সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে ভুলভাবে উপস্থাপন কিংবা বক্তব্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি এমন ১৩০টির মতো বিষয় চিহ্নিত করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি।
বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে এ-সংক্রান্ত কমিটির দাখিলকৃত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে শুনানির জন্য রেখেছেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের কিছু শব্দ চয়ন, বাক্য ও বাক্যের গঠন ভুলভাবে উপস্থাপনসহ কিছু শব্দ বাদ দেওয়ায় কর্র্তৃপক্ষের ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২০ সালের ৫ মার্চ রাজবাড়ীর রায়নগর গ্রামের কাশেদ আলী নামে এক ব্যাক্তির পক্ষে আইনজীবী সুবীর নন্দী দাস একটি রিট আবেদন করেন।
পরে ১০ মার্চ শুনানি শেষে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিনা- তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। সংবিধানে থাকা ভাষণের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত সব অডিও-ভিডিও পর্যালোচনা করে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয় আদালত।
একইসঙ্গে সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর সঠিক ভাষণ অন্তর্ভুক্তিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না-এ মর্মে রুল জারি করে হাইকোর্ট। এরপর বাংলা একাডেমির তখনকার সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানকে (ইতিমধ্যে প্রয়াত) সভাপতি করে ‘৭ই মার্চের ভাষণ নিশ্চিতকরণ কমিটি’ গঠন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় প্রতিবেদনটি হাইকোর্টে দাখিল করা হলো।
প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের অনেক বাক্য কিংবা শব্দচয়ন যেমন অন্তর্ভূক্ত হয়নি তেমনি ভাষণের অনেক বক্তব্য এসেছে ভুলভাবে। বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর বলেছিলেন। কিন্তু কমিটি বলছে, সংবিধানে ‘খুলনা’ শব্দটি অন্তর্ভূক্ত হয়নি।
মূল ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে ছয় দফা, এগার দফার মাধ্যমে শাসনতন্ত্র করতে, এটার পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার ক্ষমতা আমার নাই। আপনারা আসুন, বসুন’।
সংবিধানে এ শব্দ চয়ন অন্তর্ভূক্ত হয়নি বলে কমিটি মনে করে।
মূল ভাষণে বঙ্গবন্ধু জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘হরতাল পালন করেন’। কিন্তু সংবিধানে তা এসেছে ‘হরতাল পালন করুন।’
মূল ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আপন ইচ্ছায়’। সংবিধানে এটি লেখা হয়েছে আপনার ইচ্ছায়।
মূল ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘এর পূর্বে, এর পূর্বে অ্যাসেম্বলিতে বসা, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।’ সংবিধানে লেখা হয়েছে, ‘এর পূর্বে অ্যাসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।’
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু মূল ভাষণে বলেছেন, ‘আপনারা আমার ওপর ছেড়ে দেন, আন্দোলন কী করে করতে হয়।’ সংবিধানে এ বাক্য অন্তর্ভূক্ত হয়নি।
মূল ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাবডিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো।’ কিন্তু সংবিধানে লেখা হয়েছে, ‘প্রত্যেক গ্রাম, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো।’
মূল ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘কাউকে যেন সেক্রেটারিয়েটে, হাইকোর্টে বা জজকোর্টে দেখা না হয়। দ্বিতীয় কথা.......।’ কিন্তু সংবিধানে এ বাক্য চয়ন অন্তর্ভূক্ত হয়নি বলে কমিটি অভিমত দিয়েছে।
মূল ভাষণে বঙ্গবন্ধু জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘একটা অনুরোধ আপনাদের কাছে।’ কিন্তু সংবিধানে এ বাক্যটিও অন্তর্ভূক্ত হয়নি।
রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আব্দুল আলীম মিয়া জুয়েল ও সুবীর নন্দী দাস।
অ্যাডভোকেট সুবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, কমিটির প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত এটি গ্রহণ করেছেন। তবে, কোনো নির্দেশনা বা আদেশ দেননি। এখন আদালতই এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তিনি বলেন, ‘৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু যেভাবে তার ভাষণটি দিয়েছিলেন সংবিধানে তার ভাষণ সেভাবে আসেনি। কমিটির প্রতিবেদনে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। ভাষণের অনেক জায়গায় মূল ভাষণের শব্দ চয়ন, বাক্য ও বাক্যের গঠন যেমন ভুলভাবে এসেছে। তেমনি অনেক শব্দচয়ন অন্তর্ভূক্ত হয়নি।’
