সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার সিদ্ধান্ত লিখিত হতে হবে

আপডেট : ০১ মে ২০২২, ০৯:১৫ এএম

পরিবেশ আইনবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী। প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশে পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এ জন্য তাকে ২০০৭ সালে পরিবেশ পদকে ভূষিত করে। ২০০৯ সালে তিনি পরিবেশবিষয়ক সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ‘গোল্ডম্যান পুরস্কার’ লাভ করেন। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের অন্যতম ‘এনভায়রনমেন্টাল হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সবশেষ এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আন্তর্জাতিক নারী সাহসিকা’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার আন্দোলন এবং ঢাকার উদ্যান-পার্ক-জলাশয়-উন্মুক্ত স্থানের সংকট ও প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন পরিবেশ আইনবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার দাবিতে আন্দোলনকারী সৈয়দা রত্না ও তার কিশোর ছেলে প্রিয়াংসুকে পুলিশ ধরে নিয়ে থানায় ১৩ ঘণ্টা আটকে রেখেছিল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনে এমন আটক, মুচলেকা নেওয়া ও হয়রানি বেআইনি এবং এটা সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিন এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : জাতীয় বলেন কিংবা আন্তর্জাতিক, কোনো সংস্থা বা ব্যক্তির এই ঘটনাকে বেআইনি হিসেবে বিবেচনা না করে অন্য কোনোভাবে দেখার সুযোগ নেই। কেউ কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকলে কিংবা কোনো অপরাধ করতে যাচ্ছেন এমন সন্দেহভাজন কাউকে ধরতে পারে। ধরে নিলেও পুলিশ তাকে লকআপে আটকে রাখতে পারে না। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। পুলিশের তো এখানে সন্দেহ করার কিছু ছিল না। কারণ পুলিশ প্রকাশ্যে একটা কাজ করছিল এবং সৈয়দা রত্নাও প্রকাশ্যে সেটার ভিডিও করছিলেন। পুলিশ একটা খেলার মাঠে দেয়াল তুলছিল। দেয়াল তোলার ভিডিও করায় তো নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া হয় না। পুলিশ তাকে ধরেছে গায়ের জোরে। এলাকাবাসীর মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে। আর সৈয়দা রত্না না হয় ভিডিও করছিলেন, তার ছেলে কী অপরাধ করেছিল, তাকেও কেন ধরা হলো? যে ছেলেটার বয়স আঠারোও হয়নি তাকেও লকআপে আটকে রাখা হলো। আর ১৩ ঘণ্টা আটকে রেখে যে মুচলেকা নেওয়া হলো, সেটা কীসের ভিত্তিতে। বলা হয়েছে তিনি আর কখনো মাঠরক্ষায় কোনো আন্দোলন করতে পারবেন না এই শর্তে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। এটা কোনো গণতান্ত্রিক দেশে কীভাবে সম্ভব? ফলে আমার বিবেচনায় পুলিশের এই পুরো কাজটাই, পুরো প্রক্রিয়াটাই বেআইনি। অবশ্যই এর তদন্ত ও বিচার হওয়া দরকার।

দেশ রূপান্তর : রাজধানীর কলাবাগানে তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার আন্দোলনে বিজয় এলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, সেখানে আর কোনো নির্মাণকাজ না করে যেভাবে ছিল সেভাবেই রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্দোলনকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে আপনারা স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন তেঁতুলতলা মাঠের জায়গাটি পুলিশের এবং তা পুলিশেরই থাকবে। তাহলে তেঁতুলতলা মাঠ খেলার মাঠ হিসেবে থাকছে কী?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : জায়গাটি খেলার মাঠ এবং উন্মুক্ত স্থান হিসেবেই রক্ষা পেতে হবে। এর আর অন্য কোনো বিকল্প নেই। কারণ এটা ইতিমধ্যেই ঢাকার খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) একটি উন্মুক্ত স্থান হিসেবেই চিহ্নিত। এই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত। এটা গেজেটের মাধ্যমেও প্রজ্ঞাপিত। আর পরবর্তীকালে তো আর কোনো গেজেট আসেনি যা দিয়ে আগের গেজেটকে বাতিল বলা যাবে। যেখানে গেজেট প্রকাশ করে, জায়গাটিকে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে দেখিয়ে বলা হয়েছে যে, কারও কোনো আপত্তি থাকলে ৬০ দিনের মধ্যে সেটা জানাতে হবে। সেই সময় তো কবেই পার হয়ে গেছে। পুলিশ তো কোনো আপত্তি উত্থাপন করেনি। তাহলে এই মাঠের জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। এটা হলো আইনগত দিক। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হলো, আমরা ১৯৮০ সালের নথিপত্রে দেখছি তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন এখানে শিশুপার্ক নির্মাণ করতে চেয়েছিল। তৃতীয়ত এখন সরকার প্রধান যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন যে, জায়গাটি এলাকাবাসী যেভাবে ব্যবহার করত সেভাবেই ব্যবহার করবে। এলাকাবাসী এই জায়গাকে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করার পাশাপাশি জানাজার নামাজ, ঈদের নামাজের স্থান এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির জন্য ব্যবহার করত। ফলে পুলিশের তো জায়গাটিকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করার আর কোনো সুযোগ নেই। 

দেশ রূপান্তর : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ২০১৭ সালের আবেদন সূত্রে পুলিশ জায়গাটি বরাদ্দ পেয়েছে। পুলিশ তাহলে এই জায়গা বরাদ্দ পেল কীভাবে? আর জায়গার মালিকানা পুলিশের কাছে থাকলে এই মাঠের আধুনিকায়ন বা মানোন্নয়নই বা কীভাবে হবে? আমরা দেখেছি সম্প্রতি ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশনেই বেশকিছু মাঠে ঘাস লাগিয়ে, চারদিকে গাছ লাগিয়ে মাঠগুলোকে এলাকাবাসীর ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে। আপনি কি মনে করেন যে এখানে একটা সংকট রয়ে যাচ্ছে?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে ২৭ কোটি টাকা দিয়ে এই জায়গা তারা কিনে নিয়েছেন। এটা খুবই অস্বস্তিকর একটা যুক্তি। তারা বলছেন পুলিশের পক্ষে জায়গাটি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের জমি সরকারের একটি সংস্থার প্রয়োজনে আরেকটি সংস্থা বন্দোবস্ত দিচ্ছে। এখানে অধিগ্রহণের বিষয়টি আসে কীভাবে? এটাতে আমার খটকা আছে। প্রশ্ন হচ্ছে এভাবে তারা কার টাকা কাকে দিচ্ছেন? এখন পুলিশ বলছে তাদের নামে নামজারি হয়ে গেছে। এখন এটা খেলার মাঠ হিসেবে থাকলেও কিন্তু সেটা সিটি করপোরেশন কিংবা এমন কোনো কর্তৃপক্ষের নামে থাকত, এলাকাবাসীর নামে তো আর হতো না। ফলে, জায়গাটি পুলিশের মালিকানায় থেকে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অধিকার এলাকাবাসীর থাকলে আমি বড় কোনো সমস্যা দেখি না। কিন্তু মুশকিল হলো, পুলিশ যদি জায়গাটি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, যে এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে গেলে তাদের অনুমতি লাগবে, তখন একটা সমস্যা তৈরি হবে। কেননা তখন আর সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তটি যথাযথভাবে কার্যকর থাকছে না। ফলে এখন যেটা প্রয়োজন সেটা হলো, জায়গাটিকে পুরোপুরি এলাকাবাসীর ব্যবহারের এখতিয়ারের মধ্যে রাখার বিষয়ে সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তটিকে একটা আনুষ্ঠানিক লিখিত রূপ দেওয়া। কারণ এর আগেও এখানে একাধিকবার পার্ক, খেলার মাঠ বানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপিত হয়েছিল। পরে সেগুলো টেকেনি। আবার এখন যিনি আছেন তিনিই তো সবসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন না। সরকারও বদলাতে পারে। এসব কারণেই খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান হিসেবে জায়গাটিকে রক্ষার জন্য লিখিত নথিপত্র জরুরি।   

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনেছি, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠ নেই। প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০টি ওয়ার্ড এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ড মাঠশূন্য। অন্য ওয়ার্ডগুলোতে খেলার মাঠ থাকলেও সব মাঠ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের একটা মহানগরে এই পরিস্থিতি ঢাকাকে বসবাসের আরও অযোগ্য করে তুলছে। এই অবস্থা কীভাবে পাল্টাতে পারে বলে মনে করেন?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই এই পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে। কিন্তু মাঠ রক্ষা এবং উন্মুক্ত স্থান রক্ষা, জলাশয় রক্ষা তথা পরিবেশ রক্ষা সরকারের কোনো অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে বলে আমি মনে করি না। সরকারের পরিবেশ প্রশাসন যেভাবে চলছে তাতে আমার মনে হয়, বলতে হয় বলেই কেবল তারা পরিবেশ রক্ষার কথা বলেন। বর্তমান সংকট থেকে বেরুতে গেলে যতগুলো খেলার মাঠ-উন্মুক্ত স্থান আছে আগে সেগুলো চিহ্নিত করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এবং এই ধরনের মাঠ ও খোলা জায়গাগুলো ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এলাকাবাসীকেই দিতে হবে। সিটি করপোরেশন, রাজউক বা পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট তারা কেবল তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকতে পারেন। আর যেসব এলাকায় মাঠ বা খোলা জায়গা নেই সেখানে সরকারের পরিত্যক্ত বা পতিত জমিগুলো কেবল বিভিন্ন সরকারি দপ্তরকে বরাদ্দ না দিয়ে শিশুদের খেলাধুলা, বয়স্কদের হাঁটাচলা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের জন্য দিতে হবে। কারণ সরকারি দপ্তর যেমন দরকারি তেমনি শিশুদের বিকাশ ও জনসাধারণের নাগরিক অধিকারগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশ রূপান্তর : আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের যেসব কমিউনিটি সেন্টার রয়েছে সেগুলোর বেশ কয়েকটিই এখন র‌্যাব কিংবা পুলিশের ক্যাম্প বা কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ সেখানে নাগরিকদের সামাজিক সম্মিলন বা অনুষ্ঠানাদির জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : অত্যন্ত নেতিবাচক হিসেবে দেখি। কেননা, কতগুলো স্পেস আছে পাবলিক স্পেস, কতগুলো স্পেস আছে কমিউনিটি স্পেস। সেসব স্থানে তো আগ্রাসন বা কোনো ইনভেশন কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিতেই ঢাকা মহানগরে এমন স্পেসের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তার ওপর বিদ্যমান স্পেসগুলোও যদি বিভিন্ন বাহিনীর প্রয়োজনে ছেড়ে দিতে হয় তাহলে এই মহানগরের নাগরিক সমাজ টিকবে কী করে? আমাদের শিশুরা কোথায় যাবে? আমরা কোথায় যাব? আমাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না করে তো তারা এসব স্থান নিজেদের জন্য নিতে পারেন না।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : দেশ রূপান্তর এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত