ঢাকার সাভারে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার দুপুরে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মারধরের শিকার হন শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার। পরে গতকাল সোমবার ভোরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহত উৎপল কুমার সরকার সাভারের আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। তিনি কলেজের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতিও ছিলেন। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার এলংজানি গ্রামে। বাবার নাম প্রয়াত অজিত সরকার।
মারধরের অভিযোগ ওঠা শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম জিতু আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার উজ্জ্বল হাজির ছেলে। সে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র।
হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষকরা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও তাদের প্রতিষ্ঠানে মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। শনিবার দুপুরে খেলা চলাকালে দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আশরাফুল ইসলাম জিতু হঠাৎ ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে শিক্ষক উৎপল সরকারকে বেধড়ক পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে শিক্ষকের মাথায় আঘাত করে এবং স্টাম্পের সুচালো অংশ দিয়ে তার পেটের বিভিন্ন অংশে খোঁচাতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপল সরকারকে বাঁচাতে অন্য শিক্ষকরা এগিয়ে গেলে জিতু সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর অবস্থায় উৎপল সরকারকে প্রথমে আশুলিয়া নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। কিন্তু আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানকার আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে তার মৃত্যু হয়।
শিক্ষক উৎপল সরকারের ওপর হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেদিন দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মেয়েদের ক্রিকেট খেলা চলাকালে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিক্ষক উৎপল সরকার। এ সময় জিতু ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে তাকে মারধর করে। উৎপল সরকার শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হওয়ায় তিনি শিক্ষার্থীদের আচরণগত সমস্যা নিয়ে কাউন্সেলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নিতেন। কেন ওই ছাত্র এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটি এখনো কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেন না।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘এভাবে দিনে-দুপুরে বখাটে একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মেধাবী শিক্ষককে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করায় আমিসহ ৫৫ জন শিক্ষক ও কর্মচারীরা বর্তমানে আতঙ্কে রয়েছি। এর আগে বিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে আসা পুলিশকে আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। লোকমুখে শুনতে পাচ্ছি, হত্যাকারী জিতু উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে আসবে এবং এলাকায় তার বখাটেপনা চালিয়ে যাবে।’
শিক্ষক উৎপল সরকারের ওপর হামলাকারী জিতুর নেতৃত্বাধীন একটি কিশোর গ্যাং রয়েছে জানিয়ে অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান বলেন, ‘সে (জিতু) তাদের নিয়ে গভীর রাতেও বিদ্যালয়ের গেটে অবস্থান করে। আমরা এ হত্যাকারীর উপযুক্ত শাস্তির দাবিতে মঙ্গলবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছি। পাশাপাশি এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তদন্তের জন্য বিদ্যালয় থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে।’
উৎপলের বড় ভাই অসীম কুমার সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দিন বাসা থেকে স্কুলের পাশেই আমার দোকানে আসার সময় জানতে পারি, আমার ছোট ভাইকে শিক্ষার্থী জিতু স্টাম্প দিয়ে পিটাইছে। হাসপাতালে গিয়ে শুনি পেটে, বুকে, পিঠে ও মাথায় স্টাম্প দিয়ে মারধর করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাই শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি দেখত। দশম শ্রেণির ছাত্র জিতু বিভিন্ন সময়ে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এসব থেকে বিরত থাকার জন্য বিভিন্ন সময়ে আমার ভাই জিতুকে বোঝালেও সে সংশোধন হয়নি। উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে স্টাম্প দিয়ে পিটাইয়া আমার ভাইরে মাইরা ফালাইছে। আমি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে এর উপযুক্ত বিচার চাই, যাতে আর কোনো শিক্ষককে ছাত্রের হাতে মরতে না হয়।’
এদিকে বখাটে শিক্ষার্থী জিতুর মারধরে আহত শিক্ষক উৎপল সরকারের মৃত্যুর খবর বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়লে শোকাতুর হয়ে পড়েন প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। তারা হামলাকারী জিতুর গ্রেপ্তার দাবিতে প্রতিষ্ঠানের সামনেই তাৎক্ষণিক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
শিক্ষক উৎপল সরকার হত্যার ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে আশুলিয়া থানায় মামলা করা হয়েছে। ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. এমদাদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষক উৎপল সরকার ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা রক্ষায় শাসন করতেন। হয়তো আগের এমন কোনো বিষয় নিয়ে তার ওপর হামলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জিতুসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে নিহতের ভাই অসীম কুমার সরকার মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে আসামিদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।’
