ডেপ-অ্যাম্বারের যুগল জীবনের শুরুটা ছিল রুপালি পর্দার মতোই রঙিন। সিনেমার সেটে পরিচয়, প্রণয়, এরপর গাঁটছড়া বাধা। তবে দুবছর না গড়াতেই বিচ্ছেদের করুণ সুর বেজে ওঠে এই জুটির দাম্পত্য জীবনে। ভালোবাসার উল্টোপিঠে যে ঘৃণার বাস, তারই প্রমাণ যেন দিয়ে চলেছেন এই মার্কিন দম্পতি। হলিউডের সাবেক তারকা দম্পতি জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ডের আইনি লড়াই নিয়ে লিখেছেন নাসরিন শওকত
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ডের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে মানহানির দাবিতে করা মামলার তিক্ত আইনি লড়াইয়ের ধারাবাহিক এক পর্ব এবার শুরু হয়েছে ভার্জিনিয়ায়। যুক্তরাজ্যে শুরু হওয়া এক মানহানি মামলার বিচারে প্রথম দফায় হেরে যান ৫৮ বছর বয়সী ডেপ। এরপরই নির্যাতনবিষয়ক একটি মতামত লেখার জন্য ৩৫ বছর বয়সী প্রাক্তন স্ত্রী অ্যাম্বারের বিরুদ্ধে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মামলা করেন তিনি। ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা ওই মতামতে অ্যাম্বার দাবি করেন, তিনি পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ অভিযোগে ডেপের বিরুদ্ধে পাল্টা ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মামলা করেন অ্যাম্বার। মানহানির এ বিচারে পারিবারিক নির্যাতনের বেদনাদায়ক অভিযোগ তুলে ধরা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরাসরি সম্প্রচার করা এ বিচারের শুনানিতে জেমস ফ্রাঙ্কো, পল বেটানি, ইলন মাস্কসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী সাক্ষীর সাক্ষ্য দেওয়ার কথা।
ঝড়তোলা প্রেম ও এর সমাপ্তি
সেলিব্রিটি জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ডের প্রেমকাহিনী একসময় হলিউডে ঝড় তোলে। ২০০৯ সালে ‘দ্য রাম ডায়েরি’ সিনেমার পোর্টা রিকোর সেটে প্রথম দেখা এ প্রেমিক-যুগলের। এ ছবিতে প্রেমের অভিনয় করতে গিয়েই দুজনের ভালো লাগার শুরু। তবে ডেপ তখন ফরাসি অভিনেত্রী ও গায়িকা ভেনেসা পারাদিসের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে। তাদের দুটি সন্তানও রয়েছে। আর শিল্পী তাস্যা ভ্যান রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন অ্যাম্বার। ২০১১-এর অক্টোবরে ‘দ্য রাম ডায়েরি’ মুক্তি পায়। এ সিনেমার বিশ্বব্যাপী প্রচারণা ডেপ ও অ্যাম্বারকে আবার কাছে নিয়ে আসে। পরের বছর জুনে ভেনেসার সঙ্গে দীর্ঘ ১৪ বছরের প্রেমের ইতি টানেন ডেপ। সেই থেকে ৯ মাস চুটিয়ে প্রেম করছিলেন ডেপ ও অ্যাম্বার। এর দুবছর পর লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের এক পেন্টহাউজে একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন তারা। ২০১৪ এর জানুয়ারিতে বাগদানের ঘোষণা দেন এ তারকা জুটি।
পরের ফেব্রুয়ারিতে জনি ডেপকে বিয়ে করেন অ্যাম্বার হার্ড। তবে বিয়ের কদিন না যেতেই সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয় দুজনের। একপর্যায়ে ২০১৬ সালের মে মাসে গালে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের আদালতে উপস্থিত হন আম্বার। এ সময় স্বামী ডেপের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আদেশ চেয়ে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। তিনি জানান, বয়সে ২৩ বছরের বড় তার স্বামী ‘সহিংসভাবে’ তাকে আক্রমণ করেছেন এবং তার দিকে ‘ক্ষিপ্র গতিতে’ একটি মুঠোফোন ছুড়ে মেরেছেন।
এ ছাড়া ডেপের বিরুদ্ধে আদালতের নথিতে লেখা হয়রানির অন্য অভিযোগের মধ্যে ছিল ‘চরম মানসিক, মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতন’ এবং ‘রাগী, ক্রুদ্ধ, অপমানজনক ও হুমকিমূলক আক্রমণ’।
নির্যাতন অস্বীকার
সে সময় লস অ্যাঞ্জেলেস আদালতের এক বিচারক অ্যাম্বারকে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। তবে ওই আদেশের ওপর দেওয়ানি বিচার শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে অ্যাম্বার এবং ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ানের’ জনপ্রিয় অভিনেতা ডেপ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে জানান, তারা তাদের বিরোধের অবসান ঘটিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের সম্পর্ক তীব্রভাবে আবেগপূর্ণ এবং মাঝেমধ্যে অস্থির ছিল। তবে তা সব সময় প্রেমের দ্বারা আবদ্ধ ছিল। কোনো পক্ষই আর্থিক লাভের জন্য মিথ্যা অভিযোগ করেনি। শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না।’ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডেপ তাদের বিবাহবিচ্ছেদের মীমাংসার অংশ হিসেবে অ্যাম্বারকে ৭ মিলিয়ন ডলার দেন। পরে এ অর্থ আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নকে দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অ্যাম্বার। এ নিয়েই ডেপের পক্ষ এখন বিতর্ক করছে।
অ্যাম্বারের বিরুদ্ধে মামলা
কিছু সময়ের জন্য সাবেক এই দম্পতিকে সুশীল বলে মনে হয়েছিল। তবে বছর না ঘুরতেই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অ্যাম্বার ওয়াশিংটন পোস্টে একটি মতামত লেখেন, যেখানে তিনি তার অভিজ্ঞতাকে ‘পারিবারিক নির্যাতনের প্রতিনিধিত্বকারী জনপ্রতিনিধি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। সেখানে আম্বার বলেন, ‘নারীদের সম্মান রক্ষার্থে যারা কথা বলে, তাদের জন্য আমি ক্রোধের সংস্কৃতির পুরো শক্তিকে অনুভব করেছি। প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত পুরুষদের রক্ষা করে, তা বাস্তবে দেখার বিরল সুযোগ হয়েছিল আমার।’ এতে তিনি তার স্বামী ডেপ বা অন্য কোনো অভিযুক্ত অপরাধীর নাম উল্লেখ করেননি। তবে ডেপ অভিযোগ তোলেন, ‘এই তিনটি বাক্য যেকোনোভাবে হোক তার মানহানি ঘটায়, যা তার ক্যারিয়ারকে লাইনচ্যুত করে এবং অকল্পনীয়ভাবে তার খ্যাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ওই মতামত এ বার্তাই স্পষ্ট করে, ডেপ একজন পারিবারিক নিপীড়ক, যা স্পষ্টতই এবং প্রমাণিতভাবে মিথ্যা।’ ডেপের আইনজীবী অ্যাম্বারের বিরুদ্ধে আনা এক অভিযোগে লিখেছেন, ‘তার অভিযোগগুলো... মিসেস হার্ডের জন্য ইতিবাচক প্রচার তৈরি করতে এবং তার ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এটি একটি বিস্তৃত প্রতারণার অংশ।’
ভার্জিনিয়ায় বিচার
বিচারটি কেন ভার্জিনিয়াতে হওয়া উচিত এর সপক্ষে ডেপের আইনি দল সফলভাবে যুক্তি দেখিয়েছিল যে, ওয়াশিংটন পোস্ট কার্যালয়ের দুটি ভবনই এখানে এবং পত্রিকাটি সরাসরি সেখান থেকেই প্রকাশিত হয়। এ মানহানি মামলায় ডেপ ও অ্যাম্বারকে প্রতিনিধিত্ব করছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাটর্নি রায়ান বেকার। তার মতে, ‘একজন বাদীর পক্ষে ফোরাম বেছে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু তার মানে এটি ব্যাখ্যা করে না, কেন তারা ক্যালিফোর্নিয়াকে রেখে ভার্জিনিয়া বেছে নিয়েছেন।’ অ্যাটর্নি বেকার বলেছেন, কৌশলগত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভবত জনসাধারণের অংশগ্রহণের সুযোগ বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত অ্যান্টি-এসএলএপিপি (স্ট্র্যাটেজিক ল’সুইট অ্যাগেইনস্ট পাবলিক পার্টিসিপেশন) আইন বলে কিছুর সঙ্গে এর কারণ যুক্ত রয়েছে। এই রাষ্ট্রীয় আইনগুলো মূলত প্রথম সংশোধনীর সম্প্রসারণ, যেখানে বক্তৃতা ও জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কর্মকাণ্ডের অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অ্যাটর্নি বেকারের মতে, ‘অ্যাম্বার হার্ডের মতো কেউ যদি পারিবারিক সহিংসতা এবং স্বামী-স্ত্রী নির্যাতন সম্পর্কে কিছু লেখেন সেগুলো স্পষ্টতই জনস্বার্থের বিষয়। এ বিষয়গুলো বলার জন্য বিদ্যমান আইনে (অ্যান্টি-এসএলএপিপি) তার এক ধরনের সুরক্ষা রয়েছে।’ ভার্জিনিয়া এবং ক্যালিফোর্নিয়া উভয় রাজ্যেই অ্যান্টি-এসএলএপিপি আইনের নিজস্ব ধরন রয়েছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়ায় এ আইনের ধরন আরও শক্তিশালী। সেখানে অ্যাম্বারের মতো অভিযুক্তরা অবিলম্বে সুরক্ষা আহ্বান করতে পারেন। বিপরীতে ভার্জিনিয়ায় এ অভিযুক্তদের আইনি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে এ সুরক্ষা ব্যবহারের অনুমতি দেয় না। অ্যাটর্নি বেকার বলেন, ‘আমি মনে করি অ্যাম্বার এই মামলাকে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক মুহূর্তেই শেষ করে দিতেন।’ ডেপকে এখনো তার সাবেক স্ত্রীর কাছ থেকে একটি অ্যান্টি-এসএলএপিপি যুক্তি কাটিয়ে উঠতে হবে। গত মাসে ভার্জিনিয়ার একজন বিচারক রায় দেন, হার্ড চাইলেই বিচারের সময় আইনটি উত্থাপন করতে পারেন। মতামতে দেওয়া তার বিবৃতি যে সুরক্ষিত, তা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন। ডেপের জন্য ‘এ লড়াই সত্যিকার অর্থে একটি পর্বত আরোহণের মতোই কঠিন হবে’ জানিয়ে অ্যাটর্নি বেকার আরও বলেন, ‘ তিনি ভার্জিনিয়ায় অনেক পরে এ যুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।’
মারধরের অভিযোগ
ওয়াশিংটন পোস্টে অ্যাম্বারের মতামত প্রকাশিত হওয়ার আগে ২০১৮ সালের এপ্রিলে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সানে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়, যেখানে ডেপের বিরুদ্ধে সাবেক স্ত্রী অ্যাম্বারকে মারধরের অভিযোগ তুলে তাকে ‘স্ত্রী মারধরকারী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এ মানহানির জন্য ডেপ দ্য সানের সম্পাদক ও নিউজ গ্রুপ নিউজপেপার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন। লন্ডনের রয়্যাল কোর্ট অব জাস্টিসের ১৩ নম্বর আদালতে ওই মামলার শুনানি চলে। এতে ডেপের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আহত হওয়ার মতো ছিল। অ্যাম্বার বলেন, তিনি ১৪টিরও বেশি অনুষ্ঠানে ডেপের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তিনি মাঝেমধ্যেই তার জীবন হারানোর আশঙ্কা করছিলেন। একপর্যায়ে ভাঙা নাক, কালশিটে চোখ এবং কেটে যাওয়া ঠোঁট নিয়ে ডেপকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আর ১৫তম অভিযোগটি ছিল অত্যন্ত আতঙ্কজনক ও ব্যক্তিগত, যা উন্মুক্ত আদালতে শোনার অনুপযোগী।
শুনানিতে ওই সংবাদপত্রের আইনজীবী দাবি করেন, তাদের কাছে ডেপের বিরুদ্ধে মারধরের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তবে সাবেক স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন ডেপ। বরং আদালতে তিনিই স্ত্রীর হাতে প্রতিহিংসার শিকার হন বলে পাল্টা দাবি করেন। আদালতে লিখিত দিয়ে ডেপ অভিযোগ করেন, বিয়ের পরেও একাধিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন অ্যাম্বার। ২০১৫ সালে টেসলারের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান ওই অভিনেত্রী। এরপর সহ-অভিনেতা জেমস ফ্রাঙ্কোর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়। তবে ডেপের এই অভিযোগ অস্বীকার করেন অ্যাম্বার। মামলাটি ডেপ ও স্যার এলটন জনের মধ্যে আসক্তির বিপদ সম্পর্কিত একটি ইমেল বিনিময়ের মাধ্যমে শুরু হয়। তারপরে একের পর এক বিকৃত চরিত্রের উল্লেখের সঙ্গে তা চলতে থাকে। সাক্ষী হিসেবে হলিউডের এ তালিকাভুক্ত তারকাদের মধ্যে জেমস ফ্রাঙ্কো, মেরিলিন ম্যানসন, উইনোনা রাইডার, কেট মস ভ্যানেসা প্যারাদিস এবং ইলন মাস্কও ছিলেন।
অদ্ভুত মামলা
ডেপ ও দ্য সানের মধ্যে যখন এ আইনি লড়াই চলছিল, তখন লন্ডনের তিন সপ্তাহের ওই বিচারটিকে বরং সাবেক এ দম্পতির মধ্যকার বড় ধরনের বিবাদের মতো দেখায়। এটি যে দ্য সানের সম্পাদক, ডেপ ও নিউজ গ্রুপ নিউজপেপার্স লিমিটেডের মধ্যে একটি মানহানির লড়াই, তা ভুলে যাওয়াই সহজ ছিল। কারণ মামলার শুনানিতে সংবাদপত্রটির কাউকেই সাক্ষীর জন্য ডাকা হয়নি। দ্য সানের সাংবাদিক ড্যান উটন নিবন্ধটি লেখেন, যেখানে বলা হয়, অভিনেতা ডেপ যে একজন ‘স্ত্রী মারধরকারী’ ছিলেন তার ‘অকাট্য প্রমাণ’ রয়েছে। ডেপের সাফল্যের ভাবমূর্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইংল্যান্ডে ভালো ছিল, যেখানে একজন মানহানিকর ব্যক্তিকে এটা প্রমাণ করতে হয় যে, তার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সত্য নয়। এমন অনুকূল পরিস্থিতিতেও আশ্চর্যজনকভাবে ডেপ মামলায় হেরেছেন। এক ব্রিটিশ বিচারক রায় দেন, অ্যাম্বারের করা নির্যাতনের অভিযোগের ‘অনেক বড় অংশই’ বেসামরিক মানদণ্ডে প্রমাণিত হতে পারে, যার অর্থ নির্যাতন না ঘটার চেয়ে খুব সম্ভবত নির্যাতন করা হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ডেপের আপিল প্রত্যাখ্যান করা হয়।
অভিনেত্রী, আন্দোলনকর্মী ও প্রচারক
২০১৬ সালে ডেপ ও অ্যাম্বারের বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে অ্যাকুয়াম্যানখ্যাত তারকা অ্যাম্বার পারিবারিক ও যৌন নির্যাতনের বিষয়ে সোচ্চার এক প্রচারক হয়ে ওঠেন। নারী অধিকারের প্রচারে অ্যাম্বারের অবদানের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রচারাভিযান তাকে মানবাধিকার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নামকরণ করে। তিনি আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) জন্য নারী অধিকারের রাষ্ট্রদূত হন। অ্যাম্বার তার পারিবারিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউ ইয়র্ক টাইমসে বক্তৃতা দেওয়ার পাশাপাশি লিখেছেনও।
মি টু আন্দোলনের সময় হলিউডের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তির হাতে সহ্য করা নির্যাতন সবার সামনে প্রকাশ করে যারা ভুক্তভোগী নারীদের পক্ষে কথা বলছিলেন, অ্যাম্বার তাদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। অ্যাম্বার হার্ড একজন অভিনেতা, মডেল, অ্যাকটিভিস্ট এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার।
সাক্ষীর তালিকা
ভার্জিনিয়ায় এবারের সম্ভাব্য সাক্ষীর তালিকায় প্রায় ১২০ জনের নাম রয়েছে। এটি একটি তারকাখচিত ভাণ্ডার : ইলন মাস্ক, এলেন বারকিন, পল বেটানি এবং জেমস ফ্রাঙ্কো। লন্ডনের মানহানির বিচারে পড়া বার্তাগুলো অনুসারে টেসলার নির্বাহী ইলন মাস্ক অ্যাম্বারের পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। ২০১৬-১৮ সালের মধ্যে অ্যাম্বারের সঙ্গে ডেটিং করেন ইলন মাস্ক। তিনি এই তারকাকে জনি ডেপের কাছ থেকে রক্ষার জন্য ‘পুরো সপ্তাহের ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা’ প্রদানের প্রস্তাব করেছিলেন। ফ্রাঙ্কোও অ্যাম্বারের পক্ষে কথা বলবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিনেত্রী বলেছেন, তিনি ডেপের সঙ্গে কথিত লড়াইয়ে যে আঘাতগুলো সহ্য করেছেন, সে বিষয় তিনি ফ্রাঙ্কোর কাছে গোপন করেন। আর জনপ্রিয় তারকা, প্রযোজক ও সুরকার ডেপকে ‘সবচেয়ে সদয় ও ভদ্র’ মানুষ বলে অভিহিত করা পল বেটানি তার বন্ধুর পক্ষ নেবেন। বেটানি সম্ভবত ২০১৩ সালে তার ও ডেপের মধ্যে আদান-প্রদান করা খুদে বার্তাগুলোর বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন।
লড়াইয়ের পরিণাম
হলিউডের সাবেক এই সেলিব্রিটি দম্পতি জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ড একে অপরের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। এবারের মামলায় ডেপ ও অ্যাম্বার ছাড়াও হলিউডের এ তালিকাভুক্ত একাধিক তারকা সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন। সাবেক এ দম্পতির থেরাপিস্ট ডক্টর লরেল অ্যান্ডারসনের বলেছেন, এই জুটি তাদের ঝোড়ো দাম্পত্য জীবনের শেষ মাসগুলোতে ‘পরস্পরের প্রতি নির্যাতন’ করেছিলেন। ভার্জিনিয়ায় কোর্টে আম্বারের বিরুদ্ধে ডেপের ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের করা মানহানির বিচারের তৃতীয় দিনে এ সাক্ষ্য দেন তিনি। গত ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ড করা ডক্টর অ্যান্ডারসনের ভিডিও সাক্ষ্য ১৪ ফেব্রুয়ারি বিচারকদের জন্য চালিয়ে শোনানো হয়। অ্যান্ডারসন বলেন, তিনি বিখ্যাত এই দম্পতিকে ২০১৫-এর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মধ্যে বেশ কয়েকটি থেরাপি সেশনে দেখেছেন। এ সময় মিস্টার ডেপ ও মিসেস হার্ডের মধ্যে একটি অস্থির প্রবণতা থাকার কথা বর্ণনা করেছেন তিনি। এরই মধ্যে শুরু হওয়া এ আইনি লড়াই ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নানা উপায়েই এটি লন্ডন শুনানির পুনরাবৃত্তি হবে। নিশ্চিতভাবেই আম্বার তাদের সম্পর্কের পুরোটা সময়জুড়ে অস্থির থাকা ডেপের মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতনের দাবির পুনরাবৃত্তি করবেন। এর জবাবে ডেপ সম্ভবত তার সেই দাবিতেই ফিরে আসবেন, অ্যাম্বার হার্ড ছিলেন আগ্রাসী এবং আর্থিক ও সুনাম লাভের আশায় সে নিজেকে একটি শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে সেলিব্রিটি তারকাদের জীবন নিয়ে অসংখ্য কাজ করা সাংবাদিক কুপার লরেন্সের মতে, ‘আমি মনে করি না যে, তাদের কেউই এরপর মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসতে পারবেন।’ জনসম্মুখে একটি দম্পতির ব্যক্তিগত জীবনের নিষ্ঠুর পরীক্ষার সঙ্গে পুরো এ প্রক্রিয়াটি জড়িত। আদালতকে ব্যবহার করে কেউ যদি খ্যাতি পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাদের জন্য এটি একটি সতর্ক বার্তা।
