করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড টুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপরনাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনিঝিনি পায়ে নূপুরের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি।
বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশন যাত্রা শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন জনগণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকে আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বড় অংশই বহন করছে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো।
নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারণে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারি বিমান সংস্থাসমূহ প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর সাথে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল অ্যাভিয়েশন অথোরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন প্রমুখ।
কোভিডকালীন সময় ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছিল প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫ বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল প্রাইসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। যে রেকর্ড একটি খাতকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়।
বাংলাদেশি এয়ারলাইনসকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সকল বিদেশি এয়ারলাইন এর সাথে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার ওপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইনস চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দর সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইনস- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেষ্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের ঊর্ধ্বগতির সাথে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারণে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। যার ফলে বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশন ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিল সাথে বেসরকারি বিনিয়োগে নিরুৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিল অ্যাভিয়েশন খাতে।
কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইনসগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিল অ্যাভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার ওপর বর্তায়।
এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারত্ব রয়েছে অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড টুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে।
সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা অ্যাভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সাথে টুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সকল ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সকল শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে অ্যাভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলে সেই দিকে সচেতন হলে অ্যাভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে।
জেট ফুয়েল প্রাইস সহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে দেশের অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমুখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।
লেখক: মো. কামরুল ইসলাম. মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ), ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।
