দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে সরকারি প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাট বিক্রি করছে এমন বিজ্ঞাপন পত্রিকায় দেখে অনেকটা আগ্রহ নিয়েই আবেদন করেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। ২ হাজার টাকার আবেদনপত্র আর ৩ লাখ টাকার জামানত জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ তার অনুকূলে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়। পরবর্তী কিস্তির টাকা পরিশোধ করার আগে জাহাঙ্গীর প্রবল আগ্রহ নিয়ে ‘প্রস্তাবিত ফ্ল্যাট’ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জায়গাটি দেখতে যান। জায়গা দেখে তার উৎসাহে ভাটা পড়ে।
জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাষ্য, সমুদ্রসৈকত থেকে কমপক্ষে দেড় কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করা হচ্ছে এসব ফ্ল্যাট। এত দূরে ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ নেই তার। সেজন্য আর কোনো কিস্তি পরিশোধ করেননি। তার মতো অনেকই বরাদ্দ পাওয়ার পর আর কিস্তি পরিশোধ করছেন না।
এ অবস্থায় আসছে জুনে ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ শেষ করে সেগুলো হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া গত কয়েক মাস ধরে নির্মাণ উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সর্বসাধারণের জন্য এ প্রকল্পটি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক)। ৩ হাজার ৮৯৫ টাকা বর্গফুট দরে এসব ফ্ল্যাট বিক্রি করেছিল কর্তৃপক্ষ। তুলনামূলক কম দামে ফ্ল্যাট পেয়েছেন গ্রহীতারা। গ্রহীতাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল শহর থেকে প্রকল্প এলাকা অনেক দূরে। ফলে ফ্ল্যাটের বিক্রির জন্য দরখাস্ত আহ্বানের পর অনেকটা না বুঝে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন অনেকে। এখন তারা সরে এসেছেন। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খিজির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ফ্ল্যাট সবই বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু এখন বেশ কিছু বরাদ্দগ্রহীতা তাদের নির্ধারিত কিস্তির টাকা জমা দিচ্ছে না। এতে নির্মাণকাজে কিছু জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আবার অস্বাভাবিক হারে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার ফলেও আরেকটি বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে।’
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, চারটি ১৫ তলা ভবনে মোট ৩৪৯ ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে কর্তৃপক্ষ। এক হাজার একর জমি ওপর করা হয়েছে এ প্রকল্প। বছর তিনেক আগে কক্সবাজারে আবাসন সমস্যা নিরসনে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সদর উপজেলার জালংজা এলাকায় ‘কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আবাসিক ফ্ল্যাট উন্নয়ন প্রকল্প-১’ শীর্ষক এ প্রকল্প গ্রহণ করে।
কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, একটু দূরে হলেও এ প্রকল্পের একটি বিশেষ দিক রয়েছে। মোট জমির প্রায় অর্ধেক জায়গা ফাঁকা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া গার্বেজস্যুটসহ আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অধিকাংশ ফ্ল্যাট দক্ষিণ-পূর্বমূখী এবং ক্রস ভেন্টিলেটেড, ফায়ার হাইড্রেন্টসহ সর্বাধুনিক অগ্নিনিরাপদ ব্যবস্থা, অতিথিদের অপেক্ষমাণ স্থানসহ সুপ্রশস্ত রিসেপশন, প্রকল্পের চারপাশে ২০ ফুট প্রশস্ত সার্ভিস রোড, সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সুপ্রশস্ত আটটি লিফট, শিশুদের জন্য ভবনের ভেতরে-বাইরে আধুনিক ক্রীড়াসামগ্রীসহ কমিউনিটি সুপারশপ ও ফিটনেস জোন রয়েছে।
তবে কক্সবাজারের এ প্রকল্প নিয়ে অন্য একটি সরকারি সংস্থার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন শহরটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে গঠন করা হয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কর্তৃপক্ষ গঠনের পরপরই তারা আবাসন ব্যবসায় নেমে পড়েছে। ঠিকঠাক মতো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই নেওয়া হয়েছে এ প্রকল্পটি। যার ফলে এটি এখন মুখ থুবড়ে পড়ছে। এ সংস্থার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত জনবল আছে মাত্র ১৯ জন। এ সামান্য জনবল দিয়ে পরিকল্পনা বা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করাই সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সংস্থাটি বড় আকারের একটি আবাসন প্রকল্প কীভাবে হাতে নেয়।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব (উপসচিব) আবু জাফর রাশেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার ধাক্কায় আমাদের প্রকল্পের কাজের গতি কিছুটা ধীর হয়ে গেছে। তাই নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। এছাড়া বাস্তবানাধীন একটি বড় আবাসিক এলাকার জন্য আমরা বাণিজ্যিক স্পেস তৈরির কাজ করছি। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনও চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সময় আরও এক বছর বাড়ানো হবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে যারা কিস্তির টাকা পরিশোধ করেননি তাদের জন্য সময় দেওয়া হচ্ছে। এরপরও যারা দেবেন না যথাযথ বিধি অনুযায়ী তাদের নামে বরাদ্দ বাতিলের ব্যবস্থা করা হবে।’
