টিকার পেছনে ব্যয়ের যে হিসাব দিয়েছে, তার সঙ্গে টিআইবির হিসাবে ২৪ হাজার কোটি টাকার ফারাক দেখা গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, জুলাই ২০২১-এ গণমাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে টিকাপ্রতি ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীকালে গত ১০ মার্চ গণমাধ্যমে টিকা কার্যক্রমে মোট ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন। অথচ গবেষণায় দেখা যায়, টিকা ক্রয় ও টিকা কার্যক্রমের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১২ হাজার ৯৯৩ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, যা স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রদত্ত হিসাবের অর্ধেকেরও কম। আবার শুধু একটি দেশের ক্ষেত্রে টিকার ক্রয়মূল্য প্রকাশ না করার শর্ত থাকলেও অন্যান্য উৎস থেকে কেনা টিকার ব্যয় এবং টিকা কার্যক্রমে কোন কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি।
টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরামের তত্ত্বাবধানে প্রণীত গবেষণাটি উপস্থাপন করেন একই বিভাগের রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওসার আহমেদ।
সংবাদ সম্মেলনে করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় নমুনা পরীক্ষা, চিকিৎসা সেবা, টিকা ক্রয় ও প্রদান এবং প্রণোদনা বিতরণে উদ্বেগজনক বৈষম্য ও স্বচ্ছতার অভাব উল্লেখ করে সেগুলো নিরসনে ১০ দফা সুপারিশও করে সংস্থাটি।
গবেষণায় বলা হয়, ২৬ দশমিক ১ শতাংশ সেবাগ্রহীতা কভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষা করাতে গিয়ে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং ১৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতা অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে নমুনা প্রদানের সময় পরীক্ষাগারগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি না মানা, নমুনা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ফিরে আসা, পরীক্ষাগারে কর্মীদের দুর্ব্যবহার, বাসা থেকে নমুনা দিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, নমুনা দিতে একাধিকবার কেন্দ্রে যাওয়া, ভুল প্রতিবেদন দেওয়ার কারণে পুনরায় পরীক্ষা করতে বাধ্য হওয়া ইত্যাদি অভিযোগের কথা জানা গেছে।
এমনকি নমুনা পরীক্ষার পর রিপোর্ট পেতে গড়ে আড়াই দিন (সর্বোচ্চ ৯ দিন) এবং পরীক্ষাগারে নমুনা দিতে গিয়ে গড়ে ৩ ঘণ্টা (সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা) অপেক্ষা করতে হয়েছে বলেও জরিপে উঠে এসেছে। এছাড়া পরীক্ষাগারের স্বল্পতা, অতিরিক্ত ভিড়, নমুনা প্রদানে জটিলতা, অতিরিক্ত খরচ ইত্যাদি কারণে নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে জনগণকে বিশেষত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে নিরুৎসাহিত করেছে।
অবশ্য গবেষণায় করোনা মোকাবিলায় সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও পেয়েছে টিআইবি। এসব ইতিবাচক পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হলো ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞায় সেরাম ইনস্টিটিউটের একক উৎস থেকে টিকা রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর সরকারের প্রচেষ্টায় দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে চীন থেকে টিকা ক্রয়, কোভ্যাক্স উদ্যোগ থেকে কস্ট শেয়ারিং বা বিনামূল্যে টিকা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাপ্ত অনুদান দিয়ে জুলাই ২০২১ থেকে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করা। এ সময় সরকারের তৎপরতায় ৩১ মার্চ ২০২২ পর্যন্ত প্রায় ২৯ কোটি ৬৪ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত টিকা থেকে ৩১ মার্চ ২০২২ পর্যন্ত প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ মানুষকে প্রথম ডোজ (মোট জনসংখ্যার ৭৪.৯৬ শতাংশ) এবং ১১ কোটি ২৪ লাখ মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ (৬৬.০ শতাংশ) টিকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৯৫ লাখ মানুষকে বুস্টার ডোজ প্রদান করা হয়। বিভিন্ন পেশা-জনগোষ্ঠীর মানুষকে টিকার আওতায় আনতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, কমিউনিটি ক্লিনিক ইত্যাদি থেকে টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষার্থী, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, বস্তিবাসী ও ভাসমান জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, যারা সরকারি পরীক্ষাগারে নমুনা দিয়েছে তাদের ১৪ দশমিক ৯ শতাংশকে নির্ধারিত ফি অপেক্ষা গড়ে ১১৬ টাকা, যারা বাড়ি থেকে নমুনা দিয়েছে তাদের গড়ে ৬৪২ এবং বেসরকারি হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে গড়ে ৪ হাজার ৪২৫ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে। অনেক সময়ই বেসরকারি পরীক্ষাগারে কভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষার পাশাপাশি অন্য পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়েছে। যথাসময়ে বা দ্রুত প্রতিবেদন পেতে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে ১৩৩ এবং পরীক্ষাগারে ভিড় এড়িয়ে দ্রুত নমুনা দিতে বা আগে সিরিয়াল পেতে ৬ দশমিক ১ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে গড়ে ৬৬ টাকা নিয়মবহির্ভূত দিতে হয়েছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে প্রবাসীদের বিদেশ যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় নেগেটিভ সার্টিফিকেট পেতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে বিদেশ থেকে প্রত্যাগতদের গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিতে হয়েছে।
গবেষণায় কভিড-১৯ চিকিৎসা সেবায় সক্ষমতার ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, নিজ জেলায় আইসিইউ সুবিধা না থাকায় কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ সেবাগ্রহীতা অন্য জেলা থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সেবাগ্রহীতা হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় বাড়িতে চিকিৎসা গ্রহণে বাধ্য হয়েছেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর শয্যা পেতে সেবাগ্রহীতাদের গড়ে সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সেবাগ্রহীতাদের ১৪ দশমিক ১ শতাংশ অনিয়মিতভাবে চিকিৎসকের সেবা পেয়েছেন, ১৪ দশমিক ৯ শতাংশের অক্সিজেন পেতে দেরি হয়েছে, ১ দশমিক ৭ শতাংশের প্রয়োজন থাকলেও হাসপাতালে একবারও অক্সিজেন পাননি, ১৫ শতাংশ তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে ভেন্টিলেশন সুবিধা পাননি, ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ যথাসময়ে আইসিইউ সেবা পাননি এবং ৯ শতাংশ হাসপাতালে চিকিৎসাকালীন একবারও আইসিইউ সেবা পাননি বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
জরিপে সেবাগ্রহীতাদের তথ্যানুযায়ী, যথাসময়ে সেবা না পাওয়ায় হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়া ব্যক্তিদের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং ১১ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতাল থেকে সেবাগ্রহণকারীদের ২২ দশমিক ২ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে ১২ দশমিক ২ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে ৪০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়েছে বলেও জরিপে উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কভিড-১৯ সংক্রমণের দুই বছরে পরীক্ষাগার ও আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলেও তা অল্প কিছু জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখনো ৩৪টি জেলায় আরটি-পিসিআর পরীক্ষার সুবিধা নেই। ২০২০ সালের জুন মাসে সরকার থেকে সব জেলা হাসপাতালে ১০টি করে আইসিইউ শয্যা স্থাপনের ঘোষণা করা হলেও এখনো ৩১টি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়নি। অন্যদিকে জুন ২০২১-পরবর্তী সময়ে আইসিইউ শয্যাসংখ্যা ৯৪টি বৃদ্ধি পেলেও অধিকাংশই শহরকেন্দ্রিক এবং বেসরকারি। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকার কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের আওতায় জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যা, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম, নমুনা পরীক্ষাগার স্থাপন, টিকা ও বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয় করার কথা থাকলেও প্রায় দুই বছর পর তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকি কভিড মোকাবিলায় ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অনুদানের মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
গবেষণায় করোনার টিকাদান কর্মসূচির অব্যবস্থাপনার তথ্যও পাওয়া গেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, টিকাগ্রহণের সময় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ টিকাগ্রহীতা টিকাকেন্দ্রে অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে টিকাকেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত না করা (৮১.৩%), টিকাকেন্দ্রে দীর্ঘ সিরিয়াল (৫৮.২%), অপেক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা (৪৩.৩%), ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা না থাকা (৩১.৬%), বয়স্ক বা প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ না থাকা (২৯.৯%), টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ কক্ষ না থাকা (২৪.১%), নোংরা পরিবেশ (১৫.১%), টিকাকর্মীদের দক্ষতায় ঘাটতি (১৪.২%), সব বুথ খোলা না থাকা (১০.৪%) ইত্যাদি।
অন্যদিকে ২ শতাংশ টিকাগ্রহীতা অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হন যার মধ্যে সময়ক্ষেপণ, টিকাকেন্দ্রে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ও সরকারি কর্মকর্তাদের সুবিধা দেওয়া, দুর্ব্যবহার এবং কিছু কেন্দ্রে টিকা থাকা সত্ত্বেও টিকাগ্রহীতাদের ফিরিয়ে দেওয়া অন্যতম বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে যথাসময়ে বা দ্রুত টিকা পেতে ১০ দশমিক ১ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে গড়ে ৬৯ টাকা ঘুষ হিসেবে দিতে হয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। এছাড়া প্রবাসীরা টিকার নিবন্ধনের জন্য বিএমইটি নম্বর পেতে ১৫০-২০০ টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে টিকা না নিয়েও টাকার বিনিময়ে প্রবাসীরা টিকা সনদ সংগ্রহ করেছেন। এমনকি টাকার বিনিময়ে করা একটি গ্রুপ ফেইসবুক পেজে প্রবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী টিকা বা টিকার সার্টিফিকেট প্রদানের বিষয়ে প্রচার করতে দেখা গেছে।
গবেষণায় টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং প্রস্তাবিত কৌশল বাস্তবায়নে ঘাটতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে সরকারের জাতীয় টিকা পরিকল্পনায় গৃহীত অগ্রাধিকার তালিকার ধাপ অনুযায়ী অধিক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে পরিপূর্ণভাবে টিকার আওতায় আনতে উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, কভিড-১৯ টিকাগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার (১৩.২%) ও স্বাস্থ্য বিভাগের (১৭.৮%) উদ্যোগে খুব কম মানুষকেই উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী টিকাগ্রহণের ক্ষেত্রে টিকাকেন্দ্রে অন্যের চেয়ে দেরিতে টিকা পেয়েছেন এবং অবহেলা, দুর্ব্যবহার ইত্যাদি অসমতার শিকার হয়েছেন।
গবেষণায় বলা হয়, বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানুষের টিকাপ্রাপ্তি জাতীয় পর্যায়ের অর্জনের চেয়ে নিচে অবস্থান করতে দেখা যায়। ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে ন্যূনতম এক ডোজ টিকার আওতায় আসা মানুষের হার ছিল ৪৪ শতাংশ। ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বেশ কিছু এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেমন বেদে, হিজড়া, ডোম, হরিজন ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে টিকার আওতার বাইরে ছিল ৮০ শতাংশ বা তার বেশি। আবার টিকাকেন্দ্রের দূরত্ব, জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও খরচের কারণে প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার মানুষের টিকাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় ৮৬.৪ শতাংশ টিকাগ্রহীতাকে অন্যের সহায়তায় নিবন্ধন করতে হয়েছে। নিবন্ধন ও টিকাগ্রহণ করতে যাতায়াত বাবদ একজন টিকাগ্রহীতার মোট গড় খরচ ১০৬ টাকা, যা দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের এক দিনের আয়ের চেয়ে বেশি।
করোনা মহামারীর অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ঘাটতি পেয়েছে টিআইবি। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রণোদনা ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ২৩ শতাংশ উদ্যোক্তা অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হয়েছে। দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যাংকার কর্র্তৃক ১০ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগ উঠে এসেছে। সরকার কর্র্তৃক গৃহীত প্রণোদনা কর্মসূচির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ১০টি প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে; যার মধ্যে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত ঋণ সুবিধা প্যাকেজে ফেব্রুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত দুই ধাপে প্রদত্ত প্রণোদনার ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঋণ সুবিধা প্যাকেজে ৫২ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। আবার এ প্রণোদনা ঋণের আবেদন করতে গিয়েও ৬৭.৫ শতাংশ উদ্যোক্তা নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে ও আদিবাসী এলাকাগুলোতে ঋণ প্রদানে বৈষম্যের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব সংকট উত্তরণে টিআইবি ১০ দফা সুপারিশ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো টিকাপ্রাপ্তির উৎস, ক্রয়মূল্য, বিতরণ ব্যয়, মজুদ ও বিতরণ সম্পর্কিত তথ্য উন্মুক্ত করা, উত্থাপিত অভিযোগ নিরসন ও অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রতিটি জেলায় আইসিইউ শয্যা, আরটি-পিসিআর পরীক্ষাগারসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন শেষ করা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করে টিকার আওতায় আনা ইত্যাদি।
গবেষক দলের অন্য সদস্য হলেন একই বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট রাবেয়া আক্তার কনিকা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সমন্বয়ক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।
