আসছে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে আমদানির ওপর বেশি করে শুল্ক-কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটবে, সুরক্ষা পাবে স্থানীয় শিল্প। সেখানে যারা কাজ করছে তাদের আয় বাড়ারও সুযোগ হবে। নতুন করে কর্মসংস্থান হবে অনেকের। এতেও দেশের মানুষের জীবনের কল্যাণ বয়ে আনবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া করপোরেট কর কমানোর পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর ও উৎসে করেও কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। ব্যবসাবান্ধব এ বাজেটে পরোক্ষ সুফল পাবেন সাধারণ মানুষও। সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যপণ্যের সংস্থানও করা হয়েছে।
বাজেটে ব্যাংকে অল্প টাকা আছে এমন আমানতধারীদের জন্য আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়নি। তবে ৫ কোটি টাকার বেশি আমানতধারীদের গুনতে হবে বাড়তি ১০ হাজার টাকা। আগে এ ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক ছিল ৪০ হাজার টাকা। এতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ীরা কিছুটা স্বস্তিকর জায়গায় রয়েছেন। এ ছাড়া মুড়ি ও চিনির ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়ায় এ দুটি প্যাকেটজাত পণ্যে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। অবশ্য এসব পণ্য খোলাও বিক্রি হয়। ফলে সাধারণ মানুষ এতে খুব বেশি উপকার দেখছেন না।
বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষদের জন্য সুখবর রয়েছে। হুইলচেয়ার আমদানির বিদ্যামন সব ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে। এ ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পড়ালেখার উপকরণ ব্রেইল মুদ্রণের ওপর ভ্যাট বাদ দেওয়া হচ্ছে। শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের শ্রবণযন্ত্রের ব্যাটারির খরচও কমবে।
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করে কিছুটা স্বস্তি পাবেন মানুষ। এখন কর্মব্যস্ত জীবনে অনেক মানুষকেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টে খেতে হয়। অনেক সময় জরুরি আলাপের জন্যও মানুষ রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন। পারিবারিক অনেক অনুষ্ঠানও এ ধরনের রেস্টুরেন্টে হচ্ছে। এবারের বাজেটে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়ার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয় এমন রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়ার ওপর আগের মতোই ৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করেন তিনি।
এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী পাইকারি ব্যবসা পর্যায়ে ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ, নিবন্ধিত হাঁস-মুরগির খামারের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে আগাম প্রত্যাহার, পশুখাদ্য আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখার পাশাপাশি ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। পাওয়ার টিলার উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মুসক অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। পোলট্রি, ডেইরি ও ফিশ ফিড পণ্যসমূহের উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মুসক অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
দেশের মানুষের আমিষের একটি বড় উৎস বর্তমানে পোলট্রি শিল্প। মুরগির খাদ্য প্রস্তুতের জন্য গমের ভুসি আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। এখন থেকে এই শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে গো-খাদ্য তৈরির সুগারকেন মোলাসেস (চিটা গুড়) আমদানির শুল্ক ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে পোলট্রি মুরগি ও গরুর মাংসের দাম কমে আসবে।
দুই ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতির আমদানিতেও রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে কৃষির উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য সংরক্ষণের খরচ কমাতে হিমাগারের ফ্রিজার ও চিলার আমদানিতে করছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। কীটনাশক প্রস্তুতে ব্যবহৃত কাঁচামালের বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাজেটে এসব প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। এ প্রস্তাবনাগুলো যেমন সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব পড়বে, তেমনি বেশ কিছু জায়গায় শুল্ক-কর বাড়ানো হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সচ্ছল মানুষের ব্যয় বাড়বে।
এবার বাজেটে আমদানি-বিকল্প স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য অর্থমন্ত্রী বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, মোটরসাইকেলসহ অনেক ধরনের পণ্যের বাজার বাড়াতে একই ধরনের পণ্য আমদানির ওপর বেশি করে শুল্ক-কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়ে আগামী বাজেটে তেমন কোনো কিছু অর্থমন্ত্রী তুলে ধরতে পারেননি। আয় বাড়ানোর কোনো কিছু নেই। কর্মসংস্থান বাড়বে না। এর মধ্যে আমদানি করা অনেক পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কিছু জিনিসপত্রের দাম কমবে। তবে বাড়বে বেশি।’ সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির বাজারে আসন্ন বাজেটে গরিব মানুষের ব্যয় নির্বাহের জুতসই কোনো উপায় অর্থমন্ত্রী তুলে ধরতে পেরেছেন বলে মনে করেন না এই অর্থনীতিবিদ।
