বিশ্ববিদ্যালয় না কর্মসংস্থান প্রকল্প

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ১০:৫৬ পিএম

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে মেধা-যোগ্যতার বদলে প্রার্থীর রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেএমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। একই অভিযোগ শোনা যেত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও। এই দুইয়ের কোনোটিরই অবসান না হলেও এরই মধ্যে নতুন আরেকটি প্রবণতা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেন রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সেটা হলো যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক যেকোনো উপায়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের আত্মীয়দের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়ে গেছে যেখানে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা হতে পারলেই নিজের কিংবা তার স্বজনদের নিয়োগও নিশ্চিত করা যায়। এই নির্মম বাস্তবতা যে মোটেই অতিরঞ্জন নয় সেটা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবশেষ কয়েকটি নিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) সম্ভবত এমন স্বজনতোষণ ও রাজনৈতিক নিয়োগের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘আত্মীয় আর ছাত্রলীগে চাকরি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে আত্মীয় ও দলীয় কর্মীদের অনৈতিক নিয়োগের ধারাবাহিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্চপদে থাকা বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রভাব খাটিয়ে তাদের সন্তান, জামাই, ভাগ্নে-ভাতিজা, শ্যালক-শ্যালিকাকে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া যারা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উচ্চপদে রয়েছেন তারা নিজেরা বা তাদের বান্ধবীদের চাকরি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, আত্মীয়তার সূত্র কিংবা দলীয় পরিচয়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীই তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেন না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তারা পেয়ে যান আত্মীয়তা আর দলীয় পরিচয়ের জোরে। যার অনিবার্য প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কর্মকান্ড ও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ওপর। শেকৃবিতে এখন দেড় শতাধিক পদে নিয়োগের যে প্রক্রিয়া চলছে সেখানে নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তাদের তদবির বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ৮০ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই প্রভাষক পদ। একই তারিখে একাধিক সেকশন অফিসার ও সমমানের প্রথম শ্রেণির পদ ও দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি মিলিয়ে ৮৫ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্রলীগ, প্রভাবশালী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের তদবিরের কারণে ব্যাপক চাপ তৈরি হওয়ায় প্রবেশপত্র ইস্যু করতে দেরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, ছাত্রলীগের নেতা ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থরা একাধিক প্রার্থী নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। এরমধ্যে কমপক্ষে ২০ জন ছাত্রলীগ নেতার চাকরি অনেকটা নিশ্চিত বলেও আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে

শেকৃবি উপাচার্যের বক্তব্য বিশেষভাবে খেয়াল করা দরকার। উপাচার্য অধ্যাপক ড. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দ্রুত নিয়োগের জন্য বলেছেন। তবে আমি বলেছি, আগে স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা শেষ হবে। এরপর আমরা শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে যাব। উপাচার্যের বক্তব্য থেকেই এটা স্পষ্ট যে, সরকার সমর্থক ছাত্রলীগের নেতারা দলীয় প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে চাপ প্রয়োগ করছেন। প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতারা এই সাহস কোথায় পান? উত্তরটি সম্ভবত এই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-অধ্যাপক এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তারা যখন আত্মীয়দের অবৈধভাবে নিয়োগ দিচ্ছেন তখন রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ নিশ্চিত করতে ছাত্রলীগের নেতারাইবা কেন পিছিয়ে থাকবেন?

রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির বিগত কয়েক বছরের নিয়োগের তথ্য দেখলে রীতিমতো আঁতকে উঠতে হয়। দেখা যাচ্ছে, বর্তমান উপাচার্য ড. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়ার ছেলে আব্দুল কাফি সেখানে খামার বিভাগে কর্মরত আছেন। এর আগের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনের মেয়ে, জামাই, ভাগ্নে ও শ্যালক শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আরেক সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শাদাত উল্লার শ্যালক বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও শ্যালিকা ডেপুটি রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে রয়েছেন। একইভাবে ছাত্রলীগের কয়েকটি ছাত্র ও ছাত্রী হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া ছাত্রলীগের কয়েক নেতা শিক্ষক হিসেবেও নিয়োগ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক-শিক্ষক আর কর্মকর্তারা যখন একজোট হয়ে অবৈধ নিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়েন তখন এই চিত্রই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া ঠেকাতে পারে না কিংবা এ বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রাখে সেটা বোধগম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা, আত্মীয় ও দলীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অযোগ্যদের কর্মসংস্থান প্রকল্পে পরিণত করার দায় সরকার বা রাষ্ট্রও এড়াতে পারে না।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত