কূটনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে পানি-পলি ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ০১:৫০ এএম

সিলেট ও সুনামগঞ্জে স্মরণকালের এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার নেপথ্যে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, মেঘনা অববাহিকায় ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রকৃতিবিনাশী কর্মকান্ড, পাহাড়ধসের কারণে অতিরিক্ত পলিপ্রবাহে নদনদীর নাব্য হ্রাস এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের মতো বেশ কয়েকটি কারণ যুগপৎভাবে দায়ী।

খেয়াল করা দরকার কেবল মেঘনা অববাহিকার নদী-হাওর ব্যবস্থাই নয়, একই সময়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ব্যবস্থায়ও আমরা বড় ধরনের বন্যা দেখতে পাচ্ছি। প্রথমেই দেখা দরকার পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত এলাকা মেঘালয়ে এবার যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে সেটা কতটা অস্বাভাবিক। আমরা জানি সেখানে সাধারণত পুরো বর্ষাকালে, অর্থাৎ জুন-জুলাই-আগস্ট এই তিন মাসে প্রায় ৪,৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকে। কিন্তু এবার দেখা গেল গত ১৯ দিনেই মেঘালয়ে প্রায় ৪,১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে গেছে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে এবারের এই অতি ভারী বৃষ্টিপাত কতটা অস্বাভাবিক। এবার এমন অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহে যে জেট স্ট্রিমের কথা আমরা জানি সেটার গতিপথে নানা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই মৌসুমে এবার এখানাকার জেট স্ট্রিম এবং আমাদের মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের এমন একটা সম্মিলন ঘটেছে যা এমন ভারী বৃষ্টিপাতের নেপথ্য কারণ হিসেবে কাজ করেছে। আশঙ্কার কথা হলো, বৈশ্বিক জলবায়ু মডিউলগুলোর নানা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে এমন ভারী বৃষ্টিপাত আগামীতে আরও বাড়তে থাকবে। অর্থাৎ আগামী বছরগুলোতে বৃষ্টিপাত বাড়তে থাকা এবং এমন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল তৈরির জন্য আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু দুঃখনজনক বিষয় হলো আমরা সেটা করছি না। তাই আমার মনে হয় এবার মেঘালয়ের এই ভারী বৃষ্টিপাত বৈশি^ক  জলবায়ু পরিবর্তনের এক জরুরি সতর্কবার্তা।   

দ্বিতীয়ত, আমাদের এটা অনুধাবণ করতে হবে যে আমাদের বাংলাদেশসহ এই বঙ্গীয় বদ্বীপ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার একটি অভিন্ন নদীব্যবস্থার অংশ। একটা অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশের সমষ্টি। যে কারণে আসাম-মেঘালয়ে বৃষ্টি বা বন্যা থেকে বাংলাদেশ কখনোই বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না। আমরা খেয়াল করলে দেখব যে, অতি ভারী বৃষ্টিপাতে মেঘালয়-আসামের পাহাড়ি ঢলের পানি এবার তুলনামূলকভাবে অনেক দ্রুততম সময়েই সিলেট-সুনামগঞ্জে নেমে এসেছে। এমন দ্রুত ঢল নামার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। একটা হলো ভারতের ওই অঞ্চলে মাইনিংয়ের কারণে ব্যাপকভাবে বন ধ্বংস করা হচ্ছে। আরেকটা হলো সেখানে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করে নানারকম প্লান্টেশন বেড়েছে, নানারকম চাষাবাদ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে অনেক ভারী বৃষ্টিপাত হলেও সেখানকার পানি ভাটিতে নেমে আসার গতি কিছুটা ধীর হয়ে যায়। কিন্তু বনাঞ্চল না থাকলে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নেমে আসতে থাকে। আবার বনাঞ্চল ধংস করার কারণে সেখানকার পাহাড়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় পাহাড়ধস-ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। একইসঙ্গে এটাও খেয়াল করা দরকার যে, এমন বনাঞ্চল ধংস করা এবং পাহাড়-টিলা কাটার প্রকৃতিবিনাশী কাজ সেখানকার বাংলাদেশ অংশেও আমরা করছি। এভাবে মেঘালয়-আসাম-সিলেট-সুনামগঞ্জ-মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জসহ পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই এমন প্রকৃতিবিনাশী কর্মকান্ড অনেকটা বাধাহীনভাবেই চলে আসছে। কেবল বনাঞ্চল ধ্বংসই নয়, সেখানকার নদ-নদীতে একের পর এক বাঁধ-ড্যাম নির্মাণ, নদ-নদী-জলাশয় ভরাট করে রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি যার প্রভাব সেখানকার পুরো জলবায়ু পাল্টে দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, আমাদের দেখা দরকার পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুততার সঙ্গে নেমে এলেও পানি সরতে দেরি হচ্ছে কেন বা নদ-নদী-হাওর উপচে বন্যায় এত বিপুল অঞ্চল তলিয়ে গেল কেন? আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বেশিরভাগ অঞ্চলই প্লাবিত হয়েছে। একইভাবে প্রশ্ন করা দরকার যে বন্যার পানি সরতেও এত দেরি হচ্ছে কেন? এর উত্তরটি রয়েছে উজানে এবং দেশের অভ্যন্তরে বনাঞ্চল ধ্বংস করায়, পাহাড় কাটায়। এসব কারণে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলি মেঘনা অববাহিকার নদনদীগুলো দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলে আসছে। আবার বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে যে হারে পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে সেটাও নদনদীতে পলি প্রবাহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একইভাবে বিপুলসংখ্যক খাল-নালা ও ঝিরি বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে মাত্রাতিরিক্ত পলি প্রবাহের কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গিয়ে নদনদীগুলোর নাব্য কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ ও নদী-খাল-জলাশয় ভরাটের মচ্ছব। যে কারণে বন্যার পানি সরে যেতে দেরি হচ্ছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে কেবল প্রাকৃতিক নদ-নদী-খালই নয় আমরা শহর-নগরগুলোতে যে স্যুয়ারেজ সিস্টেম তৈরি করেছি সেটাও বিকল হয়ে যাচ্ছে নানারকম অব্যবস্থাপনার কারণে। যে কারণে সিলেট শহর থেকে বন্যার পানি সরার পথ পাচ্ছে না।

দেখা যাচ্ছে এই প্রক্রিয়ায় নদীর নাব্য কমে যাওয়ায়, প্রাকৃতিক প্রবাহগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন আর নদীব্যবস্থাটা সক্রিয় থাকছে না। নদী আর প্লাবনভূমির মধ্যে আগে যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল সেটা আর থাকছে না। পুরো এলাকাটাই এখন বিশাল প্লাবনভূমিতে পরিণত হয়ে গেছে। তাই আগে যেভাবে মেঘনা অববাহিকার নদীব্যবস্থা দিয়ে উজানের পানি হাওর হয়ে মেঘনা নদীতে মিশে বঙ্গোপসাগরে চলে যেত সেটা আর হচ্ছে না। পদে পদে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছি আমরা। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার ভৈরবে পুরাতন রেলসেতুসহ মোট তিনটি সেতুর কথা। এটা খেয়াল করতে হবে যে, উজানের পানি হাওর হয়ে এই পথ দিয়েই মেঘনার প্রবাহে যুক্ত হয়। কিন্তু ওই জায়গায় এখন একটা বোটলনেক প্রবলেম তৈরি করা হয়েছে। এই সেতুগুলো করতে গিয়ে নদীর মুখ সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। নদী কিন্তু কেবল মূল স্রোতধারাটিই নয়, নদীর দুপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে যে প্লাবনভূমি সেটাও নদীর অংশ। কিন্তু এমন সেতু বানানোর কারণে একদিকে যেমন নদীর প্রবাহ সরু হয়ে গেছে তেমনি সেতুর পিলারগুলোর কারণে নদীতে পলি জমছে। যমুনা সেতু তৈরির কারণে আমরা যমুনা নদীতে যেটা দেখতে পাচ্ছি যে, সেখানে বড় বড় নতুন চর সৃষ্টি হয়ে গেছে। এভাবে হাওর এলাকার পানি সরতে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় সেটা আরও উজানে সিলেট-সুনামগঞ্জের পানি সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় রকমের বাধা সৃষ্টি করেছে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এসব প্রভাব এবং মানবসৃষ্ট কারণে সেই প্রভাবের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির এসব দিক নিয়ে আমাদের এখনই অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এটা মাথায় রাখা জরুরি যে, এবারের বন্যা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। সামনে আরও বন্যা আসছে। এই বন্যা যেমন দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হবে তেমনি দেশের মধ্যাঞ্চলেও হবে। সেটা আমাদের মোকাবিলা করতেই হবে। আমরা নিরুপায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মুহূর্তে বন্যার্তদের উদ্ধার করা এবং বন্যাপরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার মধ্য দিয়েই কি আমরা দায়িত্ব শেষ করব নাকি দীর্ঘমেয়াদে এমন দুর্যোগ মোকাবিলার পথে বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলা, ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বন্যা মোকাবিলা করতে হলে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিগুলোসহ এই বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে আবারও বলতে চাই মেঘনা অববাহিকা, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এবং গঙ্গা অববাহিকা যেহেতু বাংলাদেশ, ভারত ও চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশের সম্মিলিত বিষয় তাই কোনো দেশই এককভাবে কোনো অববাহিকার সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। অববাহিকা একটা একক প্রাকৃতিক ইউনিট। এটা রাষ্ট্রীয় সীমানার বিষয় নয়, এটা অবিচ্ছিন্ন প্রকৃতি। তাই উজানেই হোক কিংবা ভাটিতে কোন অববাহিকায় কে কী করছে সেটা জানতে চাওয়ার অধিকার সবার আছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশন আছে। অভিন্ন পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে জাতিসংঘের প্রটোকল আছে। ভারত এখনো জাতিসংঘের সেই প্রটোকলে স্বাক্ষর করেনি। বাংলাদেশও করেনি। বাংলাদেশের উচিত হবে দ্রুতই তাতে স্বাক্ষর করা এবং ভারতও যাতে সেটা করে সে বিষয়ে চেষ্টা করা।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের এখন উচিত পানি ও পলি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি এবং বৈদেশিক কূটনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীনসহ এই অঞ্চলের এবং বৈশি^ক পরিম-লের সবখানে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে এই পানি ও পলি ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গটি যুক্ত করা। এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সুবিধা নেওয়া কিংবা না- নেওয়ার এবং সুবিধা দেওয়া কিংবা না-দেওয়ার কূটনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

লেখক : পরিবেশ বিজ্ঞানী, পানিসম্পদ ও জিআইএস বিশেষজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্রের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত