তুরস্কে কেন খাশোগি হত্যার বিচার হচ্ছে না

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২২, ১২:৩২ এএম

সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যা মামলা সম্প্রতি সৌদি আরবে হস্তান্তর করেছে তুরস্ক। মামলার বাদী খাশোগির সাবেক বাগদত্তা হেতিজে চেঙ্গিস ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান। ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগিকে নৃশংসভাবে হত্যার সাড়ে তিন বছর পর কেন বিচার করতে চাইছে না তুরস্ক? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া   

মামলা হস্তান্তর

তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে সৌদি কনস্যুলেটে ২০১৮ সালে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় আলেচিত সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে। কনস্যুলেটের কড়া নিরাপত্তার ভেতরে এমন ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য চাপ দেওয়া হয় তুরস্ককে। হত্যাকাণ্ডের জন্য সৌদি সরকার বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিল সালমানকে দায়ী করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সৌদি রাজপরিবারের কট্টর সমালোচক ৫৯ বছর বয়সী জামাল খাশোগি হত্যায় জড়িত সন্দেহে সৌদি আরবের ২৬ নাগরিকের বিরুদ্ধে তুরস্কে মামলা করা হয়। মামলার আসামিদের তুরস্কের আদালতে প্রত্যর্পণের আবেদন বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছিল সৌদি সরকার। সম্প্রতি খাশোগি হত্যা মামলা আবারও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। ইস্তাম্বুলের প্রধান আদালত চলতি মাসের শুরুতে এক রায়ে বলে, খাশোগি হত্যা মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে তা সৌদি আরবে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদালতের ওই রায়ের কয়েকদিন আগে প্রসিকিউটর শুনানিতে অনুরোধ করেছিলেন, আসামিরা কোনো শুনানিতেই উপস্থিত থাকছেন না। এতে বিচারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়। ওই প্রসিকিউটর আদালতকে এও জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খতিয়ে দেখবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি আরবের বিচারিক কর্র্তৃপক্ষ। প্রসিকিউটরের অনুরোধ আমলে নেন তুরস্কের বিচারমন্ত্রী। এরপরই সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যা মামলা সৌদি আরবে হস্তান্তর করা হয়।       

খাশোগির বাগদত্তার প্রতিক্রিয়া

নিহত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির বাগদত্তা ছিলেন হেতিজে চেঙ্গিস। তুরস্কের এই নাগরিক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের গবেষক। উপসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে বইও লিখেছেন হেতিজে চেঙ্গিস। ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগি হত্যার পর থেকে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি। হত্যাকারীদের পাশাপাশি হত্যার পরিকল্পনাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন চেঙ্গিস। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসসহ অন্যান্য দেশের পার্লামেন্টে সাংবাদিক খাশোগি হত্যার বিচারের দাবি জানান তিনি। স্বাভাবিকভাবেই জামাল খাশোগি হত্যা মামলা সৌদি আরবে হস্তান্তরের তুরস্কের সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেন চেঙ্গিস। মামলার বাদী তিনিই। রায় শোনার পর ইস্তাম্বুলের প্রধান আদালতের বাইরে চেঙ্গিস সাংবাদিকদের জানান, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করবেন। চেঙ্গিস বলেন, ‘সৌদি আরবের মতো তুরস্ক এক পরিবার শাসন করছে না। এখানে বিচারব্যবস্থা রয়েছে যার দায়িত্ব নাগরিকদের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। তুরস্কের আইন অনুযায়ী আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।’     

বাদীপক্ষের আইনজীবীদের একজন গকমেন বাসপিনার। শুনানির সময় আদালতকে তিনি বলেন, ‘খাশোগি হত্যা মামলা সৌদি আরবে হস্তান্তরের কোনো যুক্তি নেই। এই মামলা যাতে সৌদি আরবে না পাঠানো হয়, এজন্য আমরা এরই মধ্যে একটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। কর্র্তৃপক্ষের জবাবের জন্য আদালতের অপেক্ষা করা উচিত ছিল। তা না করে রায় দিয়ে দেওয়া দুঃখজনক। তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে কোনো ধরনের বিচারিক সহযোগিতা চুক্তি নেই। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিচারিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে তুরস্ক, সৌদি আরব নয়। জামাল খাশোগি হত্যার বিচার সৌদি আরব তার মতো করে শেষ করেছে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এই বিচারকাজ তুরস্কের অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে।’    

খাশোগি হত্যাকাণ্ডে ২০২০ সালে পাঁচ জনকে মৃতুদণ্ড দিয়েছিল সৌদি আরব। পরে তাদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য ছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জামাল খাশোগির স্ত্রী হানান এলাতার ও তার ছেলেরা ক্ষমা করে দেওয়ায় সাজা কমানো হয়। তবে সৌদি সরকারের ওই পদক্ষেপ মানেননি বাগদত্তা হেতিজে চেঙ্গিস। তিনি বলেছিলেন, বিচারের নামে প্রহসন করেছে সৌদি আরব।

মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া

সাংবাদিক খাশোগি হত্যার পর সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্কে অনেক অবনতি ঘটে। তবে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা তুরস্ক সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছে। খাশোগি হত্যা মামলা সৌদি আরবে হস্তান্তর আঙ্কারার সেই চেষ্টারই অংশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তুরস্কের এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী সচেতন মহলকে উদ্বেগে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলা হস্তান্তর করায় ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন হেতিজে চেঙ্গিসসহ খাশোগির সমর্থকরা। সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্যের উপপরিচালক মাইকেল পেইজ বলেন, ‘তুরস্ক থেকে সৌদি আরবে জামাল খাশোগি হত্যা মামলা হস্তান্তরের ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা আর নেই। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পার পেয়ে যাবে বলে ভেবেছিল সৌদি সরকার। তাদের সেই ভাবনাই সত্য হতে যাচ্ছে। তুরস্ক কর্র্তৃপক্ষের উচিত তাদের সিদ্ধান্ত বাতিল করা। যারা জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী, তাদের হাতেই মামলা হস্তান্তর করে হত্যাকারীদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ন্যক্কারজনক এই কাজ করা তুরস্কের উচিত হবে না।’

অধরা খুনিরা

জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই হত্যা পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছিলেন সৌদি আরবের কার্যত নেতা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদন সে সময় প্রত্যাখ্যান করে হত্যাকাণ্ডে যুবরাজ সালমানের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে সৌদি সরকার। খাশোগি হত্যার পর হেতিজে চেঙ্গিসের দায়ের করা মামলার কার্যক্রম বন্ধ করতে বেশ কয়েকবার তুরস্ককে চাপ দেয় সৌদি আরব। দেশটির ভাষ্য, হত্যায় জড়িত থাকার সন্দেহে নিজেদের ১৮ নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, দোষীদের সাজাও দেওয়া হয়েছে। বিচারকাজ যা হওয়ার তা সৌদি আরবেই হয়ে গেছে। তুরস্কের আলাদা করে বিচার করার দরকার নেই। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ সদস্যের যে দল জামাল খাশোগিকে হত্যা করে, সেটির অন্তত তিন জন সদস্য সৌদি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা পরিচালিত বিলাসবহুল ভবনে কাজ করছেন। রিয়াদে অবস্থিত ওইসব ভবনে তারা থাকছেনও। পরিবারের সদস্যরা ওই তিন জনের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ সালাহ আল-তুবাইগি যিনি সৌদি কনস্যুলেটে জামাল খাশোগির মৃতদেহ খণ্ড খণ্ড করেন, তাকে ভবনগুলোর প্রাঙ্গণে দেখা গেছে। এ ছাড়া রয়েছেন হত্যাকাণ্ডের দিন জামাল খাশোগির ছদ্মবেশ নেওয়া মুস্তাফা আল-মাদানি। ভবনে আরও রয়েছেন মনসুর আবা হুসেইন যিনি হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর তুরস্ক সরকার তদন্তে নামে। হত্যাকাণ্ডের দিন ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে হিট স্কোয়াডের ওই ১৫ সদস্য কে কী করছিলেন, সেসব সার্ভিল্যান্স ক্যামেরায় ধরা পড়ে। 

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয়ই নিজেদের স্বার্থে তিক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, যা দেখে হতাশার কথা জানান হেতিজে চেঙ্গিস। তার আশঙ্কা, এই দুই দেশ ঘনিষ্ঠ হলে খাশোগি হত্যার ন্যায়বিচার পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়বে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্যের উপপরিচালক মাইকেল পেইজ বলেন, ‘তুরস্ক প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার বন্ধ করতে পারে না তুরস্ক। মামলা এভাবে সৌদি আরবে হস্তান্তর করা লজ্জাজনক ঘটনা। এর মাধ্যমে নিজের দেশে বিদেশি সরকারের নির্দেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে খুনিদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে তুরস্ক।’   

এরদোয়ানের সফর

শিগগিরই সৌদি আরবে সফর করতে যাচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সাড়ে তিন বছর আগে খাশোগি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সব ধরনের তুর্কি পণ্য দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল সৌদি সরকার। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সফরের মধ্য দিয়ে সৌদি যুবরাজ সালমান চিরদিনের জন্য খাশোগি অধ্যায়ের ইতি টানতে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে ওয়াকিবহাল এক সূত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘খাশোগি হত্যাকাণ্ড সৌদি যুবরাজ সালমানের গলার কাঁটা। এই কাঁটা তুলতে তিনি মরিয়া। দেশে-বিদেশে এ নিয়ে তাকে ব্যাপক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোয় তার ওপর ক্ষুব্ধ যুবরাজ সালমান। এ ছাড়া এরদোয়ান সাংবাদিক খাশোগি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তদন্তকাজ বিস্তৃত করায় বেশ নাখোশ ছিলেন সালমান। আগামী বছর তুরস্কে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ক্ষমতা ধরে রাখতে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটানো দরকার এরদোয়ানের। এ কারণে রিয়াদ সফর করছেন তিনি। অন্যদিকে যুবরাজ সালমানের চিন্তায় কেবলই খাশোগি। তিনি এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে চাইছেন।’

মামলা যুক্তরাষ্ট্রেও

তুরস্ক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টে খাশোগি হত্যায় জড়িত সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই মামলায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম আসামি তালিকায় রয়েছে। হেতিজে চেঙ্গিস ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ডেমোক্র্যাসি ফর দ্য আরব ওয়ার্ল্ড নাও (ডন) ওই মামলা দায়ের করেন। অ্যাডভোকেসি গ্রুপটি খাশোগি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেটি পরিচালনা করতেন। তুরস্কের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা মামলা আঙ্কারার এখতিয়ারের বাইরে। তুর্কি এক কর্মকর্তা বলেন, ‘খাশোগি হত্যাকে কেন্দ্র করে ইস্তাম্বুলে দায়ের করা মামলার বিচারিক কাজ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে তুরস্ক। এটি আইনি সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে যে মামলা করা হয়েছে, সেটিতে তুরস্কের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। খাশোগি হত্যায় সৌদি যুবরাজের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে যে মামলা করা হয়েছে, তা চালানো পুরোপুরি হেতিজে চেঙ্গিসের ওপর নির্ভর করছে। খাশোগির পরিবারের সদস্যসহ আরও অনেকে চেঙ্গিসকে চাপ দিচ্ছেন, তিনি যেন মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেন। এখন পর্যন্ত ন্যায়বিচারের জন্য লড়ে যাচ্ছেন চেঙ্গিস। যুক্তরাষ্ট্রে চেঙ্গিস যে মামলাটি করেছেন, তার বিচার করার এখতিয়ার দেশটির রয়েছে কি-না, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন ডিসির বিচারক এখনো কোনো রুল দেননি। যদি তিনি চেঙ্গিসের পক্ষে রুল দেন, তাহলে সৌদি যুবরাজকে সশরীরে আদালতে সাক্ষ্য দিতে ডাকবে মার্কিন আদালত।

গবেষকের ভাষ্য 

লন্ডনভিত্তিক আরবি ভাষার টিভি চ্যানেল আল-হাইওয়ারের সম্পাদক, গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী আজাম তামিমি বলেন, ‘খাশোগি হত্যা মামলা হস্তান্তরের বিষয়ে তুরস্ক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা গণতান্ত্রিক একটি দেশের কাছ থেকে কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোতে বিচার বিভাগ বরাবরই নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা ও স্বাধীন। স্বাধীন বিচার বিভাগ জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেয়। নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করলে সেক্ষেত্রে সাংবাদিক, লেখক, মানবাধিকারকর্মী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সমালোচক কেউই নিরাপদ বোধ করবেন না। গণতান্ত্রিক কাঠামোর আইনপ্রণেতারা মনে করতে পারেন, রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পরিবর্তন আনা জরুরি কারণ রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। তবে গণতন্ত্রে কোনো ধরনের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন আইনি প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে না। খাশোগি হত্যা মামলার কাজ বন্ধ করতে তুরস্কের ওপর চাপ দিয়ে আসছিল সৌদি আরব। শুধু তাই নয়, খাশোগির সাবেক বাগদত্তা হেতিজে চেঙ্গিস যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টে যে মামলাটি করেছেন, তা বন্ধ করতে তুরস্ককে সর্বশক্তি প্রয়োগ করার জন্যও চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব। সৌদি কর্র্তৃপক্ষ খুব ভালোভাবেই জানে, বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রকে মামলা বন্ধ করতে বলা যাবে না। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে এমনটা কেউ বলতে পারে না। তাই ভিন্ন পথ নিয়েছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করতে হেতিজে চেঙ্গিস ও তার সহকর্মীদের যেন তুরস্ক সরকার চাপ দেয়, সেই চেষ্টা জারি রেখেছে সৌদি আরব।’ আজাম তামিমি আরও বলেন, ‘সৌদি আরবের চাপে দাবি মেনে নেওয়া তুরস্কের জন্য মারাত্মক হতে পারে। মামলা হস্তান্তর করে অপরিপক্ব পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় দিয়েছে আঙ্কারা। সৌদির স্বৈরশাসকদের অন্যায় দাবিতে আজ মাথা নত করল তুরস্ক, কাল আরেকটি অন্যায় দাবি করে বসবে তারা এবং তা হয়তো মেনেও নেবে আঙ্কারা। তুরস্কের দুর্বলতা বুঝে গেছে সৌদি আরব। দেশের অর্থনৈতিক সংকট দূর করার চাপ তো আছেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ওপর। তা ছাড়া ভূ-রাজনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা তুরস্কের এ মুহূর্তে খুব প্রয়োজন। ২০১০ সালে তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে শুরু করে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আরব বসন্ত নামে পরিচিত ওই গণআন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিল তুরস্ক। এতে আরব শাসকদের সঙ্গে বিভেদ সৃষ্টি হয় তুরস্কের। এটা সহজে বোধগম্য, আরব শাসকদের সঙ্গে সেই বিভেদ ঘোচানোর চেষ্টা করছে তুরস্ক। তবে সেটা গণতন্ত্রকে বলি দিয়ে হতে পারে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত