এক এক সময় সত্যিই গর্ব হয়, কলকাতায় জন্মেছি, বড় হয়েছি বলে। আমি আদ্যন্ত ক্যালকাটান। সত্যজিৎ রায় এক ইন্টারভিউয়ে বলেছিলেন যে পৃথিবীর অনেক শহরের মতো ঐশ্বর্য হয়তো নেই, তবু কলকাতা না দেখলে আপনার জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এ শহরে হাঁটতে হাঁটতে আমি অহংকার নিয়ে ভাবতে থাকি, এ এমন এক শহর যেখানে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, রাজেন তরফদার বিশ্ব চলচ্চিত্রকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আর একজনের নাম লিখিনি। কিন্তু তিনিই আজ আমার লেখার বিষয়। তিনি নিঃসন্দেহে ভারতীয় সিনেমার নতুন ধারার আর এক পথিকৃৎ। ঠিক ধরেছেন তিনি মৃণাল সেন। আর এক বছর পরই মৃণাল সেনের একশো বছর হবে। জিনিয়াস সিনেমা নির্মাতাদের শহরে আমিও একটু-আধটু ছবি করি বলা দূরে থাক, ভাবতেও এ বয়সেও কেমন সংকোচ হয়। তবুও হালে খুব মনে হচ্ছে মৃণাল সেনকে নিয়ে একটা ছবি বানালে বেশ হয়।
হয়তো এ মুহূর্তে শহর কলকাতায় সত্যজিৎ রায়কেন্দ্রিক একটি অসম্ভব ভালো সিনেমা চলছে বলেই আরও মনে হচ্ছে মৃণাল সেনকে নিয়েও কিছু একটা হোক। নিজে ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকার বলে আমার শ্রদ্ধা জানানোর ভাষা ডকুমেন্টারি করেই জানাব। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করেন, বিশাল মাপের মৃণাল সেনের কোন দিক নিয়ে ছবি বানাতে চান! এটা তো ঠিক যে বিশাল ওই মহিরুহের সবদিকে আলো ফেলা কঠিন। আমি অন্তত পারব না। আমি যদি ছবি করি তাহলে ছবি পরিচালনা করার জন্য মৃণাল সেনের ছটফটানি, উদ্বেগ, যন্ত্রণা নিয়ে কাজ করতে চাই। কথাটা শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে। তবুও বলি, সত্যজিৎ রায়ের বাবা ছিলেন রবীন্দ্র স্নেহধন্য সুকুমার রায়, ঠাকুরদা স্বনামধন্য উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ঋত্বিক ঘটকের বাবা বিশিষ্ট সাহিত্যিক মনীশ ঘটক, যুবনাশ্ব। তপন সিংহ পরিবারের যোগ ছিল জমিদার লর্ড সিংহদের। এসব অভিজাত, নীল রক্তের লোকদের মধ্যে বকযথা একমাত্র মৃণাল সেন।
কমবেশি অনেকেই জানেন মৃণাল সেনের সিনেমাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার গল্পটি। মৃণাল সেন তখন কোনো এক ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান হয়ে মধ্যপ্রদেশের ঝাঁসী না ঝিন্দ কোথায় যেন ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এক মাঠের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। নিভন্ত দুপুর। চারপাশের গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য অস্ত যাওয়ার দৃশ্য তরুণ মৃণালকে মোহিত করে দিল। বিশাল প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে মৃণাল সেনের মনে হলো সিনেমা না করে তিনি বাঁচতে পারবেন না।
চাকরি-বাকরি ছেড়ে হারা উদ্দেশ্যে মৃণাল সটান কলকাতা চলে এলেন। তারপর নানা বন্ধুর পথ পেরিয়ে মৃণাল সেন হয়ে ওঠাই তো হতে পারে এক ছবি। আমি শুধু ভাবছি তখন ডিজিটাল যুগ নয়, তাও কীভাবে অসাধারণ এক একটি ছবি তিনি বানিয়েছেন। নীল আকাশের নিচে, কোরাস, কলকাতা-৭১, পদাতিক, মৃগয়া, ভুবন সোম, পরশুরাম, আকালের সন্ধানে আরও কত কত গদ্য কবিতা সেলুলয়ডে লিখে গেছেন মৃণাল সেন।
সামান্য টাকার জন্য কীভাবে হাত পাততে হয়, অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় তা পরিচালক মাত্রই জানেন। মৃণালদা ষাট-সত্তর দশকে যে ধারার ছবি বানিয়েছে, আন্দাজ করতে পারি কতটা যন্ত্রণা ওকে সহ্য করতে হয়েছিল। বিশিষ্ট ভাস্কর সোমনাথ হোর তিতাল্লিশের মন্বন্তর নিয়ে অনন্যসাধারণ এক সিরিজ করেছিলেন। উন্ড, বাংলায় ক্ষত। খুব ইচ্ছে করে মৃণাল সেনের কষ্ট-যন্ত্রণা নিয়ে ছবি করার। তবে সে ছবির সিংহভাগই আমি ক্যামেরায় ধরব গীতা সেনকে। অভিনেতা গীতা সেন ও মৃণাল সেনের সবচেয়ে কাছেরজন গীতা সেনকে। একদা যিনি ছিলেন সোম। পরে গীতা সেন না থাকলে নিশ্চিত মৃণাল সেনের মৃণাল সেন হয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। সোমনাথ হোরের কাছ থেকে নাম ধার নেব ছবির। উন্ড, ক্ষত। মৃণাল সেন কীভাবে মৃণালদা হয়ে উঠলেন সে কাহিনী না শুনিয়ে পারছি না। একটু নিজের ঢাক পেটানো মনে হতে পারে। মাফ করবেন। এ গল্প আগেও যেন কোথাও বলেছি। ঠিক মনে করতে পারছি না। যদি আগে কেউ পড়ে থাকেন, তাহলে ওই অংশ বাদ দিয়ে পড়বেন। যারা জানেন না তাদের ঘটনাটা বলি।
তখন দুই হাজার দুই সালে গুজরাট গণহত্যা নিয়ে ডকুমেন্টারি করে বেশ আচমকা মিডিয়ার আলো পাচ্ছি। এখানে-সেখানে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছি। এমন সময় আমাদের এক দাদা, বন্ধু অধৃষ্য কুমার ফোন করে বললেন কাল অবশ্য অবশ্য আমার বাড়ি চলে এসো। মৃণাল সেন তোমার ছবি দেখতে চান বলে আমাদের বাড়ি আসছেন।
আমি তো সে রাতে না ঘুমিয়েই কাটালাম। পরের দিন ভয়ে ভয়ে গিয়ে দেখি যে সময় বলা হয়েছিল, ধরে নিন দুপুর তিনটে। মৃণাল সেন কাঁটায় কাঁটায় তিনটেয় পৌঁছে গেছেন। আমি পাঁচ মিনিট লেট। অনেক দূর থেকে বাসে আসতে দেরি। মৃণাল সেন আমাদের, আমার দিকে তাকিয়ে ঘড়ি দেখলেন। এরপর থেকে চেষ্টা করেছি সব জায়গায় ঠিক সময়ে যেতে। তখন ভিসিপি, ক্যাসেটের যুগ। অধৃষ্যদা টিভি টিভি সব সেট করে মৃণালদার দিকে তাকালেন। বৌদি জিজ্ঞেস করলেন দাদা চা খাবেন! মৃণাল দা গম্ভীর মুখে বললেন, আগে দেখে নিই। তারপর ছোটখাটো আধশোয়া হয়ে অধৃষ্যদাকে চালাতে ইশারা করলেন। অন্ধকার ঘর। ছোট ছবি। কুড়ি মিনিটের। তবুও শেষ যেন হতে চায় না। বুকের ভেতরে কে যেন হাতুড়ি পিটছে।
একসময় ছবি শেষ হলো। ঘরের আলো জ্বলে উঠল। মৃণাল সেন হাসি মুখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মুহূর্তে এক অসাধারণের সঙ্গে অতি সাধারণের ভাব হয়ে গেল। তিনি হয়ে গেলেন আপনজন, আমার মৃণাল দা। আজও মন খারাপ হলে বুকের ভেতরে মৃণালদার গভীর আলিঙ্গন অনুভব করি। এখন কিস্যু না করেও কত লোককে বারফট্টাই করতে দেখি, অথচ অত বিশাল উচ্চতার মৃণালদা ছিলেন কত সাধারণ।
কাগজে লেখা বের হয়েছে। রাতে মৃণালদা ফোন করেছেন। কত কথা মনে পড়ে। একবার ল্যান্সডাউন, পদ্মপুকুরের ফ্ল্যাটে গেছি, বসতে বলেই মৃণালদা হাঁক পাড়লেন, কৈ গো সৌমিত্রকে চা দাও। সঙ্গে কীসব ভাজলে তাও দু-একটা দাও। কিছু বলার আগেই মৃণালদা ফিসফিসিয়ে বললেন, তোমার নাম করে আমিও খাব। তোমার কথা না বললে গীতা আমাকে দেবে না। দু-মিনিট আগে আমি খেয়েছি। ওই সময় মৃণালদার ছেলেমানুষি দুষ্টু দুষ্টু হাসি কোনো দিনই ভুলব না।
কলকাতা নিয়ে মৃণাল সেনের মতো প্যাশন নিয়ে তার সমসাময়িক খুব কম পরিচালক ছবি করেছেন। বিদেশি তিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিচালক জ্যাঁ রেনোয়া, লুই মাল, পল কক্স’কে মনে রেখেও বলছি এই শহরের চিত্রকল্প খুঁজতে আপনাকে অবশ্যই মৃণাল সেনের সিনেমা দেখতে হবে। কলকাতার স্পিরিট উঠে আসে মৃণালদার একাধিক ছবিতে, যা নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে থাকল। সত্তরের অগ্নিগর্ভ সময়ে দলিল মৃণাল সেনের ছবিতে যেভাবে আজও রয়ে গেছে তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। বামপন্থি যে আখ্যানের গল্পগাথা মৃণাল সেন শুনিয়ে গেছেন, আজকের ভারতে চরম দক্ষিণ পন্থার কালে নতুন করে তা বিনির্মাণের প্রয়োজন আছে।
