নানা কঠোর সাজার বিধান থাকার পরও সমাজ থেকে পুরোপুরি অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কেননা এটা কেবল আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নয়, বরং সমাজ থেকে নানারকম বৈষম্যসহ অপরাধের কারণগুলো দূর করতে না পারাই অপরাধ নির্মূলের বড় অন্তরায়। তাই দেখা যায়, মৃত্যুদন্ডের মতো সর্বোচ্চ সাজার বিধান থাকা সত্ত্বেও মানুষ এই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেই যাচ্ছে। এসব কারণে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিশ্বজুড়েই আলোচনা ও তর্কের শেষ নেই। কারও মতে, গুরুতর অপরাধ দমনে এটি বিচারের স্বীকৃত পদ্ধতি এবং সমীচীন। আবার অনেকের মতে, মৃত্যুদণ্ড একধরনের পাশবিকতা ও নিষ্ঠুরতা। মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অনেকের যুক্তি, যেসব দেশে এই দণ্ডের বিধান রয়েছে কিংবা এটা কার্যকর করা হয়, সেসব দেশে হত্যাসহ গুরুতর অপরাধ অন্য দেশের চেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ১০৮টি দেশ মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে। ৫৬টি দেশে মৃত্যুদণ্ডের সাজা রয়েছে। আর ২৮টি দেশে মৃত্যুদণ্ডের আইন থাকলেও অনেক দেশ এই দণ্ড খুব বেশি প্রয়োগ করে না। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশে মৃত্যুদন্ড রদের পথ কত দূরে?
দেশ রূপান্তরে গত তিন দিন ‘কেন এত বেশি মৃত্যুদণ্ড’, ‘৮৬ শতাংশ মৃত্যুদন্ডই টেকেনি হাইকোর্টে’ ও ‘প্রাণদণ্ডের পক্ষে-বিপক্ষে’ শিরোনামে ধারাবাহিক তিনটি প্রতিবেদনে দেশে মৃত্যুদন্ডের সাজাপ্রদান, মৃত্যুদন্ডাদেশ বাতিল এবং মৃত্যুদন্ড কার্যকরের হারসহ আনুষঙ্গিক নানা সংকটের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনগুলোতে একইসঙ্গে বৈশি^ক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে দেশের পরিস্থিতির নানা তুলনাও উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, করোনা মহামারীর মধ্যেই গত বছর দেশের আদালতে অন্তত ১৮১ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ তথ্য দিয়ে বলেছে, ভারত ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড হয়েছে বাংলাদেশে। আর দেশ রূপান্তর সাম্প্রতিক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছে, গত ৬ মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে বিচারিক আদালতে ১৬২ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, বিচারের ক্ষেত্রে তদন্তের ত্রুটি, মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরাধের বিষয়ে কিছু ক্ষেত্রে বিচারিক দক্ষতার ঘাটতি, মামলাজটের কারণে সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণের ঘাটতি, সন্দেহজনিত সুবিধার (বেনিফিট অব ডাউট) বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে আমলে না নেওয়া, আর উচ্চ আদালতের ওপর নির্ভরশীল হওয়াও দেশে বেশি মৃত্যুদণ্ডের কারণ।
তবে খেয়াল করার মতো বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর হয় কম। গত বছরের মধ্য জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ ও ব্লাস্টের উদ্যোগে পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলা হয়, বাংলাদেশে ১৯৯১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ৩৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে খুন, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, মাদক কারবার, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডাকাতিসহ হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন আইনের ৩৩টি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে মুশকিল হলো একবার মৃত্যুদন্ডের রায় হয়ে গেলে ডেথ রেফারেন্সের মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লেগে যায় বহু বছর। অন্যদিকে, রায়ের পর মৃত্যুদন্ডের আসামিদের বছরের পর বছর ধরে কনডেমড সেলে থাকতে হয়। কারা কর্র্তৃপক্ষের তথ্য মতে, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগারের কনডেমড সেলগুলোতে প্রায় দুই হাজার বন্দি ছিল। আইনবিদরা বলছেন, ফৌজদারি, দন্ডবিধি বা অন্য আইনে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে কনডেমড সেলে রাখার কোনো বিধান নেই, এটি করা হয় কারাবিধি অনুযায়ী। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত কারাবিধি কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট। দেখা যাচ্ছে, কেবল মৃত্যুদন্ডের রায় বেশি হওয়াই নয়, দেশে এমন দন্ডপ্রাপ্তরা নানা জটিলতায় চরম দুর্ভোগেরও শিকার হচ্ছে। এই অবস্থায়, নিম্ন আদালতে মৃত্যুদন্ডের হার কমিয়ে আনা এবং কারাবিধিসহ অন্যান্য জটিলতায় দন্ডপ্রাপ্তদের দুর্ভোগ কমিয়ে আনার আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।
মৃত্যুদন্ড বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ ও ব্লাস্টের গবেষণা প্রতিবেদনটি বিশেষভাবে আমলে নেওয়া দরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে দেশে মৃত্যুদন্ডের রায় এবং তা কার্যকরের হার বেড়েছে। খেয়াল করা দরকার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের ৭১ দশমিক ৭৯ শতাংশ দরিদ্র। ৫৬ শতাংশ মাধ্যমিকের গন্ডি পার হননি। ১৫ শতাংশের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নেই। এই চিত্র থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই যে, দরিদ্ররাই বেশি মারাত্মক অপরাধপ্রবণ। কেননা দেখা যাচ্ছে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আইনজীবী নিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে এই দরিদ্ররা ধনীদের সমান সুযোগ পায় না। এই সংকটের সুরাহা জরুরি। সর্বোপরি এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, বিচার করা হয় মানুষকে সংশোধনের জন্য। মৃত্যুদন্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে সেই সংশোধনের সুযোগও আর থাকে না। তাই মৃত্যুদন্ডের বাইরেও শাস্তি ও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই কারণে কারাগারগুলোকেও প্রকৃত সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তোলায় সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবেই হয়তো দেশ ধীরে ধীরে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
