নববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী

মেগা প্রকল্প নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ০২:২৪ এএম

বাংলা নববর্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় স্নাত হয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন, ধর্মীয় বিভেদহীন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সবাইকে পবিত্র রমজানের মোবারকবাদ ও বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘যতদিন বেঁচে আছি, আল্লাহ আমাকে কাজ করার সামর্থ্য দেবেন, ততদিন মানুষের জন্য কাজ করে যাব, জনগণের সেবা করে যাব।’

বাংলা নববর্ষ-১৪২৯ উপলক্ষে গতকাল বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করার উদাত্ত আহ্বান জানান। ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নববর্ষ-বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাভাইরাসের মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। জ¦ালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আমাদের দেশেও কিছু কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা কিন্তু চুপচাপ বসে নেই। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে স্বস্তি নিয়ে আসার।’

মেগা প্রকল্প নিয়ে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে কোনো ঋণ নেওয়া হয়নি। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অর্থনৈতিক সমীক্ষার মাধ্যমে আমরা অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলো গ্রহণ করেছি। আর শুধু ঋণ নয়, বিদেশি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমাদের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে। আমরা দেশি-বিদেশি ঋণ নিচ্ছি। তবে তা যাতে বোঝা হয়ে না উঠে সেদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সম্পদ বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা। ২০২২ ও ২০২৩ হবে বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের এক মাইলফলক বছর। আর কয়েক মাস পরেই চালু হতে যাচ্ছে বহুল আকাক্সিক্ষত পদ্মা সেতু। এ সেতু জিডিপিতে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বছরের শেষ নাগাদ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার অংশে মেট্রোরেল চালু হবে। আশা করা যায়, মেট্রোরেল রাজধানী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। আগামী অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামে কর্ণফুলীর নদীর তলদেশ দিয়ে চালু হবে দেশের প্রথম টানেল। ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিট আগামী বছরের শেষ নাগাদ চালু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। গত মাসে পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্ধারিত সময়ের আগেই উদ্বোধন করা হয়েছে। অন্যান্য মেগাপ্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত ১৩ বছরে যে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে তা অর্থনীতির সামষ্টিক সূচকগুলো বিবেচনা করলেই স্পষ্ট হয়। ২০০৯ সালে জিডিপির আকার ছিল মাত্র ১০২ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে তা ৪১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৭০২ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২ হাজার ৫৯১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।’

রমজানে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘রমজান মাসে আমরা টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি দিয়ে প্রায় এক কোটি পরিবারকে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। রাজধানী ঢাকায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিদিন ১৫টি ফ্রিজার ভ্যানে করে সাশ্রয়ী দামে মাংস, ডিম এবং দুধ বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ইতিমধ্যে কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছে। এছাড়া আসন্ন ঈদ উপলক্ষে ১ কোটি ৩৩ হাজার ৫৪টি ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে ১ লাখ ৩৩০ মেট্রিক টনের বেশি চালের বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

এ সময় তিনি গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, ‘কিছু কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে যেন দেশে দুর্ভিক্ষ অবস্থা বিরাজ করছে। দেশে চালসহ কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। সাশ্রয়ী দামে পণ্য কেনার জন্য টিসিবির দোকানে মানুষ ভিড় করবে এটাই স্বাভাবিক। এটাকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার কী কারণ থাকতে পারে?’

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগ ও এর সুফল তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত আছি। ইতিমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ টিকা পাওয়ার যোগ্য মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। দ্বিতীয় ডোজের পর এখন বুস্টার ডোজ দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এ মহামারী শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মহামারীজনিত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য আমার সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা ২৮টি প্যাকেজের মাধ্যমে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। এতে প্রায় ৬ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের মহামারীর সময়ও ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছর রেকর্ড ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এ বছরও আশানুরূপ রেমিট্যান্স আসছে। গত বছর রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮ দশমিক ৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এ বছর রপ্তানি আয়ে বাংলাদেশ নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করবে।’

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নববর্ষ ও বাঙালি সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্কের বিষয় তুলে ধরে বলেন, ‘এ ভূখণ্ডের হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং কৃষ্টির বাহক এ দেশের বাঙালি জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন ধর্মে-বর্ণে বিভক্ত হলেও ঐতিহ্য ও কৃষ্টির জায়গায় সব বাঙালি এক এবং অভিন্ন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন এখনো স্বমহিমায় টিকে আছে। সারা বছরের ক্লেদন্ডগ্লানি, হতাশা ভুলে এদিন সব বাঙালি নতুন আনন্দন্ডউদ্দীপনায় মেতে ওঠেন। “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী এ গান গেয়ে আমরা আবাহন করি নতুন বছরকে।’

প্রধানমন্ত্রী পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণকে বাঙালির সার্বজনীন উৎসব আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আবহমানকাল ধরে বাংলার গ্রামন্ডগঞ্জে, আনাচে-কানাচে এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। গ্রামীণমেলা, হালখাতা, বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন ছিল বর্ষবরণের মূল অনুষঙ্গ।’

ষাটের দশকের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের চল ছিল। আজিমপুর, ওয়ারী, ওয়াইজঘাট, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে হালখাতা উৎসব হতো, মেলা বসত, মেলায় পণ্য বেচাকেনা, গান-বাজনা, যাত্রা-সার্কাস ইত্যাদির আয়োজন হতো। ষাটের দশকে রমনার বটমূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীত পরিবেশন শুরু হয়। সকল সংকীর্ণতা, কূপমন্ডূকতা পরিহার করে উদারনৈতিক জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পহেলা বৈশাখ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। মনের ভেতরের সকল ক্লেদ, জীর্ণতা দূর করে আমাদের নতুন উদ্যোমে বাঁচার শক্তি জোগায়, স্বপ্ন দেখায়। আমরা যে বাঙালি, বিশ্বের বুকে এক গর্বিত জাতি, পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে এ আভিজাত্যবোধ এবং বাঙালিয়ানা নতুন করে প্রাণ পায়, উজ্জীবিত হয়।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর জনসমাগম করে উন্মুক্ত স্থানে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালা করা যায়নি। বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ অনেকটাই কমেছে। তাই এবার সীমিত আকারে হলেও বহিরাঙ্গনে অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে। তবে করোনাভাইরাস একেবারে নির্মূল হয়নি। নতুনরূপে করোনাভাইরাস আবার যেকোনো সময় যেকোনো দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যতদিন বেঁচে আছি, মহান রাব্বুল আলামিন আমাকে কাজ করার সামর্থ্য দেবেন, ততদিন মানুষের জন্য কাজ করে যাব, জনগণের সেবা করে যাব। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে চাই : জীবনের এই পথ, কে বলিতে পারে/বাকি আছে কত?/মাঝে কত বিঘœশোক, কত ক্ষুরধারে/ হৃদয়ের ক্ষত?/পুনর্বার কালি হতে চলিব সে তপ্ত পথে,/ক্ষমা করো আজিকার মতো/পুরাতন বরষের সাথে/পুরাতন অপরাধ যত।’

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে নতুন বছরের আনন্দ উপভোগ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শেষ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত