নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের নাম ভাঙিয়ে গণেশ^রী নদীর তীরে গড়ে ওঠা ফুলবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশ থেকে অবৈধ বাংলা ড্রেজার দিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব বালু বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করারও অভিযোগ উঠেছে। নদীর পাড় ধসে হুমকির মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৩টি ঘরের বাসিন্দারা। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, নদীতে এসব অবৈধ বাংলা ড্রেজার বসিয়েছেন স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। স্থানীয়রা বলছেন, তারা বাধা দিলেও কাজ হয়নি। যার হাতে অবৈধ পন্থায় বালু উত্তোলন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ভার ন্যস্ত, সেই ইউএনও নিজেই বসিয়েছেন ড্রেজার। এমনকি এই নদী থেকে বালু উত্তোলনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও জানান তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন ও তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির কাজে জড়িত গোড়াগাঁও গ্রামের জহিরুল ও শফিক নামে দুই যুবক।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়নের ফুলবাড়ি গ্রামের গণেশ^রী নদীর তীর ঘেঁষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ২৩টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। আশ্রয়ণের এসব ঘরের কাছে নদীর তীর ঘেঁষে বসানো হয়েছে দুটি বাংলা ড্রেজার। এতে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে এসব ঘর।
স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহাব মিঞা বলেন, ‘ড্রেজারগুলো বসানোর সময় এলাকার মানুষ বাধা দিয়েছে। আমাদের তো দামই দেয় না। সকাল-সন্ধ্যা ড্রেজার মেশিন চালু থাকে। প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ লরি বালু নেওয়া হচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজে বালু লাগবে বলে ইউএনও নিজে এসে দেখে গেছেন। তার অফিসের লোকজনও আসে। আমাদের বাধা সত্ত্বেও বালু উত্তোলন করছে। নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। ফুলবাড়ি আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের তো নিরাপত্তাই নেই।’
ফুলবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মো. রহমত আলী বলেন, ‘তারা বিভিন্ন জায়গায় বালু নিয়ে বিক্রি করছে। জিজ্ঞাসা করলে বলে আবাসনের জন্য নতুন করে ঘর করা হবে তার জন্য বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।’ প্রকল্পের বাসিন্দা সাদ্দামের স্ত্রী বলেন, ‘বাধা দেওয়ায় কয়েকজন আমার স্বামীকে মারতে আসছিল।’ অলকা নামে আরেক নারী তার ঘরের পেছনের নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে তা দেখিয়ে বলেন, ‘সরকার তো আমাদের ঘর দিছে। এখন আমাদের থাকার মতো কোনো অবস্থা নাই। ভাইঙ্গাচুইড়া সব নিতাছে গা।’
লরিতে বালু তোলার কাজে ব্যস্ত সাইয়েদুল জানান, লেংগুরা, কলমাকান্দাসহ বটতলার দিকেও বালু যায়। আরেক শ্রমিক আবুল কাশেম বলেন, ‘বালুভর্তি লরি কলমাকান্দা পূর্ববাজারে কাঠমিল এলাকায় যাবে। প্রতি লরি লোড করলে ৪০০ টাকা পাই। এর বেশি কিছু জানি না।’
বালু উত্তোলনে জড়িত শফিক মোবাইল ফোনে বলেন, ‘এগুলো আমার নিজের কাজের জন্য নয়। আবাসনের সাইডে গর্ত হয়ে আছে এগুলো ভরাট করা হবে। আবাসনের কাজের জন্য কিছু বালু যাচ্ছে নাজিরপুর ও রহিমপুরে। চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ সবাইকে অবগত করে ইউএনও স্যার নিজেই ড্রেজার বসাইয়া গেছে।’ আবাসন ছাড়া বালু কলমাকান্দাসহ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হালকা কিছু বেচতাছি। বাংলা ড্রেজার চালাতে মোটামুটি ছয়-সাত হাজার টাকা খরচ আছে তা আপনারা নিজেইরা তো বোঝেন।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাশেম বলেন, ‘বালু পাব কোথা থেকে। কয়েক জায়গায় আশ্রয়ণের গৃহ নির্মাণে সেরকম বরাদ্দও নেই। তাই বালুর প্রয়োজনে ড্রেজার বসানো হয়েছে। বালু বিক্রি করছে এটা জানা ছিল না।’
এ নদী থেকে বালু উত্তোলনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে আপনার ওপর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ভার ন্যস্ত জানালে তিনি বলেন, ‘আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানা নেই। এখনই নায়েবকে বন্ধ করার নির্দেশনা দিচ্ছি।’
যদিও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউএনওর এমন বক্তব্যের এক দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবারও বালু উত্তোলন অব্যাহত ছিল।
