মাসের শেষে কমবে সংক্রমণ

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ০১:৪৭ এএম

দেশে দুদিন ধরে করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমতির দিকে। তিন দিন আগে গত বৃহস্পতিবার রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২ হাজার ১৮৩ জন এবং শনাক্তের হার ছিল ১৫ দশমিক ৭০। সেটা নেমে গত ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৫ জন এবং শনাক্তের হার নেমে এসেছে ১৩ শতাংশে। তবে সার্বিক বিচারে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। ১৫ দিনে তার আগের ১৫ দিনের তুলনায় রোগী বেড়েছে ১৭ গুণ এবং মৃত্যু বেড়েছে ১৮ গুণ। এমনকি এই শেষ ১৫ দিনে তার আগের ১৫ দিনের তুলনায় গড় শনাক্তের হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ শতাংশে উঠেছে। এ সময় শনাক্তের হার বেড়েছে ৮ গুণের বেশি।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে করোনা সংক্রমণ এ মাসের শেষনাগাদ কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সেই কমাটা যেন সাময়িক না হয়, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা দিলে করোনার পরবর্তী ঢেউ নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শুরু হতে পারে এবং সংক্রমণ কমলেও তা শেষ হতে সময় লাগবে; বিশেষ করে আসন্ন ঈদুল আজহার সময় জনসমাগম রোধ করা না গেলে ওমিক্রনের বিএ.৫ উপধরনের কারণে করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণ আবার বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্ক ব্যক্তিরা।

এ ব্যাপারে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবকিছু বিবেচনা করে মনে হচ্ছে, দেশের করোনার সংক্রমণ আর বাড়বে না এবং এ মাসের শেষনাগাদ কমে আসবে। কিন্তু এই সংক্রমণ চলমান থাকবে। তবে আরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে। অক্সিজেন রাখতে হবে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে যেন চিকিৎসাসেবা পায়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ মাস শেষ হওয়ার আগেই সংক্রমণ কমে যাবে। তবে সেটা যেন সাময়িক না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সে জন্য কাজ করতে হবে। দ্বিতীয় ঢেউ শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই সেটা আবার ডেল্টার ধরনের কারণে তৃতীয় ঢেউ হয়ে গেছে। এবার যেন সে রকম না হয়, সে জন্য সবাই মিলে চেষ্টা করতে হবে।

১৫ দিনে সংক্রমণ বেড়েছে ১৭ গুণ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জুন মাসে প্রথম ১৫ দিনের তুলনায় শেষ ১৫ দিনে রোগী বেড়েছে ১৭ গুণ এবং শনাক্তের হার বেড়েছে ৮ গুণের বেশি।। প্রথম ১৫ দিনে (১-১৫ জুন) রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ১৩০ জন এবং দৈনিক গড় রোগী ছিল ৭৫ জন। গড় শনাক্তের হার ছিল ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সেখানে পরের ১৫ দিনে (১৬-৩০ জুন) রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ১৪৮ এবং গড় রোগী ছিল ১ হাজার ২৭৬ জন। গড় শনাক্তের হার ছিল ১২ শতাংশ। জুন মাসের প্রথম ১৫ দিন করোনায় কেউ মারা যায়নি। কিন্তু পরের ১৫ দিনে ১৮ জন মারা গেছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন: ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুই সপ্তাহ ধরেই করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে। গত ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছিল এই দুই বিভাগে। এ সময় সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৩ রোগী শনাক্ত হয় ঢাকায় এবং চট্টগ্রামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৬৪ জন।

অন্যদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে অন্যান্য জেলায় এখনো ক্লাস্টার ট্রান্সমিশন বা গুচ্ছভিত্তিক সংক্রমণ চলছে। তবে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে এবং আসন্ন ঈদে স্বাস্থ্যবিধিতে শিথিলতা দেখা দিলে, সেখানেও সামাজিক সংক্রমণ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ব্যাপারে ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংক্রমণের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ হচ্ছে। যখনই আমাদের রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেল, তখন থেকেই এই দুই জায়গায় কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে এবং এখনো চলছে। অন্যান্য জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখানে ক্লাস্টার বা গুচ্ছভিত্তিক সংক্রমণ হচ্ছে। ঈদের কারণে সংক্রমণ বাড়লে, সেসব এলাকায়ও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে যাবে।

৮ জেলায় রোগী বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত জুন মাসের করোনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৫ দিনে দেশের ৮ জেলায় সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ঢাকা জেলায় ১৮ হাজার ৯০। এরপর চট্টগ্রামে ৫৮৫, নারায়ণগঞ্জে ৩৫৯, কক্সবাজারে ২৬০, বরিশালে ১৫১, গাজীপুরে ১৪৯, কুমিল্লায় ১৩২ ও নরসিংদীতে ১০৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া আরও ১০ জেলায় সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে গত ১৫ দিনে শরীয়তপুরে ৪৬, টাঙ্গাইলে ৯৫, সিলেটে ৫৫, খুলনায় ৫৪, পাবনায় ৫২, ফরিদপুরে ৪৭, মানিকগঞ্জে ৪১, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৬, যশোরে ৩৫, কিশোরগঞ্জে ৩৪ জন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে।

গত ১৫ দিনে দেশের ৪ জেলায় কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। জেলাগুলো হলো লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও সুনামগঞ্জ।

ঈদ নিয়ে ভয় : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সংক্রমণ কমে গেলেও ঈদের সময় যাতায়াত বাড়বে। কোরবানির ঈদে খামারিরা গ্রাম থেকে গরু নিয়ে শহরে আসবেন। শহর থেকে গ্রামে যাবে মানুষ। ফলে সংক্রমণটা হঠাৎ করে বেড়ে না গেলেও ছড়াবে। আর যদি সংক্রমণ ছড়িয়ে যায়, তা হলে ওমিক্রনের যে বিএ.৫ উপধরন, তার কারণে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। এই উপধরনে মৃত্যুর হার সারা পৃথিবীতে এই মুহূর্তে ওমিক্রনের যে প্রথম উপধরন বিএ.১, বিএ.২, বিএ.৩ ও বিএ.৪ বেশি। দেখা যাবে তিন মাস পরে যে সংক্রমণ বাড়ার কথা, সেটা আরও আগে বেড়ে গেছে। কারণ বিএ.৫ উপধরন টিকাও মানছে না। সাধারণত টিকা নেওয়ার পর তিন মাস সুরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু এই উপধরন তারও আগে আক্রমণ করার ক্ষমতা অর্জন করছে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, গত পাঁচটা ঈদে আমরা দেখেছি, পরিবহনের কারণে কিন্তু খুব একটা সংক্রমণ বাড়েনি। গ্রামাঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়েছে, যেহেতু গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যায় অপেক্ষাকৃত যারা তরুণ, তারা টেস্ট করেনি, সে কারণে চিত্রটা আসেনি। আর গত বছর ঈদের পরে ডেল্টার সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল শহর থেকে গ্রামে আসার কারণে, পশ্চিম বাংলাসংলগ্ন গ্রাম থেকে আমাদের দেশের গ্রামে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের চলাচলের কারণে এটা আরও দ্রুত ছড়িয়ে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও সংক্রমণের চিত্র আমরা দেখেছি। সর্বোচ্চ দৈনিক ১৬ হাজার রোগীও দেখেছি। কাজেই এবারও ওই ঝুঁকিটা আছে।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদের সময় যদি আমরা উদাসীন থাকি, যদি ভাবি সংক্রমণ কমে গেছে, তাহলে বিপদ। আর যদি কমেও যায়, ঈদের সময় সংক্রমণটা বেশ নিচুতে দেখা যায়, মৃত্যুটা হয়তো ওই সময় নামতে শুরু করবে। অসতর্ক যদি থাকি, তাহলে তিন মাস আগেই সংক্রমণ শুরু হলো এবং মৃত্যুটা আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন,  কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, সামাজিক মেলামেশা, রাজনৈতিক আড্ডা ও ধর্মীয় মেলামেশা হবে। ঈদের জামাত মসজিদের ভেতর না করে খোলা জায়গায় করতে হবে। বদ্ধ জায়গায় বেশি লোক মানেই সংক্রমণটা বেশি ছড়াবে। ঈদে যদি সতর্ক না হই, তাহলে এখন যদি ঢেউটা নেমেও যায়, এই ঢেউটা আবার বেশি শক্তি নিয়ে ঈদের কয়েক সপ্তাহ পরে আবার বেড়ে যাবে। তখন সংক্রমণ ও মৃত্যু- দুটোই বাড়বে। সাধারণত একটা ঢেউ থেকে আরেকটা ঢেউয়ের দূরত্ব হয় তিন মাস। ঈদের কারণে সেটা তিন মাসের আগেই পরবর্তী ঢেউ শুরু হয়ে যাবে।

স্বাস্থ্যবিধি ও টিকায় শিথিলতা নয় : অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ও ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যারা টিকা নেননি, বিশেষ করে বুস্টার ডোজ, তাদের টিকা নিতে হবে। আর টার্গেট ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে ও অন্য রোগ আছে, যারা সম্মুখসারির করোনা যোদ্ধা স্বাস্থ্যকর্মী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যারা মাঠে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের শতভাগ টিকা নিতে হবে।

এ ব্যাপারে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, টিকা না নিলে চীনের সাংহাইয়ের মতো অবস্থা হতে পারে। সেখানে দেখা গেছে যে বৃদ্ধ মানুষ টিকা নেননি। কিন্তু টিকার শতকরা হিসাবে ৭০ শতাংশের বেশি হয়ে গেছে। তরুণ যুবকরা সবাই টিকা নিয়েছে। কিন্তু ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে যারা তাদের ৫০ শতাংশের মতো টিকা নিয়েছে। বাকিরা সংক্রমিত হয়ে গেছে ওমিক্রনের বিএ.৫ উপধরনের দ্বারা। ফলে সেখানে কয়েক শ মানুষ মারা গেছে। আমাদের এখানে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বেশি। কাজেই স্বাস্থ্যবিধি ও টিকা এ দুটোর ব্যাপারে কোনো ধরনের শিথিলতা করা যাবে না।

২৪ ঘণ্টার তথ্য: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১০৫ এবং মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। এর আগের দিন গত শুক্রবার রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ৮৯৭ এবং মৃত্যু হয় ৫ জনের। এ নিয়ে দেশে রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৯ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮৭ এবং মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ১৬০ জনের। শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। নতুন শনাক্ত ১ হাজার ১০৫ জনের মধ্যে ৮৮৬ জনই ঢাকা জেলার বাসিন্দা। এক দিনে যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ। মৃতদের তিনজন ঢাকা, দুজন চট্টগ্রাম ও একজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত