নজরদারিতে দেড়শ চাল ব্যবসায়ী

আপডেট : ০৫ জুন ২০২২, ০৩:২৬ এএম

ভরা মৌসুমে চালের দাম কেন বেড়ে গেছে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে বলেছে মন্ত্রিসভা। গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তও আসে। এরপরই চালের বাজারে অভিযান শুরু হয়। এই অভিযান আরও জোরালো হবে খাদ্যমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর গ্রেপ্তার অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিত এই অভিযানের আগে জড়িতদের নামের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকায় অন্তত দেড়শ প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে।

এদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অভিযান শুরু করবে এমন খবর পেয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। নিজেদের রক্ষা করতে তারা তদবির শুরু করেছেন। পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিকায় যাদের নাম আছে তাদের অবস্থান ঢাকা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জেলায়। তারা সিন্ডিকেট করে চালের বাজার অস্থির করে তুলেছেন। চাপে পড়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা দাম কমাতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালাচ্ছেন। এমনকি নতুন দরে চাল কেনার রসিদের কপি সংগ্রহ করারও চেষ্টা চালাচ্ছেন। অনেকে আবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় এক মাস ধরে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা চলছে। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে কিছু ব্যবসায়ী দেশজুড়ে সিন্ডিকেট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে ফায়দা লুটছেন। সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশে সিন্ডিকেটে জড়িত প্রভাবশালী অসাধু ব্যবসায়ীদের তালিকা করা হয়েছে। আপাতত দেড়শ জনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের নজরদারি করতে জেলা পুলিশের মাধ্যমে প্রতিটি থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া র‌্যাবসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকেও জানানো হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভোক্তা অধিকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যেকোনো সময় অভিযান শুরু করবে।

র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধ মজুদদারদের নজরদারিতে রেখেছে র‌্যাব। সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে র‌্যাবের কয়েকটি অভিযান হয়েছে। এসব অভিযানে মজুদদারদের জরিমানার আওতায় আনা রয়েছে। এ ধরনের অভিযান র‌্যাবের পক্ষ থেকে অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, রসিদ পরিবর্তনের কিছু কিছু অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো খাতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী যদি রসিদ পরিবর্তন করেন এবং তা র‌্যাবের নজরে আসে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে চালের বাজারের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা হয়। বোরোর ভরা মৌসুমে চালের দাম কেন বেড়েছে, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন মঙ্গলবার থেকে অভিযান শুরু হয়। অভিযানের সময় কোথাও কোথাও দোকান বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যান। গত বুধবার ঢাকাসহ সারা দেশে চালের বাজারে অভিযান শুরু করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন। ওই দিন সারা দেশে অবৈধভাবে মজুদ করে রাখা ৪০ হাজার টন ধান-চাল পাওয়া যায়। ওই দিন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ছয়টি প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে চাল কিনে প্যাকেটজাত করে বিক্রির কারণে দাম বেড়েছে। বাজার থেকে চাল কিনে প্যাকেটজাত করে বিক্রি নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করার ইঙ্গিত দেন তিনি। পরদিন খাদ্যমন্ত্রী অভিযান জোরদার করার কথা বলেন। একই দিন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি  জসিম উদ্দিন চাল মজুদদারির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযানে সমর্থন জানান।

গত শুক্রবার রাজধানীতে চালের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে অভিযানে নামে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ খবর বাজারে ছড়িয়ে পড়ার পর চালের আড়ত বন্ধ করে মুহূর্তেই উধাও হয়ে যান ব্যবসায়ীরা। তবে অভিযান পরিচালনকারী দল বাজার ছাড়ার পরপরই তারা ফিরে এসে ফের আগের মতো বাড়তি দামেই চাল বিক্রি শুরু করেন। আবার অনেকে গতকাল দোকান বন্ধ রেখেছেন। অনেকে ছুটছেন তাদের সংগঠনের নেতাদের কাছে। তদবির চালাচ্ছেন অভিযান বন্ধ করতে। পাশাপাশি পুলিশ বা র‌্যাব যাতে বড় ধরনের কোনো অভিযান না চালায়, সে জন্যও সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর উত্তরা, কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ব্যবসায়ীরা কয়েকটি কোম্পানি থেকে দাদন হিসেবে আগাম টাকা নিয়েছেন। সেই টাকায় চাল মজুদ করেছেন। কোম্পানিগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী, তাদের কাছে আসা চালগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওই সব কোম্পানিকে দিতে হবে। সেটা করতে গিয়ে খুচরা বাজারে তারা চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দাদনের টাকা পরিশোধের চাপ রয়েছে। হয় চাল দাও, না হলে টাকা ফেরত দাও এই ফাঁদে আটকা পড়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।

কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানান, সিন্ডিকেট করে যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে বিশেষ নির্দেশনা এসেছে। এ নিয়ে তারা কাজ করছেন। সিন্ডিকেটের তথ্য সংগ্রহ করতে থানা পুলিশকে বলা হয়েছে। তা ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও এ নিয়ে কাজ করছেন। তারা আরও বলেন, অভিযানের নির্দেশনা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নামবেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত