ইচ্ছেমতো সুদ মওকুফ করতে পারবে না ব্যাংক

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:৫৬ পিএম

দেশের বড় দুই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান একে অপরের ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সুদ মওকুফ সুবিধা নিয়েছে। এই সুদ মওকুফের অনুমোদনও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফ করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এর মধ্যেই সুদ মওকুফের নতুন নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে পাঠানো হয়।

এতে বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, মড়ক, নদী ভাঙন, দুর্দশাজনিত কারণে বা বন্ধ প্রকল্প প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের ঋণের সুদ সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ করতে পারে ব্যাংক। কিন্তু এ ধরনের কোনো কারণ না থাকার পরও ব্যাংক বিভিন্ন গ্রাহকের অনুকূলে প্রায়ই সুদ মওকুফ সুবিধা দিচ্ছে। এতে করে সুদ মওকুফ সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে গ্রাহকদের মধ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে অনাগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে সুদ মওকুফ নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নীতিমালায় আরও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে গ্রাহকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি, সামগ্রিক ঋণ শৃংখলা বজায় রাখা এবং গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ব্যাংকিং খাতের ঋণের আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে এই নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে মূল ঋণ বা আসল কোনোভাবেই মওকুফ করা যাবে না।

জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার ঋণের সুদ মওকুফ করা যাবে না। ব্যাংকের আয় খাত বিকলন করে সুদ মওকুফ করা যাবে না বলেও নীতিমালায় বলা হয়।

১০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল ঋণের সুদ মওকুফ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের ওপর অর্পণ করা যাবে। এ ছাড়া অন্যান্য অংকের ঋণের সুদ মওকুফ সুবিধা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কর্র্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়, সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় আদায় নিশ্চিত করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে তহবিল ব্যয় আদায় শর্তসাপেক্ষে শিথিল করা যাবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে তিন বছর যাবত বন্ধ রয়েছে এরূপ প্রকল্প, ঋণের জামানত, সহজামানত, প্রকল্প সম্পত্তি এবং প্রকল্প উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি থেকেও তহবিল ব্যয় আদায় করা না গেলে, পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে আইনগত ব্যবস্থাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরও পাওনা আদায় করা সম্ভব না হলে, ঋণগ্রহীতা যৌক্তিক কারণে ঋণ পরিশোধে অপারগ হলে সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে তহবিল ব্যয় আদায় না করলেও চলবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়।

তহবিল ব্যয় বলতে যে সময় বা বছরের সুদ মওকুফ করা হবে সে সময় বা বছরের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক তহবিল ব্যয়কে বুঝাবে বলেও নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ কর্র্তৃক ১৯৯১ সালের ১৮ আগস্ট জারি করা এক সার্কুলারে বর্ণিত নির্দেশনা অনুযায়ী এতদিন ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করতে পারত। তবে সেই নির্দেশনায় অনেক বিষয় বিস্তারিত না থাকায় ব্যাংকগুলো ইচ্ছেমতো সুদ মওকুফ শুরু করায় এ নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তহবিল ব্যয় মওকুফ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে শর্ত শিথিলের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে নিরীক্ষা করে হেড অব ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্সের মতামত নিতে বলা হয়েছে।

যেসব ঋণের ক্ষেত্রে আর্থিক বিবরণী প্রণয়নের আবশ্যকতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংককে আবশ্যিকভাবে ঋণগ্রহীতার বিগত তিন বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে সামষ্টিক করপরবর্তী নিট মুনাফা অথবা সবশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ইতিবাচক পরিলক্ষিত হলে সুদ মওকুফ করা যাবে না বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়।

সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক অবস্থার ওপর কীরূপ প্রভাব পড়বে তা পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের (১৯৯১) ২৮ ধারা পরিপালন নিশ্চিত করে অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং তার পরিবারের সদস্যবর্গ বা পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে এই নীতিমালাসহ সরকার কর্র্তৃক সময়ে সময়ে জারি করা সব নির্দেশনা পরিপালন করবে বলে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশেষ খাত বা সময়ের জন্য সুদ মওকুফ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা প্রদান করা হলে তাও পালন করতে বলা হয়েছে। এই নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি ব্যাংককে তার নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত