বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পেটের প্রদাহজনিত রোগ বা আইবিডি (ইনফ্লেমেটরি বাওয়েল ডিজিজ) ক্লিনিকে আসা রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট রোগীর ৬০ শতাংশ পুরুষ ও ৪০ শতাংশ নারী। রোগীদের প্রায় সবাই ২০-৪৫ বছর বয়সী। অর্থাৎ তরুণদের মধ্যে রোগটির প্রকোপ বেশি। তবে একেবারে কম বয়স থেকে শুরু করে ৯০ বছর বয়সীদেরও এ রোগ হতে পারে। শহরের লোকজনের মধ্যে রোগটির প্রকোপ একটু বেশি হলেও গ্রাম ও শহরের মানুষের মধ্যেই এ রোগের প্রবণতা কাছাকাছি। শ্রেণি বিবেচনায় গরিব ও ধনী রোগী সমান।
এমন তথ্য জানিয়ে আইবিডি ক্লিনিকের সমন্বয়কারী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য চিকিৎসক ও ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ২০১৭ সাল থেকে ক্লিনিকটি পরিচালনা করছি। পেটের প্রদাহজনিত রোগ বা আইবিডি বলতে দুটি আলাদা রোগ আলসারেটিভ কোলাইটিস ও ক্রোনস ডিজিজকে বোঝায়। এই পাঁচ বছরে ৬১৭ জন রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৯০ জন ক্রোনস ডিজিজ ও ৩২৭ জন আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগী রয়েছেন।’
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘ক্রোনস ডিজিজ সঠিক সময়ে নির্ণয় না হলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা যায়। অনেক সময় খাদ্যনালি সরু হয়ে যায়। এমনকি খাদ্যনালি বন্ধ পর্যন্ত হতে পারে। এ সময় রোগীর বমি বেশি হয় এবং শরীর শুকিয়ে যায়। অন্যদিকে আলসারেটিভ কোলাইটিস দীর্ঘদিন ধরে চললে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।’
আইবিডি রোগ কী: অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ জানান, ইনফ্লেমেটরি বাওয়েল ডিজিজ বা আইবিডি হলো পেটের প্রদাহজনিত রোগ। এতে প্রথমে খাদ্যনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। প্রদাহ বেশিদিন হলে তার থেকে ক্ষত দেখা দেয়। আইবিডির প্রধান দুটি ধরন হলো ক্রোনস ডিজিজ ও আলসারেটিভ কোলাইটিস। ক্রনোস ডিজিজ মুখ থেকে পায়ুপথের যেকোনো স্থানে হতে পারে। ক্রনোস ডিজিজ হলে সাধারণত রোগীর পেটে ব্যথা করে ও ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হয়। অনেক সময় অনেক দিন পাতলা পায়খানা ও পেটের ব্যথায় ভুগতে হতে পারে। পাশাপাশি ওজন কমতে থাকে এবং ক্ষুধামন্দা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে আলসারেটিভ কোলাইটিস হলে পাতলা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়। অর্থাৎ রক্তযুক্ত পাতলা পায়খানা হয়। এছাড়া পায়খানার রাস্তায় চুলকাতে পারে, ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। এ রোগ সাধারণত কমবয়সীদের বেশি হয়।
তিনি বলেন, রোগটি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো কখনো নিরাময় হয় না। তবে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেলে এবং কিছু নিয়ম মেনে চললে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এখনো ভুল চিকিৎসা : অধ্যাপক ডা. চঞ্চল বলেন, ‘আইবিডি রোগের দুটো ধরনেরই ভুল চিকিৎসা করা হতো। অন্ত্রের (পাকস্থলী থেকে পায়ু পর্যন্ত লম্বা প্যাঁচানো নালি) বা পেটের টিবি হিসেবে ডায়াগনসিস হতো এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হতো। এখন সেটা ক্রোনস ডিজিজ হিসেবে ডায়াগনসিস হচ্ছে। আর যেগুলো রক্ত আমাশয় হিসেবে চিকিৎসা করা হতো, স্থানীয় চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক দিতেন, সেগুলো আলসারেটিভ কোলাইটিস হিসেবে ধরা পড়ছে। একটা পুরাতন আমাশয় হিসেবে, অন্যটা অন্ত্রের টিবি বলা হতো। আসলে রোগ দুটি যে পেটের প্রদাহজনিত রোগ, সেটা জানা ছিল না। এখনো অনেক চিকিৎসক যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, তারা ভুল চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
দেশে রোগটি দিন দিন বাড়ছে : বিএসএমএমইউর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, আইবিডি রোগীর সংখ্যা ভারতে ও বাংলাদেশে প্রায় একই। তবে বাংলাদেশে রোগটি দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ক্রোনস ডিজিজটা বাড়ছে। বাড়ার কারণ হলো দেশের মানুষ চালচলন ও খাওয়া-দাওয়ায় পাশ্চাত্য ধাঁচের হয়ে যাচ্ছে, ফাস্টফুডের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, শারীরিক শ্রম কম হচ্ছে। জীবনযাপনে বিশৃঙ্খলা, ধূমপান একটি বড় ফ্যাক্টর। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার। অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথার ওষুধের বেশি ব্যবহারের কারণে এ রোগটি বেশি হয়। তবে যাদের জেনেটিক মিউটেশন আছে, তাদের সঙ্গে এসব পরিবেশগত ফ্যাক্টর থাকে, তাদের আইবিডি রোগ হবে।
সতর্ক থাকতে হবে : অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ বলেন, ‘রোগটি যদি দ্রুত শনাক্ত করা যায়, তাহলে এ রোগের চিকিৎসা আছে। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভালো হয় না, নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে যদি কারও রক্ত আমাশয়ের মতো উপসর্গ হয়, অথবা দীর্ঘদিন ধরে পাতলা পায়খানা হয় ও পেটে ব্যথা থাকে, ওজন কমে যায়, সে ক্ষেত্রে দেরি না করে হয় গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টকে দেখাতে হবে। রোগটি শনাক্ত করে চিকিৎসা নিলে রোগীর যেসব জটিলতা হয়, যেমন নাড়ি ফুলে যায়, গিড়ায় ব্যথা ও গিড়া ফুলে যাওয়া, চোখে ব্যথা ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চামড়ায় প্রদাহ বা ঘা, নাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়া ও ফুলে ওঠা, শেষ পর্যন্ত তার ক্যানসার এগুলো থেকে মুক্তি পেতে পারেন।’
আইবিডি ক্লিনিকে আসুন : এ ধরনের রোগীদের বিএসএমএমইউর আইবিডি ক্লিনিকে আসার পরামর্শ দিয়েছেন ক্লিনিকের সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ। তিনি বলেন, ‘প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা থাকে। প্রতি বৃহস্পতিবারে ৩০-৩৫ জন রোগী আসেন। তাদের থেকে রোগের ইতিহাস নেওয়ার পর ডায়াগনসিস করা হয়। আমরা একটা বুকলেটও করেছি, বই দিই। চিকিৎসা দিই। প্রয়োজনে রোগীকে ভর্তি করে চিকিৎসা করি। দরিদ্রদের জন্য একটা ফান্ড আছে, সেখান থেকে সহযোগিতা করা হয়।’
আজ বিশ্ব আইবিডি দিবস : দিবসটি উপলক্ষে বিএসএমএমইউ সেমিনার ও শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আইবিডি ক্লিনিকের কো-অর্ডিনেটর ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ এবং সেমিনারটির সভাপতিত্ব করবেন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আনওয়ারুল কবীর।
